ডুয়ার্সের অখ্যাত জায়গাও হতে পারে লোভনীয় গন্তব্য

নিউজ ব্যুরো : গত লোকসভা ভোটের কথা। মানে তখনও করোনা অসুরের চেহারা দেখেনি দুনিয়া। ভোটের কভার করতে কলকাতা থেকে একদল সাংবাদিক এসেছিলেন আলিপুরদুয়ারে। শহর থেকে কিছুটা দূরে থাকবেন, নিরিবিলিতে। সারাদিন শহরে এসে কাজ করে সন্ধ্যা নাগাদ হোটেলে ফিরে কপি পাঠিয়ে একটু অবসর কাটাবেন- এমনই ইচ্ছা। তখনও ওয়ার্কেশন ডেস্টিনেশন-এর মতো পরিচিতি পায়নি এই কনসেপ্ট। উত্তরবঙ্গের এক টুর অপারেটর জানালেন, আলিপুরদুয়ার শহরের কাছে সিকিয়াঝোরায় ওই সাংবাদিকদের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। শহর থেকে আধঘণ্টার ড্রাইভ। রিসর্টে সুইমিং পুল, ভালো ঘর, জেনারেটর সবই ছিল। খাবারের মানও বেশ ভালো। মানে অন্য পরিষেবায় তেমন খামতি ছিল না। কিন্তু ইন্টারনেটের স্পিড এতটাই খারাপ যে, এক রাত থেকেই চেক আউট করে শহরে চলে আসেন সাংবাদিকরা।

এটাই বাস্তব। পাহাড়ে ইন্টারনেট পরিষেবা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ওয়ার্কেশন ডেস্টিনেশনের জন্য যতটা সাহায্য করেছে ডুয়ার্সের ক্ষেত্রে ততটাই সমস্যা তৈরি করেছে। অথচ অন্য পরিকাঠামোর দিক থেকে ডুয়ার্স কিন্তু অনেকটাই এগিয়ে ছিল। যেমন ধরা যাক গজলডোবা-গরুমারা-চাপড়ামারি সার্কিটের কথা। এই সার্কিটকে ডুয়ার্সে টুরিজমের হটস্পট বলা চলে। সরকারি-বেসরকারি টুরিজম প্রপার্টি নিয়ে এসব জায়গায় কোনও সমস্যা নেই। গজলডোবার সরকারি কটেজ তো বটেই, বেসরকারি ব্যবস্থাও এখন যথেষ্ট ভালো। শিলিগুড়ি বা জলপাইগুড়ি থেকে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সড়কপথে পৌঁছে যাওয়া যায়। তিস্তায় বোটিং বা পক্ষীবিতানে পাখি দেখার পাশাপাশি নিরিবিলিতে কাজ করার আদর্শ জায়গা। একই কথা বলা যায় মাল, টিলাবাড়ি, মূর্তির সরকারি টুরিজম প্রপার্টি বা চালসা ও লাটাগুড়ির একাধিক বেসরকারি টুরিজম প্রপার্টি সম্পর্কে। এসব জায়গার পরিবেশ, শহর থেকে দূরত্ব, সড়ক যোগাযোগ, পরিষেবা- কোনও কিছুতেই সমস্যা নেই। সমস্যার জায়গা সেই ইন্টারনেট আর বিদ্যুৎ পরিষেবা। দিনের মধ্যে কতক্ষণ বিদ্যুৎ থাকবে তা পুরোপুরি অনিশ্চিত। আর ফোর জি স্পিডের জায়গায় টু জির বেশি স্পিড যে মিলবে না, তা প্রায় নিশ্চিত।

- Advertisement -

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর আলিপুরদুয়ার জেলা টুরিজম ডিস্ট্রিক্ট করার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর রাজত্বের প্রায় ১০ বছরেও আলিপুরদুয়ারের পর্যটন সেভাবে গতি পায়নি। যেভাবে গজলডোবা বা লামাহাটাকে মুখ্যমন্ত্রী পর্যটন মানচিত্রে তুলে এনেছেন সেভাবে গারুচিরা, সিকিয়াঝোরা, চিলাপাতা, মেন্দাবাড়ি প্রচার পায়নি। আলিপুরদুয়ার জেলার পর্যটন পুরোপুরিভাবেই জলদাপাড়া ও বক্সানির্ভর। মাদারিহাট ও হলংয়ে সরকারি বনবাংলো বরাবরই পর্যটকদের সেরা পছন্দের তালিকায় থাকে। আর হলং তো বিদেশি পর্যটকদের কাছেও হটস্পট। এমন হলং বাংলোতেও কিন্তু ইন্টারনেট পরিষেবা নিয়ে সমস্যা।

গজলডোবাকে আনলক পর্বে খুলে দেওয়ার অনুমতি চেয়ে ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েছে পর্যটন দপ্তর। দপ্তরের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর সজল সরকার বলেন, আমরা জলপাইগুড়ি জেলা প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করেছি। আশা করছি দ্রুত অনুমতি পাওয়া যাবে। তারপর বুকিং চালু করা হবে। গজলডোবায় তিনতারা হোটেলের মালিক প্রবীর শীলও বলেছেন, ২৩ জুন থেকে পর্যটকরা আসছেন। শনি ও রবিবার প্রচুর ভিড় হচ্ছে। এখন নেটে বুকিং হচ্ছে। নিরিবিলি পরিবেশে কাজ করার মানসিকতা নিয়ে অনেক পর্যটক বুকিং করছেন। নেট পরিষেবায় খামতি নেই।

হিমালয়ান হসপিটলিটি অ্যান্ড টুরিজমের অন্যতম কর্তা সম্রাট সান্যাল মনে করছেন, গরুমারা, জলদাপাড়া বা বক্সা- সব জায়গাতেই সরকারিভাবে এখনও পর্যটনের জন্য অনেক কিছু করা যায়। যেমন, পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট গরুমারার কালামাটি, রামশাই বা ধূপঝোরা ওয়ার্কেশন ডেস্টিনেশনের আদর্শ জায়গা হতে পারে। এসব জায়গায় যে সরকারি-বেসরকারি প্রপার্টি আছে সেগুলির মান নিয়ে তেমন অভিযোগ নেই। তবে, শুধু ইন্টারনেট নয়, এখানকার সড়ক যোগাযোগের দিকেও সরকারকে নজর দিতে হবে। আবার জলদাপাড়ায় মাদারিহাট, হলং পরিচিতি পেলেও পূর্ব জলদাপাড়ায় শিসামারা পর্যটকদের কাছে তেমন পরিচিতি পায়নি। অথচ এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভোলা যায় না। তাই চিলাপাতা, শিসামারার মতো তুলনায় অখ্যাত জায়গাকে ওয়ার্কেশন ডেস্টিনেশনের নতুন কনসেপ্টে জায়গা করে দেওয়া যায়। আবার জয়ন্তী বা রাজাভাতখাওয়াতেও বন দপ্তর এমন পরিকাঠামো তৈরি করলে পর্যটকের অভাব হবে না। মনে রাখতে হবে, পর্যটন দপ্তরের পাশাপাশি ডুয়ার্সে ওয়ার্কেশন ডেস্টিনেশনে বন দপ্তরেরও গুরুত্বপূর্ণ ভমিকা আছে।

রায়গঞ্জের কুলিক পক্ষীনিবাসও এভাবেই ওয়ার্কেশন ডেস্টিনেশন হয়ে উঠতে পারত। সরকারি ভাড়া খুবই কম হওয়ায় মধ্যবিত্ত কর্মচারীদের কাছেও একটু অবসর তথা কাজের জায়গা হতে পারত এই পাখিরালয়। নানা ফুলের গাছ আর পাখির মাঝে বসে কাজ করার অনন্য অভিজ্ঞতা হতে পারত সাধারণ কর্মীদেরও। আপাতত করোনা যোদ্ধাদের জন্য এই পক্ষীনিবাসের সরকারি লজটি বরাদ্দ। তাই উত্তর দিনাজপুর তথা গৌড়বঙ্গের মানুষের ঘরের কাছে ওয়ার্কেশন ডেস্টিনেশন এখনও তৈরি হয়নি।