সুমন কাঞ্জিলাল, আলিপুরদুয়ার, ১৫ মার্চঃ আলিপুরদুয়ার শহরে জলাশয় দখলমুক্ত করতে কী পদক্ষেপ করা হয়েছে তা জানতে চেয়ে জেলা প্রশাসনকে বিস্তারিত রিপোর্ট পাঠানোর নির্দেশ দিল রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রীর আদেশ অনুসারে রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম চিঠি পাঠিয়েছেন আলিপুরদুয়ারের জেলাশাসককে। গত বুধবার পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রীর এই চিঠি পেয়ে মাথায় হাত জেলা প্রশাসনের কর্তাদের। লোকসভা ভোটের মুখে কীভাবে আলিপুরদুয়ার শহরের জলাভূমি ও জলাশয় জবরদখল নিয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট পাঠানো সম্ভব, তা ভেবে পাচ্ছেন না জেলা প্রশাসনের কর্তারা। জেলা ভূমি ও ভূমিসংস্কার দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত জেলাশাসক দীপঙ্কর পিপলাই বলেন, মন্ত্রীর চিঠি পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এখন লোকসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। আলিপুরদুয়ারে প্রথম দফায় ভোট। এই নিয়ে এখন সবাই ব্যস্ত রয়েছে।

লোকসভা ভোটে আলিপুরদুয়ার শহর সহ গোটা জেলায় যেভাবে জলাভমি থেকে শুরু করে সরকারি জমি জবরদখল হয়ে গিয়েছে তা সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে চাইছে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক সংগঠন থেকে শুরু করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি এই নিয়ে বারবার জেলা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানালেও যে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি সেকথাও লোকসভা ভোটের প্রচারে তুলে ধরা হবে বলে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতারা জানিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরেই আলিপুরদুয়ার শহরে একের পর এক জলাভূমি জবরদখল হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় শহরে এক শ্রেণির জমি মাফিয়া রীতিমতো পরিকল্পনা করে প্রথমে জলাভমিগুলিকে ভরাট করে দিচ্ছে। তারপর সেখানে অবৈধ নির্মাণ গড়ে উঠছে।

একইভাবে শহরে একের পর এক পুকুরও ভরাট করে ফেলা হচ্ছে। অভিযোগ, জমি মাফিয়ারা জেলা ভূমি ও ভূমিসংস্কার দপ্তরের কর্মীদের একাংশের সঙ্গে যোগসাজশ করে পুকুর ও জলাভমির চরিত্রও রাতারাতি বদল করে নিচ্ছে। সেই সমস্ত দখল করা জমির দাগ ও খতিয়ান নম্বরও বের করে নেওয়া হচ্ছে। তারপর মোটা টাকায় ওইসব জমি হাতবদল হয়ে যাচ্ছে। আলিপুরদুয়ার শহরে এইভাবে লাগাতার জলাশয় জবরদখলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক সংগঠন জলাশয় বাঁচাও কমিটি তৈরি করে আন্দোলনে নামে। আলিপুরদুয়ার শহরে কটি জলাশয় কাগজে-কলমে রয়েছে এবং তার জেএল নম্বর, সিট নম্বর প্রভতি উল্লেখ করে গত ফেব্রুয়ারি মাসে জলাশয় বাঁচাও কমিটির পক্ষ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে একটি অভিযোগপত্র পাঠানো হয়।

ওই অভিযোগপত্রে বলা হয়, পুর এলাকায় ১৬টি জলাশয় রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এগুলির কোনো সংস্কার নেই। এই বিষয়টি প্রথমে উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষকে জানানো হয়। তিনি জলাশয়গুলির সংস্কার এবং সৌন্দর্যায়নের জন্য জেলাশাসককে এস্টিমেট করে নথিপত্র জমা দিতে বলেন। জলাশয় বাঁচাও কমিটির অভিযোগ, এই বিষয়ে জেলা প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করছে। জেলা প্রশাসনের উদাসীনতার ফলেই শহরজুড়ে জলাশয়গুলি জবরদখল হয়ে য়াচ্ছে। সেখানে অবৈধ নির্মাণ গড়ে উঠছে। জলাশয় বাঁচাও কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক দুলু দত্ত এবং ল্যারি বসু জানান, তাঁরা গোটা বিষয়টি লিখিতভাবে মুখ্যমন্ত্রীকে জানিয়েছিলেন। এই নিয়ে প্রথমে রাজ্যের প্রধান সচিবের দপ্তর থেকে খোঁজখবর নেওয়া হয়। এরপর রাজ্যের নগরোন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম জেলা প্রশাসনের কাছে রিপোর্ট চেয়ে পাঠিয়েছেন। তাঁরা চান অবিলম্বে শহরের জলাশয় জবরদখল মুক্ত করা হোক। বিজেপির জেলা সভাপতি গঙ্গাপ্রসাদ শর্মা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জেলাজুড়ে পুকুর ও জলাশয় জবরদখলের ঘটনায় সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ। শাসকদলের মদতে এক শ্রেণির জমি মাফিয়া এই সমস্ত জমি দখল করে সেখানে ইমারত গড়ে তুলছে। কোটি কোটি টাকার লেনদেন চলছে। এই নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বুঝতে পেরেই লোকসভা ভোটের আগে লোকদেখানো এই সমস্ত রিপোর্ট চেয়ে পাঠানো হচ্ছে। যদিও বিরোধীদের এই অভিযোগ মানতে নারাজ শাসকদলের নেতারা। জেলা তণমূল কংগ্রেসের সহসভাপতি তথা রাজ্য ভূমি ও ভূমিসংস্কার এবং উদ্বাস্তু দপ্তরের পরামর্শদাতা কমিটির চেয়ারম্যান মৃদুল গোস্বামী বলেন, প্রশাসন ও রাজ্য সরকার জলাশয় জবরদখলের বিরুদ্ধে নানা পদক্ষেপ করেছে। এটা ভোটের ইশ্যু নয়।