১৭০০ অবৈধ দোকান শিলিগুড়ির বিধান মার্কেটে

রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি : শিলিগুড়ি পুরসভার হাত থেকে শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এসজেডিএ)-র হাতে যাওয়ার পর বিধান মার্কেটে অন্তত ১৭০০ অবৈধ দোকান তৈরি হয়েছে। অথচ, এই দোকানগুলি সম্পর্কে কোনো তথ্য এসজেডিএ-র কাছে নেই। বিধান মার্কেটের ব্যবসায়ীদের একাংশ বলছেন, এই মার্কেটে অবৈধ নির্মাণ নতুন কিছু নয়। বাম আমল থেকেই এমন বহু নির্মাণ এখানে হয়েছে। সবকিছু দেখেও চোখ বন্ধ করে ছিল তৎকালীন এসজেডিএ বোর্ড এবং রাজ্য সরকার। একসঙ্গে এসজেডিএ-র চেয়ারম্যান, শিলিগুড়ির বিধায়ক ও রাজ্যের পুরমন্ত্রী পদে তখন ছিলেন দোর্দণ্ডপ্রতাপ অশোক ভট্টাচার্য। তিনিও অবৈধ নির্মাণ ভাঙতে কোনো ব্যবস্থা নেননি। সেই ট্র‌্যাডিশন বজায় রয়েছে। রং বদলে বাম থেকে তৃণমূলে যাওয়া কাউন্সিলার বা এসজেডিএ-র চেয়ারম্যান এখনও অবৈধ নির্মাণকারীদের আগলে রাখেন।

সম্প্রতি পুড়ে যাওয়া ২০টি দোকান পুনর্নির্মাণের ঘটনায় সরগরম হয়েছে শিলিগুড়ি। লোহার স্ট্রাকচার দিয়ে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে এই দোকানগুলি তৈরি করা হয়েছে বলে পর্যটনমন্ত্রী গৌতম দেব সরব হয়েছেন। এর পিছনে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগও তুলেছেন তিনি। কিন্তু বাস্তবে বিধান মার্কেটের কোনো বেআইনি নির্মাণই ভাঙেনি। এসজেডিএ-র মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক এস পন্নমবলম বলেন, বিধান মার্কেটে অবৈধ দোকান রয়েছে, এটা ঠিকই। কিন্তু এর সংখ্যা কত তা আমাদেরও সঠিকভাবে জানা নেই। এসব নিয়ে একটা সমীক্ষা করার পরিকল্পনা রয়েছে। ৬-এর দশকে তৈরি হয়েছিল শিলিগুড়ি বিধান মার্কেট। সেই সময় মূলত বিধান মার্কেটকে দুটি ভাগে ভাগ করে একটি আর সেক্টর এবং অপরটি এনআর সেক্টর হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। পূর্ববঙ্গ থেকে যে শরণার্থীরা এ রাজ্যে আসেন তাঁদের একটা বড়ো অংশই শিলিগুড়ির বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নেন। এই পরিবারগুলিরই রুজিরুটির ব্যবস্থা করার জন্যই বিধান মার্কেট তৈরি করা হয়েছিল।

- Advertisement -

মোট ৯ একর ৩৩ ডেসিমেল জায়গা নিয়ে এই বাজার তৈরি হয়। জমিটি উদ্বাস্তু পুনর্বাসন (আরআর) দপ্তরের হাতে দেওয়া হয়। ১৯৬২ সাল থেকে এখানে ব্যবসা শুরু করেন ব্যবসায়ীরা। ১৫ বছর পরে প্রত্যেক ব্যবসায়ীকেই জমির মালিকানা দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছিল। কিন্তু পরে কোনো সরকারই বিষয়টি নিয়ে ভাবেনি। মার্কেটের প্রবীণ ব্যবসায়ীরা জানান, ১৯৭২-’৭৩ সালে আরআর দপ্তরের হাত থেকে বিধান মার্কেটের দায়িত্ব যায় শিলিগুড়ি পুরসভার হাতে। পরে বিধান মার্কেটের দাযিত্ব নেয় এসজেডিএ। বর্তমানে এই বাজারে সব মিলিয়ে ৩,৫০০ দোকান রয়েছে। ব্যবসায়ীদের হিসাবেই এর মধ্যে ১৭০০ দোকান অবৈধ। অর্থাৎ এরা পুরনিগম বা এসজেডিএ কারও কাছেই নথিভুক্ত নয়। অথচ এই ব্যবসায়ীরাও এখানে জাঁকিয়ে ব্যবসা করছেন। সরকারি নিয়মে বিধান মার্কেটে শুধু নতুন নির্মাণ নয়, কোনো দোকানের সংস্কার, ভেঙে বা পুড়ে যাওয়ার পরে তা নতুন করে তৈরি করার ক্ষেত্রেও এসজেডিএ-র অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। অভিযোগ, কোনোদিনই এই নিয়মের পরোযা করেন না ব্যবসায়ীরা।

অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের একটা বড়ো অংশের দাবি, এখানকার দোকানগুলির বেশিরভাগই কাঠ বা বাঁশের বেড়া জাতীয় জিনিস দিয়ে তৈরি ছিল। সে কারণে আগুন লাগলে পরপর দোকান পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। আবার দোকানগুলি নীচু হওয়ায় বৃষ্টিতে অনেক দোকানে জল ঢুকে যাচ্ছে। তাই আগুন ও জল থেকে রক্ষা পেতে পাকা দোকান তৈরি করে, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা করার অনুমতি চেয়ে এসজেডিএ-কে বহু চিঠি দেওয়া হয়েছে। এমনকি বাজারের মালিকানা দেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা করে এখানে মার্কেট কমপ্লেক্স তৈরির প্রস্তাবও এসজেডিএ-র কাছে গিয়েছে বহুবার। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এই অবস্থায় ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে নিজেদের স্বার্থে দোকান পাকা করেছেন, কেউ নির্দিষ্ট উচ্চতার মধ্যেই দোতলা করেছেন। বিধান মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি সুব্রত সাহা বলেন, দেড় হাজার বৈধ দোকান রয়েছে বিধান মার্কেটে। বাকি সবই অবৈধ। আমরা চাই, সবাইকে একটা নিয়মের মধ্যে এনে ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হোক।