আলিপুরদুয়ারে তৃণমূলের নেগেটিভ ভোটই বিজেপির ভরসা

587

আজকের পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে যদি বিধানসভা ভোট হয়, তাহলে কী হতে পারে ভোটচিত্র। আমাদের রিপোর্টাররা, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা, যাঁরা প্রতিনিয়ত সাধারণ ভোটার থেকে শুরু করে প্রশাসনিক কর্তা, পুলিশকর্মী, রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের সঙ্গে মেলামেশা করেন, তাঁরা মাটিতে কান পেতে বোঝার চেষ্টা করেছেন- এই মুহূর্তে জেলার পরিস্থিতি কেমন, কোন অঙ্কে জেলাবাসীর ভোট কোন দিকে পড়তে পারে। জেলায় ভোটারদের ক্ষোভ, প্রত্যাশা কেমন।  সমীক্ষায় আমরা দেখেছি, বাম-কংগ্রেস জোট হলে, ভোট কাটার অঙ্কে তারা অনেক কেন্দ্রে নির্ণায়ক হলেও, উত্তরবঙ্গে হাতে গোনা কয়েকটি আসন ছাড়া জেতার মতো শক্তি এই মুহূর্তে তাদের নেই। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে, উত্তরবঙ্গের মাটিতে তৃণমূল এবং বিজেপির মধ্যে সরাসরি লড়াই হতে চলেছে। তাই আমাদের নির্বাচনি বিশ্লেষণ এই দুই দলকে নিয়ে। মনে রাখতে হবে, এই পুরো বিশ্লেষণটাই ২০২০-র সেপ্টেম্বরে দাঁড়িয়ে ভোটের এখনও সাত-আট মাস দেরি। এর মধ্যে বদলে যেতে পারে অনেক কিছু।

আলিপুরদুয়ার ব্যুরো : তৃণমূলের এক বহু পুরোনো নেতা আক্ষেপ করছিলেন- কুমারগ্রামে আমাদের দুই বিধায়ক ১০ বছরে দলের যা ক্ষতি করেছেন তা বাম আর বিজেপি মিলে ২০ বছরেও করতে পারেনি। আলিপুরদুয়ার জেলায় বিধানসভা ধরে ধরে খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, আগামী ভোটে সম্ভবত জেলার পাঁচটি আসনের বেশ কয়েকটা বিজেপিকে উপহার দিতে চলেছেন তৃণমূলের এমন নেতারা।

- Advertisement -

এমনিতেই গোটা উত্তরবঙ্গের মধ্যে আলিপুরদুয়ারের ভোটারদের বিন্যাস অন্য সব জেলার থেকে আলাদা। এখানে সংখ্যালঘু ভোট ১৫ শতাংশের মতো। তার একটা বড় অংশই আবার বাম-কংগ্রেসের একান্ত অনুগত। জেলার প্রায় ৩০ শতাংশ রাজবংশী ভোটার ভোটের ফলাফল নির্ণয়ে বড় ভূমিকা নিতে পারেন। মনে রাখতে হবে, আলিপুরদুয়ার জেলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চা বাগানের ভোট- যার অনেকটাই আদিবাসী ভোটব্যাংকের ওপর নির্ভরশীল। সেখানেও হোয়াইট ট্রাইব আর ব্ল্যাক ট্রাইবের সুস্পষ্ট বিভাজন রয়েছে। চা শ্রমিকদের বড় অংশ জাতিগতভাবে নেপালি হওয়ায় তাঁদের ভোট এতদিন তৃণমূলে কমই পড়েছে। পাহাড়ের মোর্চা নেতা বিমল গুরুংয়ের প্রভাব এখনও এঁদের মধ্যে অনেকটাই। এই পরিস্থিতিতে গত দুটো লোকসভা ভোটে এই ভোটব্যাংকের সুফল বিজেপির ঝুলিতে গিয়েছে। কিন্তু বিমল গুরুং রাজ্যের সঙ্গে সন্ধির পথে এলে হিসেবনিকেশ অনেকটাই বদলে যাবে। জাতিবিন্যাসের অঙ্ক ছেড়ে উন্নয়নের প্রশ্ন সামনে এলে তৃণমূলের ঝুলি নেহাত ফাঁকা নয়। ২০১৪ সালে পৃথক জেলা ঘোষণার পর থেকে আলিপুরদুয়ারের জন্য তৃণমূল নেত্রী অনেক কিছু করেছেন। উত্তরবঙ্গের দ্বিতীয় প্রশাসনিক সদর দপ্তর ডুয়ার্সকন্যা হয়েছে আলিপুরদুয়ার শহরে। ফালাকাটার কৃষক বাজার রাজ্যে অন্যতম সেরা। ফালাকাটার সুপারস্পেশালিটি হাসপাতাল, স্টেডিয়াম বা হাটখোলার মার্কেট কমপ্লেক্স, জেলাজুড়ে ঝাঁ চকচকে রাস্তা- সব মিলিয়ে আলিপুরদুয়ার নিয়ে এতটা শঙ্কিত হওয়ার কারণ ছিল না তৃণমূলের। তাহলে সমস্যাটা কোথায় তা একবার খুঁজে দেখা যাক।

কুমারগ্রামের শিক্ষিত মানুষজন আক্ষেপ করেন, দশরথ তিরকি আর জেমস কুজুরের জমানায় এই বিধানসভা এলাকায় একটা স্কুলের একটা পাঁচিলও বিধায়ক কোটার টাকায় হয়নি। অথচ বছরে ৬০ লক্ষ টাকা পান এই বিধায়করা। সেই হিসাবে ১০ বছরে ৬ কোটি টাকায় এঁরা কী করেছেন? আমাদের এক রিপোর্টার এই প্রশ্ন করেছিলেন দশরথবাবুকে। তিনি লিখিত তালিকা দেবেন বলে জানিয়েছিলেন। ছয় মাসেও তা দিতে পারেননি। আর জেমস কুজুর কুমারগ্রামের বিধায়ক হওয়ার পর নিজের বিধানসভা এলাকায় কতদিন এসেছেন তা নিয়ে দলের নীচুতলার কর্মীরাই এখন প্রশ্ন তোলেন। আরও আছে। আলিপুরদুয়ার পুরসভায় ক্ষমতায় থেকেও শহরে সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রকল্প তো দূরের কথা, একটা ডাম্পিং গ্রাউন্ড করতে গিয়ে নাকানিচোবানি খেয়েছে তৃণমূলের বোর্ড।

ভোটের অঙ্কে জেলার মাদারিহাট আর কালচিনি বিধানসভা আসন কোনওদিনই তৃণমূলের ছিল না। চা বলয় অধ্যুষিত এই এলাকার ভোট একসময় একতরফাভাবে বামেদের ঝুলিতে যেত। আর গত বিধানসভা ভোটে জেলার একমাত্র মাদারিহাট আসনেই বিজেপি জয় পেয়েছে। উত্তরবঙ্গে সেটাই বিজেপির প্রথম বিধানসভা দখল। কালচিনিতে অঙ্ক বদলানোর জন্য তৃণমূলকে দলের পুরোনো নেতা মোহন শর্মার ওপর নির্ভর করতেই হবে। কিন্তু সেখানেও অনেক গল্প আছে। গত বিধানসভা ভোটে আলিপুরদুয়ার জেলায় প্রত্যাশার কাছাকাছি ফল করা সত্ত্বেও জেলা সভাপতি পদ থেকে মোহন শর্মাকে সরতে হয়েছে শুধু দলের গোষ্ঠী রাজনীতির জন্য। লোকসভা ভোটে জেলায় ভরাডুবির দায় মোহনের কাঁধে চাপিয়ে তৃণমূলের অনেক শহুরে নেতা নিজেদের পিঠ এবং পদ বাঁচিয়েছেন। তৃণমূলের নীচুতলার কর্মীরাও জানেন, চা বাগানে মোহন শর্মার ডাকে লোক জড়ো হয়ে যাবে। কিন্তু জেলা সভাপতি মৃদুল গোস্বামী বা আলিপুরদুয়ারের বিধায়ক সৌরভ চক্রবর্তীকে লোক জড়ো করতে মনোরঞ্জন দের মতো নেতাদের উপর ভরসা করতে হবে। আলিপুরদুয়ার শহরে তৃণমূলের অনেক নেতা আড়ালে-আবডালে স্বীকার করেন, সৌরভের সঙ্গে মিটিং-মিছিলে ঘুরে বেড়ানো অনেকেই এবার সৌরভ প্রার্থী হলে তৃণমূলকে ভোট দেবেন না। শহরে দলের পরিস্থিতি এমনই যে জেলা সভাধিপতি শীলা দাসসরকারকে দলেরই কয়েকজন হেনস্তা করার পরেও দলের জেলা নেতৃত্ব কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস দেখাননি।

আবার চা বলয়ে তৃণমূলের বাকি কিছু নেতার চালচলন সাধারণ মানুষকে দলের থেকে অনেকটা দূরে ঠেলে দিয়েছে। একসময় সাইকেলে ঘুরে বেড়ানো চা বাগানের ওই ছেলেরা এখন স্করপিও গাড়ি ছাড়া চড়েন না। ঠিকাদারি আর তোলা আদায় তো আছেই, এমন ভুঁইফোঁড় নেতাদের ঔদ্ধত্যে তৃণমূলের অনেক পুরোনো নেতাও বিরক্ত। এই ঠিকাদারদের একাংশ আবার জেলা নেতাদের নিয়মিত মোটা প্রণামি দিয়ে দলে দাপট বাড়িয়েছেন। তাই জেলায় দল এখন তাঁদের কথাতেই চলে। এঁরা কোটি টাকার রাস্তা বানালেও তা কয়েক মাসে ভেঙে যায়। কাজের মান নিয়ে সাধারণ মানুষ প্রশ্ন করলে অন্য ব্যবস্থা আছে। এছাড়া জমিদখল তো জেলায় অনেক ছাপোষা গৃহস্থের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। রাইচেঙ্গার মানুষজন তো একসময় তাঁদের জমি কেড়ে নেওয়ায় পার্টির বিরুদ্ধে কার্যত জেহাদ ঘোষণা করেছিলেন। রাইচেঙ্গার মানুষ ভয় বা ভক্তিতে পরবর্তীতে আত্মসমর্পণ করলেও আগামী উপনির্বাচন বা বিধানসভা ভোটে ফালাকাটায় এর দাম তৃণমূলকে দিতে হবে।

তৃণমূলের এইসব ফাঁকফোকর গলে বিজেপি তাদের ভোট কতটা টানতে পারবে, সেটা কিন্তু বড় প্রশ্ন। লোকসভা ভোটে জন বারলা যে বিশাল মার্জিনে জিতেছেন তাতে বিজেপি বিধানসভাতেও জেতার আশা করতেই পারে। লোকসভা ভোটে ফালাকাটা বিধানসভা এলাকায় অনিল অধিকারীর গড়ে দেওয়া তৃণমূলের দুর্গ ভেঙে বিজেপি ভোট ছিনিয়ে নিয়েছে। আর অন্য জায়গায় তো তৃণমূল নেতারা নিজেরাই দলের দফারফা করে দিয়েছেন। এমনিতেই আলিপুরদুয়ার জেলায় হিন্দু ভোটার বেশি। আমাদের সমীক্ষা বলছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ২০১৬ সালের বিধানসভা ভোটের নিরিখে তৃণমূলের দিকে ২৫ শতাংশ ভোটার ঝুঁকে, বিজেপির দিকে ৬০ শতাংশ। ১৫ শতাংশ আগেরবারের মতোই ভোট দেবেন। পেশাগতভাবে দেখলে শিক্ষিত যুবকরা চাকরি না পেয়ে হতাশ, ক্ষুব্ধ। বিজেপির দিকে কিছুটা ঝুঁকে থাকলেও তাঁদের একটা বড় অংশ বলছে, রাজ্য আর কেন্দ্র সরকার কেউই তো চাকরির দরজা খুলছে না। তবে এই জেলাতেও এসএসসি চাকরিপ্রার্থীরা একটা বড় বিপদ তৃণমূল নেত্রীর কাছে।

এই পরিস্থিতি আলিপুরদুয়ারের পাঁচটি আসনই জেতার অঙ্ক কষতে পারে বিজেপি। কিন্তু প্রশ্ন হল, জেলায় দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো তাদের মুখ কোথায়? সাংসদ পদে জন বারলাকে জলপাইগুড়ি থেকে এনে প্রার্থী করতে হয়েছে। সত্যি বলতে, মনোজ টিগ্গা ছাড়া জেলায় বিজেপির তেমন মুখ নেই। গঙ্গাপ্রসাদ শর্মাও অনেকটা নিস্তেজ। সুতরাং গ্রামগঞ্জে, চা বাগানে আরএসএস-এর শক্তপোক্ত সংগঠন গড়ে তোলার সুফল যদি বিজেপি ইভিএমে টেনে আনতে পারে, শুধুমাত্র তাহলেই আলিপুরদুয়ার দখলের স্বপ্ন সফল হওয়া সম্ভব। বিজেপির নিজস্ব সংগঠনের পক্ষে তা কিন্তু শুধু শক্ত নয়, প্রায় অসম্ভব।