যক্ষ্মায় এক বছরে মৃত ১২০, আলিপুরদুয়ারে উদ্বিগ্ন স্বাস্থ্য দপ্তর

66

ভাস্কর শর্মা, আলিপুরদুয়ার :  আলিপুরদুয়ার জেলায় গত এক বছরে করোনা সংক্রামিত হয়ে যতজন মারা গিয়েছেন তার থেকে বেশি মৃত্যু হয়েছে যক্ষ্মা রোগে। এর পাশাপাশি যক্ষ্মায় সংক্রামিতের হারও বেড়েছে জেলায়। বিশেষ করে চা বাগানগুলিতে যক্ষ্মায় মৃত ও সংক্রামিতের হার হুহু করে বাড়ছে। স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২০ সালে আলিপুরদুয়ার জেলায় ১২০ জন যক্ষ্মা আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন। সেখানে এখনও পর্যন্ত করোনা সংক্রামিত হয়ে মারা গিয়েছেন ৮৬ জন।

স্বাস্থ্য দপ্তরের তথ্য থেকে জানা গিয়েছে, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে জেলায় যক্ষ্মারোগীর সংখ্যা প্রায় সাত শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে জেলায় যক্ষ্মারোগী চিহ্নিতকরণের হার বাড়নো হয়েছে। করোনার জন্য গত বছর যক্ষ্মারোগীদের চিকিৎসার প্রতি কিছুটা হলেও খেয়াল কম দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু করোনা নিয়ন্ত্রণে চলে আসায় ফের যক্ষ্মারোগীদের চিকিৎসায় জোর দেওয়া হয়েছে। আলিপুরদুয়ারের মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ গিরীশচন্দ্র বেরা বলেন, যক্ষ্মা রোগকে অনেকেই হালকাভাবে নেন। ওষুধ খাওয়া শুরু করলেও মাঝপথে ছেড়ে দেন। তাই বিশেষ করে এমডিআর রোগীদের মৃত্যু হচ্ছে। তবে আমরা সচেতনতায় জোর দিচ্ছি।

- Advertisement -

আলিপুরদুয়ার জেলা যক্ষ্মা ইউনিটের তরফে জানা গিয়েছে, ২০২০ সালে জেলায় ২,৫৫১ জন যক্ষ্মায় আক্রান্ত ছিলেন। এর মধ্যে ২,৪৭৮ জন সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে এবং ৭৩ জন বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে ভর্তি ছিলেন। আড়াই হাজারের ওপরে যক্ষ্মারোগীর মধ্যে চিকিৎসা করিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন ১,৮০১ জন। এঁদের মধ্যে বেশিরভাগ ছয় মাসের কোর্স সম্পূর্ণ করেই সুস্থ হয়ে উঠেছেন। তবে মাত্র এক বছরে আড়াই হাজার যক্ষ্মারোগীর মধ্যে ১২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর হার ৪.৭ শতাংশ। স্বাস্থ্য দপ্তর জানিয়েছে, ১২০ জনের মধ্যে আলিপুরদুয়ার পুরসভা এলাকায় করোনার সময় যক্ষ্মা রোগে মারা গিয়েছেন ১৫ জন। আলিপুরদুয়ার-১ ব্লকে ৮ জন, আলিপুরদুয়ার-২ ব্লকে ৭ জন, ফালাকাটা ব্লকে ১৩ জন, কালচিনি ব্লকে ৩৮ জন, কুমারগ্রাম ব্লকে ১৪ জন এবং মাদারিহাট ব্লকে ২৫ জন। স্বাস্থ্য দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এক বছরে করোনার সময় জেলার ছয়টি ব্লকের মধ্যে চা বাগান অধ্যুষিত কালচিনি ব্লক এবং মাদারিহাট ব্লকেই সবচেয়ে বেশি মানুষ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং এখানে মৃত্যুর হারও বেশি।

চা বাগান এলাকায় যক্ষ্মারোগীর মৃত্যুর হার নিয়ে উদ্বিগ্ন স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্তারা। আলিপুরদুয়ার জেলা যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রক আধিকারিক ডাঃ অমিত বরাটের কথায়, গত বছর করোনার সময় অনেক যক্ষ্মারোগীই ওষুধ ছেড়ে দিয়েছিলেন। ফলে জেলায় একবারে এতজনের মৃত্যু হয়েছে। সম্প্রতি চা বাগানের শ্রমিক মহল্লায় বাড়ি বাড়ি সার্ভে করে যক্ষ্মারোগী চিহ্নিত করা হয়েছে। সরকারি গাইডলাইন অনুযায়ী তাঁদের চিকিৎসা শুরু হয়েছে। এই কাজে সরকারি দপ্তর ছাড়াও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, ক্লাবগুলিকেও কাজে লাগানো হচ্ছে।

স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃত্যুর কারণ হিসেবে সরকারি তালিকায় থাকা প্রথম ১০টি রোগের মধ্যে যক্ষ্মাও রয়েছে। যদি চিহ্নিত যক্ষ্মারোগীর অন্য কোনও কারণে মৃত্যু হয় তবুও তা যক্ষ্মাই ধরা হয়। ফলে গত বছর করোনা সংক্রামিত হয়ে অনেকেই মারা গিয়েছেন, যাঁদের যক্ষ্মাও ছিল। এ বছর ফের নতুন করে করোনা সংক্রামিতের খবর পাওয়া যাচ্ছে। তাই ১,২৭০ জন যক্ষ্মারোগীর ওপর বাড়তি নজর দিতে শুরু করেছে স্বাস্থ্য দপ্তর। আবার জেলায় যক্ষ্মা রোগ প্রতিরোধে একাধিক উদ্যোগও নিয়েছে স্বাস্থ্য দপ্তর। জেলায় যক্ষ্মারোগী চিহ্নিতকরণের জন্য ২০টি ডেজিগনেটেড মাইক্রোস্কোপি সেন্টার (ডিএমসি) করা হয়েছে। জেলার সব বড় হাসপাতাল এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও এই ব্যবস্থা রয়েছে। রিপোর্ট পজিটিভ হলে বিনামূল্যে ওষুধ চালুর পর ওই রোগী ওষুধ প্রতিরোধী (এমডিআর) যক্ষ্মায় আক্রান্ত কি না তা জানতে ইউনিভার্সাল ড্রাগ সাসপেক্টিবিলিটি টেস্ট (ইউডিএসি)-এর জন্য সিবি নাট যন্ত্রের সাহায্য নেওয়া হয়। ফালাকাটা সুপারস্পেশালিটি হাসপাতালে এই যন্ত্র রয়েছে।

এক স্বাস্থ্যকর্তার কথায়, যক্ষ্মা নিয়ে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য দপ্তর কাজ করলেও মানুষ সচেতন নন। বিশেষ করে চা বাগানের মানুষ যক্ষ্মাকে গুরুত্ব দিতে চান না। যার খেসারত দিতে হচ্ছে তাঁদের। তাঁরা বিভিন্ন ধরনের নেশা করেন। ওষুধও ঠিকমতো খান না। ফলে দিন-দিন শ্রমিক মহল্লায় যক্ষ্মারোগীর সংখ্যা বেড়েই চলছে।