লকডাউনের জেরে মানসিক অবসাদ, গলায় ফাঁস দিলেন বৃদ্ধ

387

বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ: লকডাউনের জেরে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন রায়গঞ্জ শহরের দেবীনগরের বাসিন্দা অজয় সাহা। এদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রাতরাশ করেন। চা বিস্কুট খাওয়ার পর শোওয়ার ঘরে গিয়ে দরজা আটকে দেন। তবে তার আচরণে একবারও টের পাইনি পরিবারের লোকজন। শোওয়ার ঘরের সিলিংয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে যখন ঝুলছে তখন তাঁকে ডাকাডাকি করতে ব্যস্ত বাড়ির লোকেরা। কিন্তু সাড়া পাওয়া যায়নি। জানালা ভেঙে দেখা যায় সিলিংয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলছে ওই প্রৌঢ়। খবর যায় রায়গঞ্জ থানায় পুলিশ দরজা ভেঙে মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। এদিন বিকেলে মৃতদেহ ময়নাতদন্তের পর পরিবারের হাতে তুলে দেয় রায়গঞ্জ থানার পুলিশ। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃত ওই বৃদ্ধের নাম অজয় সাহা (৭০)। রায়গঞ্জ পুরসভার ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূলের কাউন্সিলর অভিজিৎ সাহা বলেন, ‘লকডাউনের পর থেকেই আমার শ্বশুর মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন। এর আগে সকালে ও বিকেলে প্রায় দুই কিলোমিটার হাঁটাহাঁটি করতেন। চায়ের দোকানে আড্ডাও দিতেন। কিন্তু লকডাউনের পর থেকে বাড়ি থেকে বের হননি। মানসিক অবসাদের জেরেই মৃত্যু হল শ্বশুরের।’

লকডাউনের পর থেকে রায়গঞ্জ মহকুমার বিভিন্ন ব্লকের প্রায় ২৩ জন মানসিক অবসাদে আত্মহত্যা করেছেন বলে ময়নাতদন্তের চিকিৎসক আরবি ঘোষ জানিয়েছেন। লকডাউনের সময় প্রবীণ নাগরিকদের মানসিক অবস্থার সামান্য পরিবর্তন হলেই পরিবারের সদস্যদের নির্দিষ্ট হেল্পলাইন নম্বরে ফোন করতে বলা হয়েছে। দেবীনগর জাগরী থিয়েটার গ্রুপের তরফে বিশেষ সহায়তা প্রকল্পের নাম রাখা হয়েছে ‘মনের জানালা’। একই সঙ্গে তাদের পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, যদি বাড়ির বয়স্ক মানুষের কোন পুরানো সখ বা হবি থাকে, তাহলে অতি অবশ্যই যেন সেগুলো করার ব্যাপারে প্রবীণ মানুষদের উৎসাহ দেওয়া হয়। জাগরী থিয়েটার গ্রুপের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, করোনার সংক্রমণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি রয়েছে ৬০ বছর ও তার বেশি বয়সের প্রবীণ মানুষদেরই। তবে শুধুমাত্র শারীরিক অসুস্থতা তাই নয়। টানা লকডাউনের জেরে অনেক সময় বয়স্কেরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। তাই এই পরিস্থিতিতে তাদের পাশে দাঁড়াতে উদ্যোগী হয়েছেন দেবীনগর জাগরী থিয়েটার গ্রুপের সদস্যরা।

- Advertisement -

জেলার শিক্ষাবিদ তথা হাতিয়া হাইস্কুলের ইংরেজির শিক্ষক তপন ব্রহ্ম বলেন, ‘কোনও প্রবীণ ব্যক্তি যদি দিনের বেলায় নিস্তেজ হয়ে থাকেন, কেউ ডাকলেও যদি ঠিকমতো সাড়া না দেন, কিংবা অসংলগ্ন কথা বলেন, তাহলে অতি দ্রুত যোগাযোগ করতে পারবে পরিবারের সদস্যদের। শুধু তাই নয় এই ক্ষেত্রে যদি বোঝা যায় প্রবীণ মানুষটি তার নিকট আত্মীয়দের ঠিকমতো চিনতে পারছেন না তাহলে দ্রুত হেল্পলাইন নম্বরে যোগাযোগ করতে হবে। লকডাউন আরও বেড়েছে। ঘরবন্দী থেকে দমবন্ধ অবস্থা শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলের। তৈরি হচ্ছে নানা রকম মানসিক সমস্যাও। বাড়ছে অবসাদ। সমস্যা মুক্তির উপায় বলে দেবেন বিশিষ্ট মনোবিদ ও মনস্তত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা। থাকবেন মানসিক রোগীর চিকিৎসক সবটাই নিখরচায়। বুধবার থেকে চালু হল দেবীনগর জাগরী থিয়েটার গ্রুপের বিশেষ সহায়তা প্রকল্প ‘মনের জানালা’। থিয়েটার গ্রুপের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাড়িতে আলাদা করে না রেখে কথা বলতে হবে আত্মীয়দের সঙ্গে। একটিমাত্র ঘরে নিজেকে বন্দী করে না রেখে প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তবে লক্ষ রাখতে হবে কোন ভাবে যাতে সামাজিক দূরত্ব এবং লোকজনের জমায়েত এড়িয়ে যাওয়ার নিয়মের লংঘন না ঘটে।