জলহীন পুকুর দেখিয়ে সাড়ে ১২ লক্ষ গায়েব

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : নদীর ধারে বালি-পাথর তুলে যেভাবে ডাঁই করে রাখা হয় ঠিক সেভাবেই খানিকটা জায়গা নদী থেকে তোলা বালি-পাথর দিয়ে উঁচু করে ঘিরে রাখা হয়েছে। সরকারি নথিতে জলহীন সেই ঘেরা অংশকে পুকুর বলা হয়েছে। আর ওই পুকুর খননের নামে ১০০ দিনের কাজ থেকে ১২ লক্ষ ৫৪ হাজার টাকা তোলা হয়েছে।

নিয়ম মেনে বালি-পাথরের ওই ঢিবিতে একটি কংক্রিটের ফলকও পোঁতা হয়েছে। ওই ফলকে প্রকল্পের যাবতীয় তথ্য লেখা আছে। মাটিগাড়া ব্লকের আঠারোখাই গ্রাম পঞ্চায়েতের ডুমরিগুড়িতে বালাসন নদীর চরের ওই অদ্ভুত পুকুর দেখে অনেকেই হতবাক হয়েছেন। প্রসঙ্গটি তুলতেই বাসিন্দারা ক্ষোভে ফুঁসছেন। তাঁরা গ্রাম পঞ্চায়েতের বিরুদ্ধে সরাসরি পুকুর চুরির অভিযোগ তুলেছেন। রাতের অন্ধকারে মাটি কাটার যন্ত্র দিয়ে নদীর বালি-পাথর তুলে ডাঁই করে পুকুরের তকমা দিয়ে সরকারি টাকার নয়ছয় করা হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ। রাজ্যের শাসকদল তণমূল কংগ্রেস আঠারোখাই গ্রাম পঞ্চায়েতে ক্ষমতায় আছে। বিজেপি ঘটনার উচ্চপর্যায়ে তদন্ত দাবি করেছে। অভিযোগ খতিয়ে দেখে যথাযথ পদক্ষেপ করা হবে বলে মাটিগাড়ার বিডিও রুনু রায় জানিয়েছেন।

- Advertisement -

সরকারি ফলকের তথ্য বলছে, ২০১৯-২০২০ আর্থিক বর্ষেই ওই পুকুর খনন করা হয়েছে। খননের কাজে ৬৩৭৭টি শ্রমদিবস ব্যয় হয়েছে। কাজের জন্য অদক্ষ শ্রমিকদের দৈনিক ১৯১ টাকা করে মজুরি দেওয়া হয়েছে। পুকুর খননের জন্য কোনও সংস্থা বা ব্যক্তিকে বরাত দেওয়া হয়নি। গ্রাম পঞ্চায়েত কর্তৃপক্ষ নিজেরাই ওই কাজ করেছে। মূলত বেকারদের স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে মাছ চাষ বা কৃষিকাজে সেচের জলের জোগান দেওয়ার জন্য ১০০ দিনের কাজে পুকুর খনন করা হয় বলে পঞ্চায়েত দপ্তরের আধিকারিকরা জানিয়েছেন। ডুমরিগুড়ির নদীর চরে থাকা পুকুরে জল নেই। তাই সেখানে মাছ চাষ হবে না। সেচের জল সরবরাহও করা যাবে না। তাছাড়া চরের দূরদূরান্ত পর্যন্ত কোনও চাষের জমিও নেই।

তাহলে গ্রামের এত জমি থাকতে হঠাৎ নদীর চরে পুকুর কেন? গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান বা আধিকারিকদের কাছ থেকে এই প্রশ্নের কোনও উত্তর মেলেনি। সংশ্লিষ্ট গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান তথা তৃণমূল নেতা অভিজিৎ পাল বলেন, কোথায় কাজ হয়েছে ঠিক মনে পড়ছে না। ২০১৯-২০২০ আর্থিক বর্ষে কাজ হলে তার পরিকল্পনা ২০১৮-২০১৯ আর্থিক বর্ষে তৈরি হয়েছে। সেই সময় বামফ্রন্ট গ্রাম পঞ্চায়েতে ক্ষমতায় ছিল। তাই সবটা আগে জানতে হবে। তারপরই বলতে পারব। গ্রাম পঞ্চায়েতের বিরোধী দলনেতা সিপিএমের অসিত নন্দী বলেন, ২০১৮ সালের ৩১ অগাস্ট তৃণমূল দল ভাঙিয়ে গ্রাম পঞ্চায়েতের ক্ষমতা দখল করে। ওই পুকুর তৈরির পরিকল্পনা ও খনন সবটাই তৃণমূলের আমলেই হয়। ওদের দুর্নীতির পর্দা ফাঁস হতেই এখন না জানার ভান করে মিথ্যাচার করছে। পুকুর খননে উচ্চপর্যায়ে তদন্ত চাই।

নদীর চরের যে জায়গায় পুকুর খননের ফলক লাগানো হয়েছে তার চারদিক জুড়ে শুধুই বালি-পাথরের ঢিবি রয়েছে। ফলক না থাকলে ওই অংশটিকে আলাদা করে চিহ্নিত করা কার্যত অসম্ভব। স্থানীয় বাসিন্দা শম্ভু ওরাওঁ নদী থেকে পাথর তোলার কাজ করেন। তিনি বলেন, কবে ওই জায়গাটা পুকুর হয়ে গেল আমরাই জানি না। একদিন কাজ করতে এসে চরের অংশটি উঁচু করে ঘেরা দেখি। পরে শুনি ওটা নাকি পুকুর। জীবনে ওরকম পুকুর দেখিনি। বিজেপির দার্জিলিং জেলা সভাপতি প্রবীণ আগরওয়াল বলেন, তৃণমূল এখন বুক চিতিয়ে চুরি করছে। সবার চোখে ধুলো দিয়ে ওরা প্রায় ১৩ লক্ষ টাকা গায়েব করে দিল। ভাবতেই অবাক লাগে। দ্রুত তদন্ত করে দুর্নীতিতে যুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ না করলে আমরা আন্দোলনে নামব।