অধীরের বাড়ি যেন কারখানা, কাজ পাচ্ছেন প্রতিবেশীরাও

83

সুভাষ বর্মন, ফালাকাটা : জমি বিক্রি করে তাঁত মেশিন কিনতে হয়েছিল একসময়। আর আজ সেই অধীর তরফদারের বাড়িতে গেলে মনে হবে যেন মিনি শিল্পনগরী। একজায়গায় তাঁতের মেশিন চলছে। একজায়গায় কাগজের কাপ বানানো হচ্ছে। আবার কোথাও সবজির ব্যাগ সেলাই করছেন বাড়ির মহিলারা। এতসব কাজের ফলে অধীরবাবুর পরিবার তো আর্থিক সচ্ছলতার মুখ দেখেইছে, সেইসঙ্গে সেইসব উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত থেকে কর্মসংস্থান হচ্ছে বেশ কয়েকজন প্রতিবেশীরও।

ফালাকাটা শহর থেকে কিছুটা দূরে চরতোর্ষা নদীসংলগ্ন এলাকায় বছর চল্লিশের অধীর তরফদারের বাড়ি। সরকারি কোনও সুবিধা নিয়ে নয়, পুরোপুরি নিজের উদ্যোগে, কখনও জমি বিক্রি করে ও ধারদেনা করে কর্মসংস্থানের দরজা খুলেছেন অধীরবাবু। তিনি শুধু নিজের কথা ভাবেননি। সেইসঙ্গে এলাকার মানুষও যাতে বাড়িতে থেকেই কর্মসংস্থানের সুযোগ পান, তা নিশ্চিত করতে চাইছেন। তাঁর এই ভাবনাকে স্যালুট জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা।

- Advertisement -

ফালাকাটা-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের কালীপুর মৌজার চরতোর্ষা নদীর পাড়ের অধীরবাবুও আর পাঁচটা ছাত্রের মতো একসময় সরকারি চাকরির স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু দারিদ্র‌্যের কারণে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর তাঁর পড়াশোনা আর এগোয়নি। অল্প জমিতে কৃষিকাজ করতেন। বৃদ্ধা মা, ভাই, স্ত্রী, সন্তানদের কথা ভেবে ভিনরাজ্যেও কাজের খোঁজে যেতে পারেননি। তাই বছরতিনেক আগে অধীরবাবু সিদ্ধান্ত নেন যে, বাড়িতেই কিছু একটা করবেন। তাই আধ বিঘা জমি বিক্রি করে অসম সীমান্তের তুফানগঞ্জ থেকে দুটি তাঁত মেশিন কিনে আনেন। এভাবে শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন। এখনও তাঁর বাড়িতে তাঁতের কারিগর হিসেবে মেজবিলের পরিমল বর্মন ও রাইচেঙ্গার ধনেশ বর্মন কাজ করেন। তাঁরা মূলত মেখলা তৈরি করেন। এই মেখলা তুফানগঞ্জের মহাজনের কাছে পাইকারি দরে বিক্রি করেন অধীর। সেগুলি আবার অসমে পাড়ি দেয়। বাড়ির পাশে কাজ পেয়ে নিশ্চিন্তে রয়েছেন দুই তাঁতের কারিগর। কারিগরদের মধ্যে পরিমল বলেন, আগে বছরের পর বছর নদিয়াতে কাজ করতাম। এখন পরিবারের সঙ্গে থেকে বাড়ির পাশেই কাজ করে নিশ্চিন্তে আছি। দিনে ৪০০-৫০০ টাকা রোজগার হয় বলে আরেক কারিগর ধনেশ বর্মন জানিয়েছেন।

দুবছর আগে একটু বড় ধরনের ঝুঁকি নেন অধীর তরফদার। তিনি কলকাতা থেকে চায়ের কাপ তৈরির মেশিন কিনে আনেন। প্লাস্টিক নয়, কাগজ দিয়ে কাপ তৈরির এই মেশিন একটি ঘরে বসানো হয়। তাঁকে এবারও জমি বিক্রি করার পাশাপাশি টাকা ধারও নিতে হয়। এই মেশিনেও সারাদিন কাজ চলে। প্রতি মিনিটে ৬০ মিলিলিটারের ৫০টি কাগজের কাপ তৈরি হয় মেশিনে। শিলিগুড়ি থেকে কাগজ নিয়ে আসতে হয়। আর চায়ের কাপ পাইকারি দরে ফালাকাটার মহাজনদের কাছে বিক্রি হয়। এ ছাড়াও অধীরবাবুর বাড়ির সঙ্গে রয়েছে মুদির দোকান ও দর্জির দোকান। তাঁর বাড়িতে মহিলারা সেলাই মেশিনে সবজির ব্যাগও বানান।

এইসব কারবারের শুরুতে বৃদ্ধা মা আরতি তরফদারের সম্মতি ছিল না। তবে এখন তিনি খুশি। বললেন, ছেলেকে জমি বিক্রি করে এসব করতে বাধা দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন ভালো লাগছে। আমিও বসে থাকি না। বাড়ির সবাই কাজ করি। প্রতিবেশীরাও কাজ পাচ্ছেন।  নিজের কারবার প্রসঙ্গে আত্মবিশ্বাসের সুরে অধীরবাবু বলেন, আমি শুধু নিজের পরিবারের কথা ভেবে এসব করছি না। এই এলাকার মানুষও যাতে কাজ পায়, আগামীতে কাউকে যেন ভিনরাজ্যে শ্রমিকের কাজে যেতে না হয়, সে সব ভেবেই এগোচ্ছি।