হিমালয়ে গহন অরণ্যে গোপনে বাড়ছে এলিয়েনরা

156

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : হিমালয়ের জঙ্গলে দ্রুতহারে বংশবিস্তার করছে এলিয়েনরা। এখন পর্যন্ত এলিয়েনদের ৫০টিরও বেশি প্রজাতির সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা। তাঁদের ধারণা, এলিয়েনদের আরও বেশ কয়েকটি প্রজাতি লুকিয়ে রয়েছে গভীর জঙ্গলে। সেই প্রজাতিগুলি খুঁজে বের করতে জোরকদমে কাজ শুরু হয়েছে। এদিকে, এলিয়েনদের দাপটে দফারফা স্থানীয় উদ্ভিদকুলের, যা নিয়ে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা।

এই এলিয়েন সিনেমায় দেখা আজব দর্শন ভিনগ্রহের প্রাণী নয়, এরা ভিনদেশের উদ্ভিদ। বিজ্ঞানের ভাষায় বলতে হলে উদ্ভিদের আক্রমণাত্মক ভিনদেশি প্রজাতি (invasive alien species) । প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বিভিন্ন জঙ্গলে নিজস্ব কিছু প্রজাতির উদ্ভিদ পাওয়া যায়, যে উদ্ভিদগুলি অন্য জঙ্গলে পাওয়া যায় না। সংশ্লিষ্ট এলাকার বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় সেই উদ্ভিদগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

- Advertisement -

হিমালয়ে জঙ্গলে এমন কিছু প্রজাতির উদ্ভিদ পাওয়া গিয়েছে যেগুলি সেই এলাকার বা স্থানীয় উদ্ভিদ নয়। কোনওটি আফ্রিকা, কোনওটি আমেরিকা, কোনওটি আবার ইংল্যান্ড থেকে হিমালয়ে জঙ্গলে এসে বংশবিস্তার করছে। সেই উদ্ভিদগুলোকেই বিজ্ঞানীরা এলিয়েন উদ্ভিদ নাম দিয়েছেন।

হিন্দুকুশ হিমালয়ের কাঞ্চনজঙ্ঘা ল্যান্ডস্কেপের ত্রিদেশীয় সীমানাতে বাড়বাড়ন্ত হয়েছে এলিয়েনদের। হিন্দুকুশ হিমালয়ের বাস্তুতন্ত্র রক্ষা ও গবেষণায় দীর্ঘদিন থেকে কাজ করা আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা দ্য ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিমোড) তাদের পর্যালোচনা রিপোর্টেও এলিয়েন প্রজাতির উদ্ভিদদের নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। আইসিমোড হিন্দুকুশ হিমালয়ে পৃথক ছয়টি ল্যান্ডস্কেপ চিহ্নিত করেছে। যার একটি কাঞ্চনজঙ্ঘা। ল্যান্ডস্কেপটি ২৫ হাজার ৮৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে তৈরি। যার মধ্যে ভারতের ১৪ হাজার ১২৭, ভুটানের ৫,৮৩৪ এবং নেপালের ৫,১২৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা আছে। গোটা সিকিম রাজ্য ছাড়াও দার্জিলিংয়ে ১২টি এবং জলপাইগুড়ির ১৩টি ব্লক কাঞ্চনজঙ্ঘা ল্যান্ডস্কেপের অন্তর্ভুক্ত।

এলিয়েনদের নিয়ে উদ্বেগের কারণ কী? বিশিষ্ট উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ও উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডঃ মনোরঞ্জন চৌধুরীর ব্যাখ্যা, হিমালয় এবং তার পাদদেশের উদ্ভিদগুলির বেঁচে থাকা এবং বংশবৃদ্ধির জন্য যে পরিমাণ রসদ দরকার তার থেকে অনেক কম রসদে এলিয়েন উদ্ভিদগুলি বাঁচে এবং দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে। স্থানীয় উদ্ভিদের তুলনায় এলিয়েনরা অনেক বেশি শক্তিশালী। এই কারণে বনাঞ্চলের বহু এলাকা দ্রুত এলিয়েনদের দখলে চলে যাচ্ছে।

ফলে স্থানীয় উদ্ভিদরা বংশবিস্তারের সুযোগ ও জায়গা পাচ্ছে না এবং ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। আর তাই বনাঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রে নীরবে পরিবর্তন আসছে। মনোরঞ্জনবাবু বলেন, এলিয়েন উদ্ভিদগুলি হিমালয়ে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের পক্ষে মারাত্মক হয়ে উঠছে। সব এলিয়েন এখনও চিহ্নিত করা যায়নি। আবার গভীর জঙ্গলে এলিয়েনদের চিহ্নিত করে নষ্ট করাও যাচ্ছে না। এভাবে চললে একটা সময় স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। যার ফলে প্রভূত ক্ষতি হবে।

উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের প্রধান ডঃ সুভাষচন্দ্র রায় জানিয়েছেন, হিমালয়ে পার্বত্য এলাকা ও পাদদেশের বনাঞ্চলগুলিতে  কয়েক প্রকার এলিয়েন ঘাসেরও খোঁজ পেয়েছেন গবেষকরা। সেই ঘাস দ্রুত বংশবিস্তার ও এলাকা দখলের ফলে স্থানীয় ঘাস ও গুল্মের এলাকা কমে যাচ্ছে। হিমালয়ের বনাঞ্চলের তৃণভোজীরা এলিয়েন ঘাস বা গুল্ম খায় না। যার ফলে তৃণভোজীদের খাদ্যসংকট দেখা দিচ্ছে। সুভাষচন্দ্রবাবু বলেন, এলিয়েন উদ্ভিদদের বিষয়ে সুসংবদ্ধ গবেষণার ভিত্তিতে সরকারের সুনির্দিষ্ট পলিসি তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।

এলিয়েনদের নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন গবেষকরা। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে উত্তরের জঙ্গলগুলিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার ঘটনা প্রতিবছরই দেখা যায়। আগুন লাগার ফলে লতা, গুল্ম মরে যায়। তখন সেই ফাঁকা জায়গায় দ্রুত বংশবিস্তার করে এলিয়েন উদ্ভিদরা। এছাড়া গাছ কেটে জঙ্গল পরিষ্কার করা হলে সেই জায়গায় স্থানীয় উদ্ভিদ জন্মানোর আগেই দখল করে এলিয়েনরা। অর্থাৎ আগুন লাগিয়ে গাছ কেটে বা অন্য কোনওভাবে জঙ্গল সাফ করা হলে সহজেই বংশবিস্তারের সুযোগ পাবে এলিয়েনরা।