আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে আটকে বাংলার ২৯৯ পড়ুয়া

মুরতুজ আলম, সামসী : লকডাউনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আটকে পড়া পরিযায়ী শ্রমিক, ছাত্রছাত্রীদের বাড়ি ফিরিয়ে আনতে নির্দেশিকা জারি করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। তৎপর হয়েছে রাজ্য সরকারগুলিও। ইতিমধ্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে রাজস্থানের কোটা থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে বেশ কিছু শিক্ষার্থীকে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরিযায়ী শ্রমিকদের ফিরিয়ে আনতে শ্রমিক স্পেশাল ট্রেনের ব্যবস্থাও করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। কিন্তু এখনও আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে আটকে রয়েছেন এই রাজ্যের ২৯৯ জন পড়ুয়া। এর মধ্যে মালদা জেলার ৫২ জন পড়ুয়াও রয়েছেন। এবার ঘরে ফেরার দাবি জানিয়েছেন ওই পড়ুয়ারা। যদিও ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে তত্ত্বাবধানে এবং স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন জেলায় থাকা দেশের বিভিন্ন রাজ্যের পড়ুয়াদের বাসে করে বাড়ি পাঠানো হয়েছে। কিন্তু রাজ্য সরকারের উদাসীনতায় আটকে রয়েছেন ওই ২৯৯ জন বাঙালি পড়ুয়া। এমনটাই দাবি ওই পড়ুয়াদের। তাঁদের পাশাপাশি বেশ কিছু বাঙালি অধ্যাপক-অধ্যাপিকাও ভিনরাজ্যে আটকে রয়েছেন।

চাঁচল-২ ব্লকের ক্ষেমপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বিজলি গ্রামের বাসিন্দা, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএ ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র আবদুল্লা বলেন, আমার মতো অনেক নিম্নবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করতে এসেছে। হস্টেলে থাকার সুব্যবস্থা থাকলেও খাবার ও আর্থিক সংকটের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলো করোনায় আক্রান্ত হওয়ায় আমার ও বাড়ির লোকদের আতঙ্ক বাড়ছে। মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন, আমাদের বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হোক। হরিশ্চন্দ্রপুর-২ ব্লকের সাদলিচকের বাসিন্দা, মাস্টার্স চতুর্থ সিমেস্টারের ছাত্র সাদিকুল ইসলাম বলেন, প্রায় সব রাজ্যের পড়ুয়ারাই বাড়ি ফিরেছে। একমাত্র পশ্চিমবঙ্গের পড়ুয়ারা আটকে রয়েছে। বাড়িতে বাবা-মা দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের। অভিভাবকরা এখন হস্টেল খরচ পাঠাতে পারছেন না। এতে অনেক ছাত্রছাত্রী মানসিক অবসাদে ভুগছেন। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সের ছাত্রী, বৈষ্ণবনগরের নাগমা নাজ সুলতানা বলেন, রমজানের সময় খাবারের খুব সমস্যা হচ্ছে। আমরা অন্যবার রমজানে বাড়িতেই থাকি। সকালে শুধু দুধ-কলা খেয়ে রোজা ধরতে হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে কাছে আবেদন, অন্য রাজ্যে আটকে পড়া ছাত্রছাত্রীকে যেভাবে বাড়ি ফেরানো হয়েছে, আমাদেরও যেন সেভাবে দ্রুত বাড়ি ফেরানো হয়।

- Advertisement -

হরিশ্চন্দ্রপুর-১ ব্লকের তুলসীহাটার বাসিন্দা, রিসার্চ স্কলার আলি রেজা বলেন, এমনিতেই পুরো আলিগড় জেলা রেড জোনে রয়েছে। ক্যাম্পাসের মধ্যেই রয়েছে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। করোনা আক্রান্তের পরিবার ও অন্য রোগীর আত্মীয়স্বজনরা যে বাজারে কেনাকাটা করছেন, সেখানেই আমাদের কেনাকাটা করতে হচ্ছে। আতঙ্কের মধ্যে রয়েছি আমরা। আমাদের বিষয়টা রাজ্য সরকারকে গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত। আটকে থাকা বাঙালি পড়ুয়াদের প্রতিনিধিরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করছেন। বিষয়টি পশ্চিমবঙ্গ সরকারকেও জানানো হয়েছে। কিন্তু বাঙালি পড়ুয়াদের রাজ্যে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে রাজ্য সরকারের কোনও হেলদোল নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিস্ট্রার আবদুল হামিদ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পড়ুয়াদের সুরক্ষিতভাবে বাড়ি ফেরানোর দায়িত্ব নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগও করেছে কর্তৃপক্ষ। পড়ুয়াদের নিয়মমতো থার্মাল স্ক্রিনিং এবং সমস্ত সতর্কতা পালন করে বাড়ি পাঠানো হবে। রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন, বাড়ি ফেরার পর এই পড়ুয়াদের যেন আলাদা জায়গায় না রেখে হোম কোয়ারান্টিনে রাখা হয়।

এদিকে, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে আটকে থাকা মালদার ৫২ জন পড়ুয়াকে ফিরিয়ে আনার জন্য ইতিমধ্যে জেলা শাসককে আবেদন জানিয়েছে আওয়াজ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। জেলা শাসক ওই পড়ুয়াদের বাড়ি ফেরানোর আশ্বাস দিয়েছেন। সংগঠনের সদস্য অধ্যাপক মহম্মদ ইসমাইল বলেন, মালদা ছাড়াও আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে আটকে থাকা রাজ্যের সমস্ত পড়ুয়াকে বাড়ি ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরেও লিখিতভাবে আবেদন করা হয়েছে। হরিশ্চন্দ্রপুরের বিধায়ক মোস্তাক আলম সাফ জানান, রাজ্য সরকার উদাসীন। আলিগড় থেকে রাজ্যের পড়ুয়াদের বাড়ি ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে কোনও হেলদোল নেই সরকারের। এনিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আলাদা করে কথা বলব। যাতে খুব শীঘ্রই ভিনরাজ্যে আটকে থাকা রাজ্যের পড়ুয়ারা বাড়ি ফিরে আসতে পারেন, তার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করব।