৬৫ বছরেও ভিক্ষাই সম্বল খতিজা বেওয়ার

মুরতুজ আলম, সামসী : বছর ছয়েক আগে গম ঝাড়ার মেশিনে হাত ঢুকে কাটা যায় ডান হাত। বাড়িতে যেটুকু জমানো টাকা ছিল তা দিয়ে সে যাত্রায় প্রাণ বাঁচান খতিজা বেওয়া। আর এই দুর্ঘটনার পরেই তাঁর জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। হাত না থাকায় কাজও জোটে না আর। অগত্যা পেটের ভাত জোগাতে ভরসা ভিক্ষা। কারণ তাঁর সাতজন সন্তান থাকলেও কেউই এগিয়ে আসেনি মায়ের দেখভাল করতে। মায়ের দাযিত্ব ঝেড়ে যে যার মতো সংসার পেতেছেন আলাদা করে। ভাগ্যের এমনই পরিহাস যে দুর্ঘটনার পর জোটেনি কোনো ক্ষতিপূরণও। খতিজা বেওয়া জানান, ক্ষতিপূরণ চাইতে গেলে শুধু আশ্বাস ছাড়া আর কিছুই মেলে না। তাই সেই হালও ছেড়ে দিয়েছি। এমনকি পঞ্চায়েত কিংবা ব্লক প্রশাসনের তরফেও কোনো সাহায্য জোটেনি কপালে।

বছর পঁয়ষট্টির খতিজা বেওয়ার বাড়ি হরিশ্চন্দ্রপুর-২ ব্লকের সুলতাননগর গ্রাম পঞ্চায়েতের রাঘবপুর-খন্তা এলাকায়। খুচখাচ কাজ করলেও স্থায়ী কাজ কোনো দিনই জোটেনি তাঁর। ফলে সংসার চালাতে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে ভিক্ষাবৃত্তিই করে চলেছেন তিনি। তবু খোঁজ নেননি কোনও ছেলে। এর মাঝেই গম ঝাড়াইয়ের কাজ করতে গিয়ে হাত খুইয়ে ফেলেন তিনি। বর্তমানে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হরিশ্চন্দ্রপুর, কুমেদপুর, কড়িয়ালি, মিলনগড় এলাকায় কখনও হেঁটে আবার কখনও ভুটভুটিতে চেপে ভিক্ষা করতে যান। বয়সের ভারে তিনি কার্যত নু্য়ব্জ। ভালোভাবে হাঁটাচলাও করতে পারেন না তিনি। তার ওপর দীর্ঘদিন ধরে তাঁর দৃষ্টিও ক্ষীণ। তবু দুমুঠো অন্ন জোগাড়ের আশায় তাঁকে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভিক্ষাবৃত্তি করতে হয়।

- Advertisement -

খতিজা বেওয়ার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুবছর আগে মৃত্যু হয় তাঁর স্বামীর। আর তারপরই তাঁর জীবনে নেমে আসে চরম আর্থিক সংকট। তাই বর্তমানে খাবারের আশায় লোকজনের দোরে দোরে ভিক্ষা করে বেড়ান তিনি। সাত সন্তানের সকলেই যে-যার মতো আলাদা সংসার পেতেছে। মা বলে কাছে টেনে নেয়নি কোনো ছেলেই। কোনো দিন আধপেটা খেয়ে আবার কোনো দিন না খেয়ে দিন কাটাতে হয় তাঁকে। আত্মীয়স্বজনরাও তাঁর কোনো খোঁজখবর নেয় না। বয়স্ক ভাতা পাওয়ার কথা থাকলেও প্রতিমাসে তা পান না তিনি। বিধবা ভাতার জন্য পঞ্চায়েত প্রধানকে বলেও কোনো কাজের কাজ হয়নি বলে অভিযোগ খতিজা বেওয়ার।

খতিজা বেওয়া আরও জানান, তাঁর স্বামীর দুটি বিয়ে। প্রথম স্ত্রীর ৬ সন্তান বিয়ে করে আলাদা আলাদা সংসার পেতেছে। প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর খতিজা বেওয়ার সঙ্গে বিয়ে হয়। পরে তাঁরও একটি পুত্রসন্তান হয়। কিন্তু সেও ১০ বছর আগে বিয়ে করে আলাদা হয়ে যায়। বাস্তুহারা খতিজা বেওয়ার তাই ঠাঁই হয়েছে রেললাইনের ধারে বনবাড়িতে। ছোট্ট একটি জরাজীর্ণ ঘরে তাঁর বসবাস। বর্ষার সময় জল চুঁইয়ে পড়ে তাঁর ঘরের মেঝেতে। ট্রেনের শব্দে ঘুমও হয় না রাতে। তাই বৃদ্ধ বয়সে শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা রকমের অসুখ। তিনি জানান, যদি সরকারি কোনোরকম আর্থিক সহযোগিতা পাই তাহলে এই বয়সে আর ভিক্ষা করতে হয় না।

সুলতাননগর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান অহেদা খাতুন বলেন, পঞ্চায়েতের তরফে খতিজা বেওয়াকে ত্রাণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি তাঁর জন্য পাকা ঘর নির্মাণের বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে ভাবা হবে। এব্যাপারে হরিশ্চন্দ্রপুর-২-এর বিডিও প্রীতম সাহা বলেন, ওই মহিলার প্রতিবন্ধী সার্টিফিকেট থাকলে তাঁকে মাসিক প্রতিবন্ধী ভাতা কিংবা বার্ধক্য ভাতা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে ভাবা হবে।