বাবাকে ভিনরাজ্যে যেতে দেবে না, মোথাবাড়িতে আইসক্রিম বেচছে ৯ বছরের ছেলে

661

তনয় মিশ্র, মোথাবাড়ি : তিন মাস ধরে ৯ বছরের ছোট্ট ছেলে রাকিবুল শেখ শুনেছিল মুম্বইতে কেমন কষ্টে দিন কাটাচ্ছে তার বাবা। সেই থেকেই মনে মনে ঠিক করে নেয়, বাবা এবার একবার বাড়ি ফিরে এলে আর কিছুতেই তাঁকে ভিনরাজ্যে য়েতে দেবে না। বহু কাঠখড় পুড়িয়ে অবশেষে জুন মাসে গ্রামে ফেরেন রাকিবুলের বাবা। আর তখনই সংসার চালানোর দাযিত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেয় রাকিবুল। ছোট হলেও মনে দৃঢ়তার কমতি নেই তার। তাই এইটুকু বয়সেই গ্রামে গ্রামে ঘুরে আইসক্রিম বিক্রি করতে শুরু করে সে। লাভ যে প্রচুর কিছু হয়, তা নয়। তবে মনে এটুকু সান্ত্বনা জোটে যে, বাবা বাড়িতেই থাকবে। বহু কষ্টে আঁকড়ে ধরা ইচ্ছেকে সে কিছুতেই আগলছাড়া করতে রাজি নয়।

পঞ্চনন্দপুরের দালবক্সটোলা গ্রামে বাড়ি ৯ বছরের রাকিবুল শেখের। তার বাবা সেনাউল শেখ মুম্বইতে কাজ করেন। রাকিবুল ছাড়াও সেনাউলের ৬ বছরের আরও এক ছেলে রয়েছে। দুই ভাই স্থানীয় জিতনগর হাসানটোলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। রাকিবুল পড়ে চতুর্থ শ্রেণিতে এবং তার ভাই আকিবুল শেখ দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। সেনাউল বছরের ১০ মাসই থাকেন মুম্বইতে। গত কয়েক মাসে করোনা ও লকডাউনের কারণে ভিনরাজ্যেই আটকে পড়েন তিনি। জুনের প্রথম সপ্তাহে বাড়ি ফিরে আসেন সেনাউল শেখ। বাবার মুখেই রাকিবুল শোনে যে, গত তিনমাসে কী অভাবনীয় দুঃখকষ্টের মধ্যে দিয়ে দিন কাটিয়েছেন তিনি। এরপরই সে সিদ্ধান্ত নেয় যে, যাই হয়ে যাক, গ্রামে যত কষ্টই হোক বাবাকে আর কিছুতেই ভিনরাজ্যে কাজে যেতে দেবে না। প্রয়োজন হলে নিজেই রোজগার করবে সে। এরপর যেমন ভাবা তেমন কাজ। হঠাৎই সে খোঁজ পায় স্থানীয় একটি আইসক্রিম কোম্পানির। সারাদিনে ১০০টি  আইসক্রিম  বিক্রি করলেই কমিশন বাবদ তার রোজগার হয় ৫০ টাকা। তবে এতেই খুশি রকিবুল। এখন স্কুল বন্ধ। সকালবেলা পড়াশোনা করেই পেপসির বাক্স নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ে। ঘুরে বেড়ায় এই গ্রাম থেকে ওই গ্রামে। দালবক্সটোলা থেকে লোহার্দিটোলা, লয়মনটোলা, আলাদিটোলা সহ বিভিন্ন গ্রামে ফেরি করতে থাকে আইসক্রিম। এক বেলা আইসক্রিম বিক্রি করে তার যা রোজগার হয় তার পুরোটাই সে তুলে দেয় মায়ের হাতে। রাকিবুল বলে, শুনেছি ভিনরাজ্যে কাজ করতে গিয়ে অনেকের বাবা মারা গেছে। আমার বাবা বাড়ি ফিরে এসেছে এই অনেক। আমি চাই না আমার বাবা আবার অন্য জায়গায় কাজে যাক। পেপসি-আইসক্রিম বিক্রি করে কোনওদিন ৫০ টাকা আবার কোনওদিন ১০০ টাকা পর্যন্ত রোজগার হয়। সেই টাকা আমি মায়ের হাতে তুলে দিই।

- Advertisement -

রাকিবুলের মা আজমিরা বিবি জানিয়েেন, লকডাউনের সময় খবর পেতাম মানুষটা মুম্বইতে কতটা কষ্ট পেতেন। আমার মনে হয়, না খেয়ে থাকলেও নিজের বাড়িতে থাকা অনেক আনন্দের। তাই ছেলের মতো আমিও চাই স্বামী য়েন বাইরে না যায়। সেজন্য আমিও বিড়ি বাঁধার কাজ শুরু করেছি। স্বামী যদি গ্রামে ১০০ দিনের কাজ পায়, তাহলে আমাদের খুব উপকার হবে। এবিষয়ে সেনাউল হক বলেন, এখানে য়ে পরিশ্রম করে আমি দৈনিক ৫০০ টাকা রোজগার করি,  মুম্বইতে একই পরিশ্রমে দ্বিগুণ টাকা। তাই কষ্ট হলেও আমাদের বারবার সেখানেই চলে যেতে হয়। যদিও পরিবারের ইচ্ছা আমি যেন আর না যাই। কিন্তু এখনও পর্যন্ত ঠিক করিনি, কী করব। তবে এলাকায় ১০০ দিনের কাজ পেলে অবশ্যই করব। নাবালক রাকিবুলের কথা ভেবে এগিয়ে এসেছে স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত। পঞ্চায়েতের প্রধান রিজিয়া বিবি বলেন, রাকিবুলের পরিবার খুব দুঃস্থ। রাকিবুলের ভাবনাকে আমরা মর্যাদা দিই। রাকিবুলের বাবা যদি ফর্ম ফিল আপ করে ১০০ দিনের কাজ চান, আমরা অবশ্যই তাঁকে কাজ দেব।