মাটির ভাঁড়ে চা বেচে জীবন বদলেছে আদিবাসী দম্পতির

398

জটেশ্বর : চা শ্রমিকের জীবন থেকে চা বিক্রেতা। জীবনটাই বদলে গিয়েছে দলগাঁও চা বাগানের এক আদিবাসী দম্পতির। তাঁদের জীবন কেটেছে চা বাগানেই। হাবিল লাকড়া ও তাঁর স্ত্রী ভাগমুনিয়া দুজনই ছিলেন চা শ্রমিক। স্বাভাবিকভাবেই চা বাগানের সামান্য মজুরিতে সংসার চালাতে গিয়ে কোনওদিন সচ্ছলতার মুখ দেখেননি। অনটন ছিল নিত্যসঙ্গী। চা বাগানে কাজ করে স্বামী-স্ত্রী যা আয় করতেন, তা চার মেয়ে ও দুই ছেলে সহ আটজনের সংসার টানার জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। তবু দাঁতে দাঁত চেপে সংসারের ঘানি টানতে টানতে জীবনযাত্রার মান বদলানোর চিন্তা আসে ওই দম্পতির মনে। সময়ের চাকা ঘোরে, বাড়ে বয়স। চা বাগানের হাড়ভাঙা খাটুনি আর বেশিদিন করা সম্ভব নয় বুঝে নতুন কিছু করার কথা ভাবা শুরু করেন। কিন্তু প্রত্যন্ত চা বাগান এলাকায় করবেনটা কী? জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে চায়ে সঙ্গে, ফলে চা-কে আশ্রয় করেই শুরু হয় নতুন ভাবনা।

অবশেষে চা শ্রমিকের কাজে ইতি টেনে ২০০৩ সালের ১৫ অগাস্ট স্বাধীনতা দিবসের দিন দলগাঁও চা বাগানের শালধুরা এলাকায় একটি টেবিলকে সম্বল করে বানানো চা বিক্রি শুরু করে ওই বৃদ্ধ দম্পতি। তারপরেই ঘুরতে থাকে তাঁদের ভাগ্যের চাকা। ধীরে ধীরে চা বাগানের ওই একচিলতে চায়ের দোকানের সুখ্যাতি লোকমুখে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এখন উত্তরবঙ্গ তো বটেই, কলকাতা সহ রাজ্যের বিভিন্ন এলাকার পর্যটকরা ফালাকাটা এলাকায় এলে ওই দম্পতির চায়ের দোকানে ঢুঁ মারবেনই। ঝাঁ চকচকে কাফেটারিয়াকেও হার মানায় এখন লাকড়া দম্পতির দোকানের বিখ্যাত চা। অনেক ক্রেতাই তাঁদের কাছে এমন সুস্বাদু চা বানানোর রেসিপি জানতে চান। কেউ খোঁজ নেন বিশেষ কোনও চা পাতার ব্যবহার করা হয় কি না। মাথা নেড়ে বৃদ্ধ দম্পতি জবাব দেন, সাধারণ পদ্ধতিতেই চা তৈরি করেন তাঁরা। প্রতিদিন সকাল থেকে ফালাকাটা-বীরপাড়া জাতীয় সড়কের ধারে এই আদিবাসী দম্পতির চায়ের দোকানে ভিড় শুরু হয়ে যায়। দোকান সাজাতে কোনওদিন দেরি হলে লম্বা লাইন পড়ে যায় খদ্দেরের।

- Advertisement -

ভাগমুনিয়া বলেন, আমার দোকানে চা খেতে আসা বহু মানুষই ডুয়ার্সের চা বলয়, ভ্রমণের জায়গা এমনকি চা বাগান এলাকার মানুষজন সম্পর্কে নানা গল্প শুনতে চান। চায়ে চুমুক দেওয়ার পরে অনেকে আবার চা বাগানের অলিগলিতে ঘুরে বেড়ান। হাবিল লাকড়া বলেন, চা বাগানে কর্মরত অবস্থায় সংসারের হাল ফেরাতে চায়ের দোকান খুলি। প্রথমে সাধারণ কাপে চা বিক্রি করতাম। এখন মাটির ভাঁড়ে বেচি। এখন বিক্রি বেড়েছে। চা দোকানই সংসারের হাল ফিরিয়েছে। নতুন দোকান গড়ার পরেও অবশ্য জীবনের অনেক চড়াই উতরাইয়ে সম্মুখীন হতে হয়েছে দুজনকে। কখনও রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য দোকান ভাঙা পড়েছে। আবার কখনও চিতাবাঘের মুখে পড়েছেন। সব বাধা সামলে সুখ-দুঃখকে সঙ্গী করে হাসিমুখে পথচলতি মানুষের হাতে গরম চায়ের ভাঁড় তুলে দিচ্ছে লাকড়া দম্পতি।