দ্বিধা-ভয়ে চাইল্ডলাইনে ফোন করেও নীরব ৪০ শতাংশ

নয়াদিল্লি : বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না। চাইল্ডলাইনে অভিযোগ জানাতে ফোন করলেও অনেকের অবস্থা এমনই হয়। দিন নেই, রাত নেই, চাইল্ডলাইনের ১০৯৮ নম্বরে অনবরত ফোন বাজে। বিপদে পড়ে সাহায্য পেতে ফোন করেন অনেকে। অথচ চাইল্ডলাইনের তরফে কেউ ফোন ধরার পর প্রায়ই উলটো দিক থেকে সাড়াশব্দ মেলে না। কাঁসর-ঘণ্টার আওয়াজ, হট্টগোল, শিশুর কান্না ইত্যাদি ভেসে আসে অনেক ক্ষেত্রে। কিন্তু যে ফোন করে, সে চুপ। বলো… তুমি বলো… নির্ভয়ে বলো… আমি শুনছি ইত্যাদি বারবার বলেও জবাব পাওয়া যায় না। অনেক সময় একই নম্বর থেকে বারবার ফোন আসে। কিন্তু কিছুক্ষণ বাদে কেটে যায়।

এমন ঘটনা নিত্যদিনের বলে চাইল্ডলাইন সূত্রে খবর। শিশু নির্যাতন রোধে সর্বক্ষণের হেল্পলাইন হল চাইল্ডলাইন। ওই সূত্রে জানানো হয়েছে, সাহায্য চেয়ে যত ফোন আসে, তার ৪০ শতাংশই নীরব। অর্থাৎ ফোন করলেও অভিযোগ জানানোর অবস্থায় থাকেন না অনেকে। চাইল্ডলাইনের সঙ্গে যুক্ত এক আধিকারিক জানিয়েছেন, দেশের ৫৯৫টি জেলা এবং ভারতীয় রেলের ১৩৫টি হেল্পডেস্ককে যুক্ত করা হয়েছে এই পরিষেবায়। ওইসব জায়গা মিলিয়ে ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ২ কোটি ১৫ লক্ষ কল এসেছে, যার ৪০ শতাংশ (৮৬ লক্ষ) মিউটেড কল অর্থাৎ নীরব ফোন।

- Advertisement -

কেন এমন হয়? ওই আধিকারিকের ব্যাখ্যা, নীরব ফোনগুলি যাঁরা করেন, তাঁরা প্রায়ই স্বাভাবিক অবস্থায় থাকেন না। পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি তাঁদের কথা বলার অনুকূল থাকে না। এছাড়া ব্যক্তিগত স্তরে অভিযোগ জানাতে বা বাস্তব পরিস্থিতি বর্ণনা করতে লজ্জা, দ্বিধা, ভয়, সংকোচ ইত্যাদিও কাজ করে অনেকের মনে। অনেকের মানসিক জড়তা থাকে ফোনে কথা বলায়। অনেকে ফোন করে তখনই কেটে দেন। আবার কিছুটা পরে করেন। কেউ কেউ ফোন করে না কেটে ধরে রাখেন। কিন্তু কিছু বলেন না। তাঁদের মনের মধ্যে যুদ্ধ চলে তখন। এটা চলতে থাকে এক-একজনের ক্ষেত্রে এক-এক ভাবে।

ওই আধিকারিক বলেন, এই অবস্থায় আমরা কখনও ফোন কাটি না। অপেক্ষা করি, কখন উলটো দিকে থাকা মানুষটি কথা বলবেন। তাছাড়া অজানা নম্বরে ফোন করায় অনীহা থাকা স্বাভাবিক। কে ধরবেন, কী বলবেন, আদৌ কোনও ফল কি না, নাকি আরও জটিলতা বাড়বে, এসব সাত-পাঁচ চিন্তা করেন অনেকে। হিংসাতাড়িত, নির্যাতনের শিকার, ভীতসন্ত্রস্ত একজন মানুষের দ্বিধাদ্বন্দ্ব বেশি হওয়াই তো স্বাভাবিক। এমনও হয়েছে যে, অভিযোগ জানানোর আগে কেউ কেউ একশোবার ফোন করেছেন স্রেফ পরীক্ষা করতে।

ওই আধিকারিক জানিয়েছেন, অভিযোগকারীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেলে প্রথমে তাঁর অবস্থা ও অবস্থান জানার চেষ্টা করা হয়। কাউন্সেলিং করে তাঁকে সাহস জোগানো হয়। দেখা গিয়েছে, প্রথম দিকে যাঁরা অভিযোগ জানাতে সাহস পান না, কাউন্সেলিংয়ে পরে তাঁরাই নিজের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা গড়গড়িয়ে বলে যান। এরপর প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ করা হয় পুলিশ, হাসপাতাল ও অন্য সরকারি দপ্তরের সহযোগিতায়। নির্যাতিতের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও করা হয় সম্ভবমতো।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী অবশ্য আগের চেয়ে নীরব ফোন-এর সংখ্যা কমে এসেছে। ২০১৮ সালে ১ কোটি ১ লক্ষ কলের মধ্যে ৪২ লক্ষ মিউটেড ছিল, যা মোট কলের প্রায় ৪২ শতাংশ। ২০১৯ সালে মোট ৬৯ লক্ষ কলের মধ্যে মিউটেড কল ছিল ২৭ লক্ষ, অর্থাৎ ৩৯ শতাংশ। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চাইল্ডলাইনে ৪৩ লক্ষ ফোন এসেছে, যার মধ্যে ১৬ লক্ষ অর্থাৎ ৩৬ শতাংশ মিউটেড। এর কারণ হিসাবে নির্যাতন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সরকারি তৎপরতাকেই চিহ্নিত করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।