ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে আখের রস বিক্রি আহ্লাদীর

গৌতম দাস, গাজোল : স্বামীর অকালমৃত্যুতে মাথায় বাজ পড়ে আহ্লাদী সরকারের। কী করবেন, ভেবে পান না। বাড়িতে দুই সন্তান রয়েছে। রয়েছেন বৃদ্ধ শ্বশুর, শাশুড়ি। উপরন্তু শ্বশুর পঙ্গু। পাঁচজনের সংসার। যে সংসারে স্বামীই ছিলেন অর্থ উপার্জনের একমাত্র মানুষ। এই পরিস্থিতিতে চিন্তায় পড়ে গেলেও হাল ছাড়েননি আহ্লাদীদেবী। দাঁতে দাঁত চেপে স্বামীর পরলৌকিক কাজ শেষ করেই দুই শিশুকে কোলে নিয়ে বের হয়ে পড়লেন রাস্তায়। লোহার চাকা ঘুরিয়ে শুরু করলেন আখের রস বিক্রি। এইভাবেই একটা পরিবারকে টেনে চলেছেন তিনি

গাজোল-২ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের ছিলিমপুর গ্রামের গৃহবধূ আহ্লাদী সরকার। স্বামী নিমাই সরকার, দুই সন্তান অভয় সরকার (১৫), অঙ্কুশ সরকার (৩), শ্বশুর রামানন্দ সরকার এবং শাশুড়ি রাধারানি সরকারকে নিয়ে মোটামুটিভাবে চলছিল সংসার। স্বামী নিমাই সরকার ভ্যানে মেশিন লাগিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আখের রস বিক্রি করতেন। কিন্তু এর মধ্যেই ঘটে যায় ছন্দপতন। বছর আড়াই আগে আত্মহত্যা করেন নিমাইবাবু। এরপরই যেন মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে আহ্লাদীর। ছোটো ছেলে তখন দুধের শিশু। বয়স মোটে মাস ছয়েক। বড়ো ছেলের বয়স ১২ বছরের কিছু বেশি। ঘরে পঙ্গু শ্বশুর। কীভাবে সংসার চলবে তা ভেবে কোনো কুল কিনারা পাননি। কিন্তু তারপরেই মনস্থির করে ফেলেন তিনি। যে করেই হোক ধরতে হবে সংসারের হাল। ঠিক করেন স্বামী যে কাজ করে সংসার চালাতেন, সেই কাজই করবেন তিনি।

- Advertisement -

এরপরই ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন রাস্তায়। শুরু হল জীবনয়ুদ্ধে বেঁচে থাকার লড়াই। পাশে এসে দাঁড়ালেন শাশুড়ি। বউমাকে যথাসাধ্য সাহায্য করে যেতে লাগলেন তিনি। দুইজনের মিলিত প্রচেষ্টায় গড়গড় করে না হলেও ধীরে ধীরে গড়াতে শুরু করল সংসারের চাকা। তবে এই কাজে বেশিদূর যেতে পারেন না তাঁরা। বাড়ির কাছাকাছি পাঁচপাড়া এবং সংলগ্ন এলাকাতেই আখের রস বিক্রি করেন। এদিন তাঁর সঙ্গে দেখা হল পাঁচপাড়া হাটে। দেখে বোঝা গেল সংসার চালানোর জন্য দাঁতে দাঁত চেপে কঠোর পরিশ্রম করে আখের রস বের করছেন তিনি। আহ্লাদীদেবী জানালেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর বাধ্য হয়ে সংসারের হাল ধরতে হয়েছে তাঁকে। রোজ সকালে সংসারের কাজ এবং রান্নাবান্না সেরে ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে পড়ি আমি। এরই মাঝে কোনো দিন কিনে নিয়ে আসেন আখ। এরপর তিনি আর শাশুড়ি ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।

শ্বশুর পঙ্গু, সারাক্ষণ প্রায়ই হুইল চেয়ারে বসে থাকেন। এখন ছোটো ছেলের বয়স তিন বছর। তাই ছেলেকে বাড়িতে রেখে আসা সম্ভব হয় না। সঙ্গে নিয়ে আসি শ্বশুর আর ছেলেকে, নাতিকে সামলান দাদু। শাশুড়ি হাত লাগান কাজে। সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে আবার রান্নাবান্নার কাজ করতে হয়। প্রস্তুতি নিতে হয় পরের দিনের জন্য। আহ্লাদীদেবী জানান গরমের সময় বিক্রি কিছুটা বেশি হলেও ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে। তাই বিক্রিও কমেছে। এখন খুব বেশি হলে সারাদিন কাজ করে আয় হয় ১০০-১৫০ টাকা। এই দিয়ে কোনোরকমে চলছে সংসার। সাহায্যের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছে আবেদন-নিবেদন জানিয়েছি। ভোটের আগে প্রতিবারই মিলেছে শুধুই প্রতিশ্রুতি। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।