পঁচিশে বৈশাখ, পার্লামেন্ট ও কবিপ্রণাম 

            ‘আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে, তাই হেরি তায় সকল খানে…’

প্রসেনজিত দাশগুপ্ত, নয়াদিল্লি: পার্লামেন্টের লাইব্রেরি বিল্ডিং। প্রধান দ্বারপ্রান্ত। এখান দিয়ে সাধারণের ঢোকা নিষেধ। এমনকি ছাড়পত্র নেই সাংবাদিক’দেরও। কড়া নিরাপত্তা বলয়ে মোড়া। এই রাস্তাটি ব্যবহার করেন শুধুই প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি, স্পিকার, মন্ত্রীসভার বিশিষ্ট সদস্য ও সাংসদেরা। অধিবেশনের সূচনাপর্বে সর্বদলীয় বৈঠক বা শীর্ষ পরিষদীয় বৈঠকগুলি হয়ে থাকে এখানেই। সংসদের লাইব্রেরি হলে। সাংবাদিক ও লোকসভা আধিকারিক, কর্মীদের জন্য রয়েছে একটি পৃথক মার্গ। পার্লামেন্টের চার নম্বর গেটের বিপরীতে।

- Advertisement -

প্রধান দ্বারপ্রান্ত দিয়ে প্রবেশ করলে সোজাসুজি দেখা যায় তাঁকে। লাইব্রেরি ও হলের মাঝামাঝি বসে আছেন তিনি। কোথায় কি বৈঠক,তর্কাতর্কি বা আলোচনা হচ্ছে, সেদিকে তিনি ভ্রুক্ষেপহীন। এক মনে বই পড়ছেন, ‘গীতাঞ্জলী’। মাথাটি অল্প নামানো, কিন্তু ভঙ্গিতে রাজসিক। বাঁ পা’টি তোলা আড়াআড়ি ডান পায়ের উপরে। বইটি ভর দেয়া তাঁর পায়ের উপর। স্থিতপ্রজ্ঞ চিত্তে, ভাবলেশহীন মুখে বইয়ের পাতায় নিমগ্ন এক সন্ন্যাসীর মূর্তি। দূর থেকে চিনতে অসুবিধা হয়না তিনি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

গোটা সংসদ ভবন জুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য মূর্তি, প্রতিকৃতি ও আবক্ষ। দেশবরেণ্য মনীষী’রা সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন। কে নেই সেই নক্ষত্র সমাগমে! সংসদে পা রাখতেই যাকে দেখা যায়, তিনি হলেন গান্ধীজি। সংসদের প্রধানদ্বারে মুখোমুখি ধ্যানস্থ হয়ে আছেন ‘মহাত্মা’। বিখ্যাত স্থপতি রামবিলাস সুতার নির্মাণ করেছিলেন এই বহুচর্চিত ১৬ ফুট উঁচু মূর্তিটি, ১৯৯৩ সালের ২রা অক্টোবর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শঙ্করদয়াল শর্মা এর আবরণ উন্মোচন করেন। গান্ধীজির মতনই ভারতীয় রাজনীতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস এমনকি স্বাধীনতার অনন্য সেনানীদের মূর্তিও রয়েছে সংসদে। আছে বহু প্রাতঃস্মরণীয় বঙ্গ সন্তানদের প্রতিকৃতি সহ পূর্ণাঙ্গ ও আবক্ষ মূর্তি। তবু তাঁদের সবার মধ্যেই কেমন যেন স্বতন্ত্র পার্লামেন্ট লাইব্রেরি বিল্ডিংয়ে ‘কবিগুরু’র এই পাঠমগ্ন মূর্তিটি। মূর্তিটির সামনে এসে দাঁড়ালে এক অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করে ভিতরে ভিতরে। লোকসভা সচিবালয়ের রেকর্ড জানাচ্ছে, পার্লামেন্ট লাইব্রেরি ভবনে রবীন্দ্রনাথ, ঋষি অরবিন্দ সহ লালা লাজপত রাই, মহারানী অহল্যাবাঈ হোলকার ও জওহরলাল নেহেরুর মূর্তিও রয়েছে। ‘কবিগুরু’র ৭ ফুট উঁচু এই মূর্তি তৈরি করেছিলেন বাঙালি স্থপতি গৌতম পাল, ২০০৫ সালে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং এর উদঘাটন করেন।

‘আমি তার মুখের কথা শুনব বলে গেলাম কোথা, শোনা হল না…’

দিল্লিতে পঁচিশে বৈশাখ বরাবর-ই একটু অন্য রকমের। প্রবাসীদের মধ্যে রবীন্দ্র অনুরাগীতা সবসময়ই একটু ভিন্ন ধারার বা ভিন্ন মার্গের। বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন হোক বা বঙ্গীয় সমাজের রবীন্দ্র-তর্পণ, কলকাতার চেয়ে কোন অংশেই পিছিয়ে নেই রাজধানীর ‘কবিপ্রণাম’। পঁচিশে বৈশাখের ভোর থেকে যার সূচনা মথিত করে রাখে দিল্লির আপামর বঙ্গমানসকে।

কবিপ্রণামে পিছিয়ে থাকেনা সংসদ’ও। পঁচিশে বৈশাখের সকাল-সকাল সেজে ওঠে সংসদের সেন্ট্রাল হল, লাইব্রেরি ভবন। সকালেই সংসদে হাজির হতে দেখেছি লালকৃষ্ণ আদবানী, প্রাক্তন স্পিকার সুমিত্রা মহাজন, মীরা কুমার, বর্তমান স্পিকার ওম বিড়লা, কংগ্রেস সাংসদ প্রদীপ ভট্টাচার্য, ড. মনমোহন সিং, অনন্ত কুমার, গুলাম নবি আজাদ, সনিয়া গান্ধী সহ বহু বিশিষ্ট ব্যাক্তিদের। পঁচিশে বৈশাখে শ্রদ্ধা জানাতে কখনো গড়হাজির দেখিনি তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভা সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায়’কে। এসেছেন বাবুল সুপ্রিয়, ডেরেক ও’ব্রায়েন তথা বিজয় গোয়েল, অর্জুনরাম মেঘোয়ালের মত নেতা মন্ত্রীরাও। ফুল দিয়ে সাজানো হয় সেন্ট্রাল হলে থাকা রবীন্দ্রনাথের ঠাকুরের সেই সুউচ্চ প্রতিকৃতি’টি। বিখ্যাত চিত্রকর অতুল বোসের আঁকা রবি ঠাকুরের এই প্রতিকৃতি’টি সংসদ ভবনে দান করেছিলেন বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ড. বিধানচন্দ্র রায়। ১৯৫৮ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সংসদের সেন্ট্রাল হলে যার আবরণ উন্মোচন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বাবু রাজেন্দ্র প্রসাদ। আজও তা স্বমহিমায় বিরাজমান।

২৫শে বৈশাখের দিনে ফুল দিয়ে সযত্নে সাজানো হয় সেই প্রতিকৃতি। সাংসদরা শ্রদ্ধা অর্পণ করেন সেখানে। একইভাবে সাজানো হয় পার্লামেন্টের লাইব্রেরি বিল্ডিংয়ে কবিগুরুর মূর্তিকেও। ২৫শে বৈশাখে এখানেই পুষ্প অর্পণ করে বিশ্বকবির জন্মতিথিতে শ্রদ্ধা জানাতেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয়মন্ত্রী প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি, লোকসভার প্রাক্তন অধ্যক্ষ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় সহ বাংলা তথা অন্যান্য রাজ্যের বহু বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্বরা। শ্রদ্ধা জানাতে পিছিয়ে থাকতেন না লোকসভা এবং রাজ্যসভা উভয় কক্ষের কর্মরত অসংখ্য কর্মী ও আধিকারিকরাও। রবীন্দ্র-স্মরণে গানে, কবিতায়, ব্যক্তিগত পাঠে এভাবেই মেতে ওঠে পার্লামেন্ট। প্রতি বছর, সেই বিশেষ দিন’টিতে। ‘আজও সেই ট্র‍্যাডিশন সমানে চলেছে…’

‘কে তোরা খুঁজিস তারে কাঙাল বেশে দ্বারে দ্বারে, দেখা মেলে না…’

দেখতে দেখতে ১৫৯টি বসন্ত পার করে এসে আমাদের ছুঁয়ে গেলেন রবি ঠাকুর। রাজনৈতিক পরিসরে তাঁর বোধ, মনন, দর্শন ও আত্মান্বেষণ কতটা জাগ্রত করেছে রাষ্ট্রতন্ত্রের সত্ত্বা সে নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। তবু তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন, এটাই অবশ্যম্ভাবী।

সাম্প্রতিক কালে সংসদ পরিসরে, লোকসভা বা জাতীয় রাজনীতির দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততায় সন্ধি ও অভিসন্ধিমূলক আবহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঠিক কতবার দেশের জনপ্রতিনিধিদের জিহবায় ভর করেছেন সে নিয়ে প্রশ্ন উহ্যই থাক। তবু সংসদের অলিন্দে রবীন্দ্র চর্চা বারবার উঠে এসেছে, উঠে আসবেও। প্রাক্তন সাংসদ সুগত বসু, কংগ্রেসের বাগ্মী সাংসদ শশী থারুর, তৃণমূল কংগ্রেসের সৌগত রায়, সুখেন্দুশেখর রায়, এমনকি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মোদিকেও ভাষণের মধ্যে যখন রবীন্দ্রবাণী উচ্চারণ করতে শুনেছি, বারবার মনে হয়েছে এই বুঝি সেই চিরাকাঙখিত ২৫শে বৈশাখ। রবিচ্ছায়া থেকে সব আলো এসে ভেঙে পড়ে ‘এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে’।

সংসদ ভবন কোথাও না কোথাও এভাবেই স্থিরচিত্তে, নিঃশব্দে এসে নতজানু হয় ‘ঠাকুরের’ পদপ্রান্তে…