অমিল সরকারি সাহায্য, শাক-পাতা খেয়েই দিনপাত হচ্ছে অভিভাবকহীন নাবালিকার

272

হরিশ্চন্দ্রপুর: বহু আগেই সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে নতুন সংসার পেতেছে বাবা। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মাস ছয় আগে প্রাণ হারিয়েছেন মা অন্যদিকে বিয়ে করতেই শ্বশুরবাড়িতে সংসার পেতেছেন দাদা। এমতবস্থায় পেটের ভাত জোগার করতে কোনওমতে দিনমজুরি করে চলেছেন বছর ১৫-এর দুলি খাতুন। মেলেনি কোনও প্রকার সরকারি সাহায্য। ফলত যেদিন কাজ জোটে না সেদিন অনাহারে অর্ধাহারে থাকতে হয় দুলিকে। কখনও আবার কচুপাতা বা হেলেঞ্চা শাক দিয়েই খিদের জ্বালা মেটাযতে হয় তাঁকে।

হরিশ্চন্দ্রপুর থানা এলাকার মহেন্দ্রপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বাংরুয়া গ্রামের বাসিন্দা দুলি খাতুন। একচিলতে ভাঙাচোরা মাটির বাড়িতে কোনোক্রমে রাত কাটে তার। জীবন যুদ্ধে হার না মানা এই নাবালিকার দুয়ারে সরকার পৌঁছোয়নি। শুধু তাই নয়, দিন মজুরি করে পেটের ভাত জোগার করা ওই নাবালিকার বাড়ি দোড়গোরায় পা মাড়াননি কোনও নেতা-মন্ত্রীরাই। যদিও দুলি খাতুনের বাড়ির ঢিল ছোড়া দূরত্বেই স্থানীয় এক তৃণমূল নেতা এবং শাসকদলের এক জন-প্রতিনিধির বাড়ি। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠছে, তবে কি প্রদীপের নিচেই অন্ধকার!

- Advertisement -

চলতি শিক্ষাবর্যে তুলসীহাটা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্রী দুলি। দিনমজুরির পাশাপাশি কোনওমতে নিজের পড়াশুনো এগিয়ে নিয়ে চলেছে সে। বাড়ির বারান্দায় বসে অশ্রুসজল চোখে দুলি খাতুন জানালেন, ‘একা মেয়ে, ভয়ে রাত্রে ঘুমাতে পারি না। ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যায় বাড়িঘর ভেঙে পড়ার পর থেকে ত্রিপল দিয়ে একপ্রকার মাথা গুঁজে পড়ে আছি। অনেকবার প্রশাসনের দ্বারস্থ হওয়ার পরও মেলেনি কোনোও সাহায্য। রেশনের চাল ও সবুজ সাথী সাইকেল পেলেও মেলেনি আবাস যোজনার ঘর, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা তো দূর অস্ত। অমিল স্বাস্থ্য সাথী কার্ডও। অন্যের কাছে সাহায্য চাইতে গেলে মানুষ চরিত্রে দাগ লাগায় সেই ভয়ে একাই লড়ে যাওয়ার পথ বেছে নিয়েছে বছর ১৫-এর ওই নাবালিকা। এক নিঃশ্বাসে শক্ত চোয়ালে কথাগুলি জানাল লড়াকু মেয়ে।

দুলি খাতুনের প্রতিবেশী নুরজাহান বিবি বলেন, ‘ওরা দুই ভাই বোন। ছেলেটা মাঠাঘাটে কাজ করে। মেয়েটা কোনোও রকমে এখানে ওখানে মজুরির কাজ করে দিন চালায়। বাড়ি ঘর বলতে প্লাস্টিকের একটা ত্রিপল। কখন যে কুকুর, গিদর হামলা করবে তার ঠিক নেই। একটা যুবতী মেয়ে একা একা থাকে, রাতে ভয়ে ঘুমাতে পারে না। মেয়েটা কোনোও সরকারি সাহায্য পায়নি। ওকে প্রশাসনের সাহায্য করা উচিত।’

কথায় কথায় দুলি খাতুন জানালেন, খাওয়ার মতো কিছু নেই। যেদিন কাজ করতে পারি না সেদিন না খেয়ে থাকতে হয়। মা ক্যান্সারে মারা গেছেন। আমি জন্মানোর আগেই বাবাও ছেড়ে গেছেন আমাদের ছেড়ে। মায়ের ক্যান্সার ধরা পড়লে যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করেছিলাম কিন্তু বাঁচাতে পারিনি। তাতে যতটুকু সম্বল ছিল তাও চলে গেছে। বহুবার প্রশাসনের কাছে গিয়েছি কোনোও সাহায্য পাইনি। তাঁরা বলেছে আমরা কী করব?’

জেলা পরিষদের শিশু নারী ও ত্রাণ কর্মাধ্যক্ষ মর্জিনা খাতুন জানান বিষয়টি শুনেছি। আমি যথাসাধ্য আমার তরফে চেষ্টা করব, যাতে ওই মেয়েটিকে দারিদ্র্যের অন্ধকার থেকে তুলে আনা যায়। নির্বাচনী বিধি ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। তাই এখন কোনও সরকারি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া সম্ভব হবে না। আমি চেষ্টা করছি এর মধ্যেও কিছু করা যায় কিনা।