নার্সিংহোমে গেলেই গুনতে হচ্ছে ৬-৭ লক্ষ টাকা

রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি : কোভিডের চিকিৎসাই শুধু নয়, যে কোনও চিকিৎসার জন্য বেসরকারি হাসপাতাল এবং নার্সিংহোমে গেলে লক্ষ লক্ষ টাকা বিল মেটাতে হচ্ছে। শিলিগুড়িতে ফের এমনই অভিযোগ উঠছে। কিন্তু কী কারণে এত বিল হচ্ছে তার কোনও জবাব নেই স্বাস্থ্য দপ্তর বা সাধারণ মানুষের কাছে। অথচ রোগীকে সুস্থ করতে গিয়ে ভিটেমাটি বিক্রি করে হলেও দাবিমতো টাকা মেটাতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, স্বাস্থ্য দপ্তর কেন বিষয়গুলি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না? করোনা মোকাবিলায় স্বাস্থ্য দপ্তরের ওএসডি (উত্তরবঙ্গ) তথা ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (আইএমএ)-এর উত্তরবঙ্গের আহ্বায়ক ডাঃ সুশান্ত রায় বলেন, আমিও অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর এবং জেলা প্রশাসনের দেখা দরকার। দার্জিলিংয়ে মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ প্রলয় আচার্য বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন।

শিলিগুড়িতে সব মিলিয়ে ৪৫টির মতো বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোম রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে ১৪-১৫টি নার্সিংহোমে কমবেশি করোনা রোগীদের রেখে চিকিৎসা করা হচ্ছে। প্রথমদিকে কোনও নার্সিংহোমই করোনার চিকিৎসা করতে রাজি না হলেও ধীরে ধীরে অনেক নার্সিংহোম এবং বেসরকারি হাসপাতালেই এর চিকিৎসা শুরু হয়েছে। কেন-না, অন্য উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রোগীরা নার্সিংহোমে থেকেই করোনায় সংক্রামিত হচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে শিলিগুড়িতে প্রায় সমস্ত বেসরকারি হাসপাতাল এবং নার্সিংহোমই লক্ষ লক্ষ টাকা লুটছে রোগীদের কাছ থেকে বলে অভিযোগ। তা সে করোনায় সংক্রামিতই হোক বা অন্য কোনও উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রোগী। প্রত্যেকের কাছেই চিকিৎসার খরচ বাবদ অন্তত ৪০-৫০ শতাংশ বেশি অর্থ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ।

- Advertisement -

করোনা সংক্রামিত রোগীদের চিকিৎসা খরচ বাবদ যে টাকা নেওয়া হচ্ছে, তার পুরোটার পাকা বিল দেওয়াও হচ্ছে না রোগীর পরিজনদের। যেটুকু বিল দেওয়া হচ্ছে তার মধ্যে অক্সিজেন সরবরাহ বাবদ আড়াই থেকে তিন লক্ষ টাকা পর্যন্তও নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। এছাড়া দিনে যতবার চিকিৎসক দেখবেন তাঁর ফি ১,০০০-১,৫০০ টাকা, রেসিডেন্সিয়াল মেডিকেল অফিসার (আরএমও)-এর ফি ৭০০-৮০০ টাকা, এছাড়া নার্স সহ অন্যদের খরচ তো আছেই। এর সঙ্গে জুড়ছে পিপিই, মাস্ক এবং স্যানিটাইজারের খরচ। প্রতিদিন পিপিই, মাস্ক, স্যানিটাইজারের জন্যই ৮,০০০-১০,০০০ টাকা বিল করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। শুধু কোভিডে সংক্রামিত রোগীই নয়, সাধারণ কোনও অসুখ নিয়ে বা দুর্ঘটনার শিকার হলে বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হলেও লক্ষ লক্ষ টাকা বিল নেওয়া হচ্ছে। রোগীর পরিজনদের অভিযোগ, নার্সিংহোম থেকে বলা হচ্ছে কার শরীরে করোনা রয়েছে, কার নেই সেটা বোঝা সম্ভব নয়। তাই রোগীদের সতর্কতার স্বার্থে সমস্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা নিয়ে চিকিৎসা করা হচ্ছে। সেইজন্যই কোভিড ছাড়াও অন্য রোগীদের ক্ষেত্রেও বিলের সঙ্গে পিপিই, মাস্ক, স্যানিটাইজারের বিল জুড়ছে।

আর এভাবে দু-তিনটি বেসরকারি হাসপাতাল লক্ষ লক্ষ টাকা বিল লুটতে শুরু করায় একে একে অন্য হাসপাতাল এবং নার্সিংহোমগুলিও একই পথ নিয়েছে। এক-একটি বেসরকারি হাসপাতাল এবং নার্সিংহোমে অক্সিজেন দেওয়ার নামেই রোগীর কাছ থেকে লক্ষাধিক টাকা নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া এমন কিছু ওষুধ, ইনজেকশন ইত্যাদির খরচ দেখানো হচ্ছে যা কার্যত অবাস্তব। বিষয়টি নিয়ে কোনও নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষই সরাসরি কথা বলতে চায়নি। তবে, কোনও রোগীর শরীরে ২৪ ঘণ্টা অক্সিজেন চললেও বিল ১৫০০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয় বলে নার্সিংহোমের পক্ষে জানানো হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের দার্জিলিং জেলা সভাপতি রঞ্জন সরকার বলেন, আমার কাছেও এমন বেশ কিছু অভিযোগ এসেছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। দু-একটি ক্ষেত্রে বিল কিছুটা কাটছাঁট করা হয়েছে। আমি নিজে একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলাম। আমার যা বিল এসেছে তাতে আমি সন্তুষ্ট। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এত বিল কেন আসছে তা স্বাস্থ্য দপ্তরকে দেখতে হবে। মানুষের হয়রানি এভাবে মেনে নেওয়া যায় না।