৪০ শতাংশ করোনা আক্রান্তের উপসর্গ নেই, মহামারী কি তবে শেষের পথে, গবেষণায় মিলল এমনই ইঙ্গিত

1289

ওয়াশিংটন: সারা বিশ্বে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা লাফিয়ে বাড়ছে। তবে এই মুহূর্তে বেশিরভাগ দেশেই বাড়ছে উপসর্গহীন রোগীর সংখ্যা। প্রথমদিকে অনেকেরই বড় কোনও উপসর্গ থাকছে না। কিন্তু পরবর্তীতে পরীক্ষা করা হলে দেখা যাচ্ছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি করোনা পজিটিভ।

আমেরিকায় করোনা নিয়ে গবেষণা করছেন সানফ্রান্সিসকোর ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ মনিকা গান্ধি। গবেষণায় তিনি দেখেছেন, উপসর্গহীন করোনা আক্রান্তের সংখ্যাই বেশি। বস্টন হোমলেস শেল্টারে ১৪৭ জন আক্রান্তের হদিস মিলেছে। তাঁদের মধ্যে ৮৮ শতাংশেরই কোনও উপসর্গ নেই। স্প্রিংডালের টাইসন ফুডস পোল্ট্রি প্ল্যান্টের ৪৮১ জন করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। তারমধ্যে ৯৫ শতাংশেরই কোনও উপসর্গ নেই। আরকানসাস, নর্থ ক্যারোলিনা, ওহিয়ো, ভার্জিনিয়ার জেলে ৩ হাজার ২৭৭ জনের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। তাঁদের মধ্যে ৯৬ শতাংশ উপসর্গহীন। সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ মনিকা গান্ধি বলেন, ‘উপসর্গহীন করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। এটা একদিক থেকে সমাজের পক্ষে ভালো।‘

- Advertisement -

সারা বিশ্বে প্রচুর সংখ্যক মানুষ করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। অনেকেই আক্রান্তদের সংস্পর্শে এসেছেন। কিন্তু সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শরীরে সেরকম কোনও উপসর্গ দেখা যাচ্ছে না। কেনই বা তাঁদের শরীরে উপসর্গ দেখা যাচ্ছে না, কীভাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠছে, সেসব নিয়ে গবেষণা চলছে।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বিশ্বের সব দেশে করোনা ভাইরাস একইরকম প্রভাব ফেলেনি। অনেক দেশেই আক্রান্তের সংখ্যা খুবই কম। শিশুদের ওপরও খুব বেশি প্রভাব ফেলেনি। এখনও পর্যন্ত যত সংখ্যক মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, তার অধিকাংশই উপসর্গহীন।

দ্য সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন গত মাসে জানিয়েছিল, প্রায় ৪০ শতাংশ করোনা আক্রান্তই উপসর্গহীন। এই ক্লুগুলি বিজ্ঞানীদের ভাবাচ্ছে। একদল বিজ্ঞানী রিসেপ্টর সেল নিয়ে গবেষণা করছেন। আরেক দল বিজ্ঞানী দেখেছেন ফেস মাস্কের কার্যকারীতা। গত কয়েক সপ্তাহে আমেরিকার করোনা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। দেখা গিয়েছে, অনেকের মধ্যেই করোনা প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়ে গিয়েছে।

২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর যখন প্রথম SARS-COV-2 আক্রান্তের হদিস মিলেছিল, সেসময় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ভাইরাসটিকে ‘নোভেল’ বলে অ্যাখ্যায়িত করেছিলেন।  কারণ ভাইরাসটি ডিসেম্বরেই মানব শরীরে প্রথম দেখা গিয়েছিল। আর তখনও কারও শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠেনি।

গবেষকদের একাংশ প্রাথমিকভাবে মনে করছেন, বিশ্বের বিরাট সংখ্যক মানুষের দেহে ইতিমধ্যেই প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এজন্য কৃতিত্ব প্রাপ্য ‘মেমোরি’ টি সেলের। এই সেল মানব দেহের ইমিউনিটি সিস্টেমের অংশ।  শৈশবে টিকাকরণের জন্যই হয়তো কিছটা হলেও মানব শরীরে করোনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে বলে অনুমান একাংশ বিজ্ঞানীর। আবার এমনটাও হতে পারে, কোনও ব্যক্তি হয়তো SARS-COV-2 এর প্রকোপ শুরুর বহু আগে করোনা ভাইরাসের অন্য কোনও রূপের সংস্পর্শে এসে সর্দি-জ্বরে ভুগেছিলেন। সেসময়ই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির শরীরে করোনা প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এবার যখন ওই ব্যক্তি SARS-COV-2 অর্থাৎ কোভিড ১৯ এর সংস্পর্শে আসেন, তখন সেই মেমোরি সেল অ্যাকটিভ হয়ে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কোভিড ১৯ প্রতিরোধে সাহায্য করেছে। তবে সবটাই এখনও গবেষকদের অনুমানের পর্যায়ে রয়েছে। এবিষয়ে গবেষণা চলছে। বস্টন, বার্সেলোনা, উহান সহ বিশ্বের বিভিন্ন বড় শহরে প্রচুর মানুষের শরীরে সংক্রমণ ধরা পড়েছে। তবে মনে করা হচ্ছে, আরও বেশি সংখ্যক মানুষের শরীরে ইতিমধ্যেই অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে গিয়েছে।

কিছু তথ্য বিজ্ঞানীদের ভাবাচ্ছে। যেমন, সুইডেনে সেরকমভাবে লকডাউন হয়নি। কিন্ত তার পরও সেখানে আক্রান্তের হার কম। আবার ভারতের মুম্বইয়ের বস্তি এলাকাগুলিতে অনেকে আক্রান্ত হলেও, তা ভয়াবহ রূপ নিতে পারেনি। এর পেছনে আগে থেকে তৈরি হওয়া প্রতিরোধ ক্ষমতা কাজ করেছে বলে বিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করছেন।

যদিও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অ্যান্থনি ফৌসি জানান, এসব তথ্য এখনও প্রিম্যাচিয়োর। তবে কিছু ব্যক্তির শরীরে আগে থেকে থাকা প্রতিরোধ ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাহায্য করেছে, এই দাবির সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন অ্যান্থনি ফৌসি। তিনি বলেন, ‘কেন বেশিরভাগ করোনা আক্রান্তের উপসর্গ দেখা যাচ্ছে না, সেটা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। এর পেছনে হয়তো আরও অনেক অজানা ফ্যাক্টর রয়েছে। এক্ষেত্রে একটি বিষয়কে চিহ্নিত করা খুবই কঠিন।’

উল্লেখ্য, বিশ্বে প্রায় ২ কোটি মানুষের শরীরে করোনা সংক্রমণ ধরা পড়েছে। ৭ লক্ষ ৩১ হাজার ৯৬ জনের মৃত্যু হয়েছে করোনায়। আমেরিকায় এখনও পর্যন্ত ৫০ লক্ষ ৪৪ হাজার ৮২১ জনের শরীরে করোনা সংক্রমণ ধরা পড়েছে। ১ লক্ষ ৬২ হাজার ৯৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। ভারতে এখনও পর্যন্ত ২২ লক্ষ ১৫ হাজার ৭৪ জনের শরীরে সংক্রমণ ধরা পড়েছে। ৪৪ হাজার ৩৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে করোনায়। তবে গবেষকদের দাবি কিছুটা হলেও আশার আলো দেখাচ্ছে করোনায় ‘বিধ্বস্ত’ পৃথিবীকে।