জ্যোতি সরকার, জলপাইগুড়ি : ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর শৈশবের ইটন স্কুলের আদলে নির্মিত জলপাইগুড়ি জিলা স্কুল হেরিটেজের স্বীকৃতি পেল না। তিস্তা নদীর গা ঘেঁষে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ঘরেই জেলা তথা রাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্কুল। তৎকালীন রাজশাহি ডিভিশনের হেডকোয়ার্টার তথা বর্তমানে উত্তরবঙ্গের বিভাগীয় জলপাইগুড়িতে ১৮৭৬ সালে স্কুলটি নির্মিত হয়। এই স্কুলটি থেকে বহু কৃতী ছাত্র রাজ্য তথা জাতীয়স্তরে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। সাহিত্য এবং ক্রীড়াক্ষেত্রে এই বিদ্যালয়ের অবদান অনেকখানি। স্বাধীনতা আন্দোলনেও জিলা স্কুলের ছাত্ররা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

ইংরেজ শাসকরা প্রতিটি জেলাশহরে একটি করে স্কুল স্থাপন করেছিলেন। এই সিদ্ধান্তের অঙ্গ হিসাবে জলপাইগুড়ি জিলা স্কুলের আত্মপ্রকাশ। ১৮৭৬ সালের ২৬ মে শিক্ষা দপ্তরের তত্কালীন সচিব এইচ জে রেনল্ডস-এর আদেশ নম্বর ১৫১১ বলে জলপাইগুড়িতে জিলা স্কুল স্থাপনের সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করা হয়। সূচনাপর্বে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মাসিক ২০০ টাকা করে আর্থিক অনুদান দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়। এই স্কুলের ছাত্র রমেশ মজুমদার দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো ভাইস চ্যান্সেলার হয়েছিলেন। জিলা স্কুলের তিন কৃতী ছাত্র শচীন দাশগুপ্ত কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং অতুলচন্দ্র রায় ও বিনয় দাশগুপ্ত উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালযে উপাচার্য হয়েছিলেন।

অন্যদিকে, অ্যাকাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদারের পাশাপাশি যুগ্মভাবে নজরুল পুরস্কারপ্রাপ্ত বেণু দত্তরায়, কবি তুষার বন্দ্যোপাধ্যায়, সাহিত্যিক অর্ণব সেন এই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র। পাশাপাশি বিখ্যাত ফুটবলার পি কে বন্দ্যোপাধ্যায়, সুকল্যাণ ঘোষ দস্তিদাররা জিলা স্কুলেরই শিক্ষার্থী। পরাধীন ভারতে কলকাতা হাইকোর্ট চত্বরে ডেপুটি পুলিশ সুপার শামসুল আলমকে গুলি করে হত্যা করেছিলেন জিলা স্কুলের ছাত্র বীরেন্দ্রনাথ দত্তগুপ্ত। পরবর্তীতে তাঁর ফাঁসি হয়েছিল। স্কুলের ভবনের সামনেই বীরেন্দ্রনাথ দত্তগুপ্তের মূর্তি রয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামী রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী খগেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত, ডাঃ চারুচন্দ্র সান্যাল, প্রাক্তন মন্ত্রী নির্মল বসু, চা শিল্পপতি সত্যেনপ্রসাদ রায়, বীরেন্দ্রচন্দ্র ঘোষরা এই বিদ্যালযে পড়াশোনা করেছেন। রাজ্যের প্রাক্তন কৃতী আইএএস অফিসার অশোক বসু জলপাইগুড়ি জিলা স্কুলের ছাত্র ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পড়ুয়ারা মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন।

উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের হেরিটেজ প্রোজেক্টের প্রাক্তন কোঅর্ডিনেটর ডঃ আনন্দগোপাল ঘোষ বলেন, সমগ্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে হেরিটেজ হিসাবে ঘোষণা করা যায় না। তবে ঐতিহ্যের স্বাক্ষরবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের একটি কক্ষকে হেরিটেজ ঘোষণা করা যেতে পারে। ১৪৩ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই স্কুলের ইতিহাসকে রাজ্যের সর্বত্র তথা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে হেরিটেজ ঘোষণা করা জরুরি। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু লন্ডনের ইটন স্কুলে পড়শোনা করতেন। ইটন স্কুলের আদলেই ইংরেজরা জলপাইগুড়ি জিলা স্কুলের ভবনকে নির্মাণ করেছেন। দীর্ঘ ১৪৩ বছরে জিলা স্কুল দেশকে বহু কৃতী ছাত্র উপহার দিয়েছে। এর জন্য আমরা গর্বিত।