উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে নম্বর বাড়িয়ে পাশ করানো হয়েছে পাঁচ পড়ুয়াকে

2711

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : ফেল করা পরীক্ষার্থীকে পাশ করাতে বড়সড়ো দুর্নীতির অভিযোগ উঠল উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারই সূত্র ধরে সিমেস্টারের খাতা পুনর্মূল্যায়ন করে ফেল করা পড়ুয়াদের রিলিফ দিতে উপাচার্যকে লেখা তণমূল ছাত্র পরিষদ নেতার চিঠি প্রকাশ্যে আসায় শিক্ষামহলে হইচই শুরু হয়েছে। টিএমসিপির বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের ইউনিট সভাপতি অভিজিৎ কুণ্ডু সেই চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিতে উপাচার্যকে সুনির্দিষ্টভাবে আইন বিভাগের চতুর্থ সিমেস্টারে পাঁচজন ফেল করা পরীক্ষার্থীকে রিলিফ দেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি। সেই পাঁচজনের কার কত নম্বর কম আছে সেটাও চিঠিতে উল্লেখ করে দেন ওই ছাত্রনেতা। শাসকদলের ছাত্রনেতার সেই চিঠিতেই নোট দিয়ে পরীক্ষা নিয়ামককে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার নির্দেশ দেন উপাচার্য সুবীরেশ ভট্টাচার্য। সেই চিঠি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডার গ্র‌্যাজুয়েট কাউন্সিল ও আইন বিভাগের বোর্ড অফ স্টাডিজে পাঠান পরীক্ষা নিয়ামক দেবাশিস দত্ত। তারপর সংশ্লিষ্ট সিমেস্টারে সমস্ত পরীক্ষার্থীর খাতা পূনর্মূল্যায়ন করার সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সেই পূনর্মূল্যায়নের পর নতুন যে ফলাফল ঘোষণা করা হয় তাতে দেখা যায়, টিএমসিপির সুপারিশ করা পাঁচ ছাত্র পাশ করেছে। এমন ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক মহলও স্তম্ভিত।

আইন বিভাগে পুনর্মূল্যায়নের কোনও সুযোগ নেই। শুধু উত্তরপত্র স্ক্রুটিনি করা যেতে পারে। অভিযোগ, যেহেতু আলাদা করে ওই পাঁচ পরীক্ষার্থীর খাতা পুনর্মূল্যায়ন করানো সম্ভব হবে না তাই বিশেষ ব্যবস্থাপনার নামে আবেদন না করা সত্ত্বেও সমস্ত পরীক্ষার্থীর খাতা পুনর্মূল্যায়ন করে পাঁচ পরীক্ষার্থীকে পাশ করানো হয়েছে। এই ঘটনায় উপাচার্যের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কেন তিনি টিএমসিপি নেতার সুপারিশের চিঠি নিয়ে আলোচনার নির্দেশ দিলেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরেই। যদিও এই প্রশ্নের কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি। ফোন করা হলেও সাড়া দেননি উপাচার্য।  ২০১৯ সালের ১৮ নভেম্বর ওই চিঠি জমা পড়ে উপাচার্যের দপ্তরে। চিঠি জমা পড়ার পরে সেইদিনই উপাচার্য নোট দিয়ে তা পাঠিয়ে দেন পরীক্ষা নিয়ামক বিভাগে। পরের দিন পরীক্ষা নিয়ামক আন্ডার গ্র‌্যাজুয়েট কাউন্সিল ও আইনের বোর্ড অফ স্টাডিজের মতামত চেয়ে চিঠি পাঠান।

- Advertisement -

পাশ করিয়ে দেওয়ার নামে এক ছাত্রীর কাছে ১০ হাজার টাকা চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে শিলিগুড়ি কলেজের এক অধ্যাপকের বিরুদ্ধে। ভাইরাল হয়েছে সেই সংক্রান্ত একাধিক অডিও ক্লিপ। সেই অডিও ক্লিপের কথোপকথন বলছে, নম্বর বাড়িয়ে দেওয়া বা পাশ করিয়ে দেওয়ার একটি বড় চক্র রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরেও। আইন বিভাগের ঘটনা প্রকাশ্যে আসায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা। চিঠির কথা স্বীকার করে নিয়েছেন টিএমসিপি নেতা অভিজিত্ কুণ্ডু। তিনি বলেন, আমরা সবসময় পরীক্ষার্থীদের পাশে থাকি। ওই পাঁচ পরীক্ষার্থী কয়েকটি বিষয়ে পাশ করার মতো প্রয়োজনীয় নম্বর তুলতে পারেনি। তবে ওদের আগের যাবতীয় ফলাফল ভালো ছিল। তাই উপাচার্যকে অনুরোধ করেছিলাম বিষয়টি দেখার জন্য। পুনর্মূল্যায়নে ওদের নম্বর বেড়েছে, তাই পাশ করেছে।

বিষয়টি প্রকাশ্যে আসায় দায়ভার ঝেড়ে ফেলতে চাইছেন সকলেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা নিয়ামক দেবাশিস দত্ত বলেন, এক্ষেত্রে বিশেষ পুনর্মূল্যায়ন হয়েছে। তবে আমি ওই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিইনি। আমার দায়িত্ব শুধু মার্কশিট তৈরি করে দেওয়া। আইন বিভাগের বোর্ড অফ স্টাডিজের সিদ্ধান্তমতোই কাজ হয়েছে। তারা পুনর্মূল্যায়ন করে যে নম্বর পাঠিয়েছে আমরা সেটা প্রকাশ করেছি। আইন বিভাগের বোর্ড অফ স্টাডিজের চেয়ারপার্সন গঙ্গোত্রী চক্রবর্তী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম মেনেই সবার খাতা পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চস্তর থেকেই সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এর সঙ্গে কোথায় কীভাবে রাজনীতির যোগ আছে কি নেই তা জানি না।

তৃণমূল ছাত্রনেতা চিঠিতে যে পাঁচজনের নাম সুপারিশ করেছেন তাঁদের একজনের ১০ নম্বর, একজনের ৪ নম্বর, অন্য একজনের ২ নম্বর এবং বাকি দুজনের ৭ নম্বর করে কম ছিল। চিঠিতে পরীক্ষার্থীদের নাম, রোল নম্বর, রেজিস্ট্রেশন নম্বর, কোন বিষয়ে ফেল করেছে- যাবতীয় তথ্য জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। চিঠির কথা প্রকাশ হতেই শোরগোল পড়েছে শিক্ষামহলে। উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কোডিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থাৎ, উত্তরপত্র পরীক্ষকের কাছে পাঠানোর সময় পরীক্ষার্থীর নাম, রোল নম্বর ইত্যাদি তথ্য থাকে না।  সেক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরীক্ষার্থীদের নম্বর বাড়ানো সম্ভব নয় বলেই দাবি টিএমসিপি নেতাদের একাংশের। বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অধ্যাপক বলেন, যদি চিঠির ভিত্তিতে পুনর্মূল্যায়ন হতে পারে তাহলে কয়েকজন পরীক্ষার্থীর খাতা বিশেষভাবে চিহ্নিত করে দেওয়া বা ডিকোডিং করে পরীক্ষকের কাছে পাঠানোও অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চস্তর থেকে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে তাই এখানে অসম্ভব শব্দটির গুরুত্ব থাকছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকদের একটা বড় অংশও এমনটাই মনে করছেন।