নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক

501

উষসী চক্রবর্তী (অভিনেত্রী)

এবারের লোকসভা নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশ কোনদিকে যাবে, দেশের আসল সমস্যাগুলো কী, তা চিহ্নিত করার জন্য এবারের লোকসভা নির্বাচন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আমরা একটা ভারতবর্ষে জন্মেছিলাম। দেশটা সেরকমই থাকবে নাকি সম্পূর্ণ একটা অন্যরকম ভারতে পরিণত হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভোট এটা। আমি সবাইকে এজন্যই বলতে চাইব, ভেবেচিন্তে নিজের ভোটটা দেবেন।

এমনিতে আমাদের দেশের নির্বাচনকে আমার উৎসবের মতোই মনে হয়। বেশ মনে হয়, গণতন্ত্রের উদ্‌যাপনই হচ্ছে। তার কিছু ভুলভ্রান্তি নিশ্চয়ই থাকে, কিন্তু এসব সত্ত্বেও এটা আমার কাছে গণতন্ত্রের উদ্‌যাপন। লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় বেরিযে পড়েন। সাজোসাজো রব। বিভিন্ন দলের প্রচারে নানারকম দেয়াল লিখন। কিন্তু এগুলোর পাশাপাশি যেটা বলব, মানুষের উচিত সচেতনভাবে ভোট দেওয়া। দুম করে গিয়ে ভোট দিয়ে এলাম, তা নয়। আমরা কী চাই? কোন জিনিসগুলো আমাদের জীবনে প্রাথমিক গুরুত্ব পাবে, সেটা বুঝতে হবে। ধর্ম গুরুত্ব পাবে? নাকি রুটিরুজি? নাকি আমাদের দেশের সার্বভৌমত্ব? প্রায়রিটি কোনটা? এগুলো বিচার-বিবেচনা করে ভোট দেওয়া উচিত।

ইদানীং রাজনীতি অনেক রঙিন হয়ে গিয়েছে, যেটা আগে পশ্চিমবঙ্গে সেভাবে হত না। এখন দেখা যাচ্ছে দক্ষিণ ভারতের মতো এখানেও অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী ভোটে দাঁড়াচ্ছেন। ফলে রাজনীতিতে অন্য রকমের গ্ল্যামার এসে গিয়েছে। এটা ভালো না খারাপ, সে বিতর্কে যাচ্ছি না। কিন্তু এটা একটা নতুন ব্যাপার বইকি।

কিন্তু এসব তো গেল নির্বাচন নিয়ে কথা। এখানে সবচেয়ে যেটা জরুরি দিক, সেটা হল আমি কী চাইছি নির্বাচন থেকে? প্রথমেই আমি চাইছি, মেয়েদের নিরাপত্তা। নিরাপত্তা মানে কিন্তু এই নয় যে, আমি মহিলাদের জন্য প্রোটেকশন চাইছি। তা নয়। মেয়েদের প্রোটেকশন দেব, এই কথাটার মধ্যে একধরনের গোপন পুরুষতন্ত্র আছে বলে আমি বিশ্বাস করি। নিরাপত্তা মানে হল, আমি যখন খুশি বাড়ি থেকে বেরোব, যখন খুশি ফিরব। যেমন খুশি জামাকাপড় পরব এবং আমার কিছু হবে না। আই উইল বি সেফ এনাফ ইন দ্য স্ট্রিট, ইন দ্য পাবলিক প্লেসেস। আমাকে কেউ প্রোটেক্ট করবে, তা নয়। আমি সুরক্ষিত থাকব। রাষ্ট্র তার নিজস্ব ব্যবস্থা দিয়ে আমার জন্য সুরক্ষাকবচ রাখবে। আমি নেমন্তন্ন খেতে যাই, আমি গাড়ি চালিযে ফিরি অথবা আমি রাত ১১টা-১২টায় বাড়ি ফিরি, যেভাবে একটা ছেলে ফিরতে পারে নির্ভয়ে নির্দ্বিধায। কেউ এসে বলবে না যে, তুমি এই জামাকাপড় পরলে লাঞ্ছিত হবে। এটা আমার মূল চাওয়া, যেকোনো সরকারের কাছ থেকে। আমার দ্বিতীয় চাওয়া হল, ব্যক্তিজীবনে আমি কী খাব, কার সঙ্গে ঘুরব, কোথায় বসে প্রেম করব, অর্থাৎ আমার ব্যক্তিগত যে যাপন, ব্যক্তিগত পছন্দ, পছন্দ করার যে অধিকার, সেখানে রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে না। আমি এমন একটা সরকার চাইব, যে আমার ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলাবে না।

আমরা একটা গণতান্ত্রিক দেশে বাস করি। আমাদের দেশের সংবিধানে মৌলিক অধিকার বলে একটা অধ্যায় আছে। আমি চাইব আমার মৌলিক অধিকারের মধ্যে রাষ্ট্র ঢুকবে না। যেকোনো সভ্য দেশে যেরকম হয়ে থাকে আর কি। তিন নম্বর, আমি চাই আমার কাজের পরিবেশের মধ্যে অর্থাৎ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে যেন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না থাকে। আমরা যেন স্বাধীনভাবে নিজেদের কাজ করতে পারি। স্বাধীনভাবে নিজের কথা বলতে পারি।

এবারের নির্বাচনে মেরুকরণ অনেক বেশি। আপনাকে যেকোনো একটা দিক নিতেই হবে। হয় আপনি এদিকে, নয় ওদিকে। জাতীয় স্তরে প্রধান দুটি দলকে যদি দেখি, তাহলে খুব স্পষ্টভাবে এই ভাগটা দেখা যাবে। আপনি এই দেশটাকে কীভাবে দেখতে চাইছেন, তার উপরেই নির্ভর করছে আপনি কাকে ভোট দেবেন। আরেকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস এবারে নির্বাচনে দেখা যাচ্ছে। এর আগে জরুরি অবস্থার সময় এরকম দেখা গিয়েছিল। সেটা হল, দেশজুড়ে তাবড় তাবড় বুদ্ধিজীবী রাস্তায় নেমে কথা বলছেন। আগের নির্বাচনগুলোতে কিন্তু এরকমটা দেখা যায়নি। বুদ্ধিজীবীরা এবার খোলাখুলি ভোট নিয়ে মত দিচ্ছেন। এটা আমার কাছে ভীষণ উল্লেখযোগ্য একটা ব্যাপার।