রাহুল মজুমদার, শিলিগুড়ি : আইপিএস অফিসারের বিরুদ্ধে টানা ৩০ মিনিট ধরে তিন সহকর্মীকে কান ধরে ওঠবস করানোর অভিযোগে শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। সহকারী পুলিশ কমিশনার (পশ্চিম) বিদিতরাজ ভুন্দেশ মাটিগাড়া থানায় কর্মরত অবস্থায় একজন এএসআই, একজন কনস্টেবল ও এক হোমগার্ডকে কান ধরে ওঠবস করান বলে অভিযোগ। ৮ নভেম্বর ঘটনাটি ঘটে। পুরো ঘটনাটি জানিয়ে ওই এএসআই সঞ্জিত দত্তের স্ত্রী প্রিয়াদেবী ১৫ নভেম্বর পুলিশ কমিশনার, রাজ্য পুলিশের ডিজি ও মানবাধিকার কমিশনে লিখিত অভিয়োগ জানিয়েছেন। ঘটনার পর থেকে তাঁর স্বামী বেশ কয়েকবার আত্মঘাতী হওয়ার চিন্তাভাবনা করেছেন বলে তিনি জানান। পাশাপাশি, সহকারী পুলিশ কমিশনারের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তোলায় মঙ্গলবার তাঁর স্বামীকে পুলিশ লাইনে ক্লোজড করা হয় বলেও প্রিয়াদেবী জানিয়েছেন। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে পুলিশ মহলে চাপা ক্ষোভ ছড়িয়েছে। বহু চেষ্টা করেও বিদিতরাজ ভুন্দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা য়ায়নি। ঘটনার বিষয়ে তাঁর জানা নেই বলে ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (জোন-২) অতুল বিশ্বনাথন জানান।

পুলিশ সূত্রের খবর, এএসআই সঞ্জিতবাবু ৭ নভেম্বর মাটিগাড়া থানার টহলদারি ভ্যানের দায়িত্বে ছিলেন। প্রফুল্ল রায় এবং যোগেন রায় নামে একজন কনস্টেবল ও একজন হোমগার্ড তাঁর সঙ্গে ছিলেন। সারারাত ডিউটি করে সকাল ৭টা নাগাদ প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে প্রফুল্লবাবু মাটিগাড়া বালাসন সেতুর কাছে গাড়িটিকে দাঁড় করাতে বলেন। সেইমতো বালাসন সেতুর কাছে তিন মিনিটের জন্য গাড়িটি দাঁড় করানো হয় বলে দাবি। ওই সময় সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসিপি) বিদিতরাজ ভুন্দেশ ওই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। পুলিশের টহলদারি ভ্যানটিকে সেখানে দাঁড় করানো দেখে ৮ তারিখ বেলা সাড়ে ৩টেয় তিনি সঞ্জিতবাবুদের তাঁর দপ্তরে ডেকে পাঠান। সেইমতো ওই তিন পুলিশকর্মী এসিপি-র সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে এসিপি তাঁদের বিরুদ্ধে গাড়ি দাঁড় করিয়ে টাকা তোলার অভিযোগ জানান। ওই তিন পুলিশকর্মী অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেন। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখলেই ঘটনাটি পরিষ্কার হবে বলে তাঁরা দাবি করেন। মাটিগাড়া থানার ওসির ঘরে ওই সিসিটিভি ক্যামেরার মনিটর রয়েছে। কিন্তু তাঁদের কোনো কথা না শুনে এসিপি সঞ্জিতবাবুদের কান ধরে ওঠবস করান বলে অভিয়োগ। তাঁর লিগামেন্টে চোট রয়েছে বলে সঞ্জিতবাবু জানালেও এসিপি তাঁদের ৩০ মিনিট ধরে ওঠবস চালিয়ে যেতে নির্দেশ দেন। পাশাপাশি, কটু কথা বলে চাকরি খাওয়ার হুমকি দেন। ঘটনার পর থেকেই সঞ্জিতবাবু মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। সঞ্জিতবাবুর স্ত্রী প্রিয়াদেবী ১৫ নভেম্বর এসিপি-র বিরুদ্ধে শিলিগুড়ির পুলিশ কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের প্রতিলিপি স্বরাষ্ট্র দপ্তর, রাজ্য পুলিশের ডিজি ও মানবাধিকার কমিশনে পাঠানো হয়। কিন্তু অভিয়োগ দায়ের করার পর ১১ দিন কেটে গেলেও কোনো তদন্ত হচ্ছে না বলে তাঁর অভিযোগ। এদিকে, মঙ্গলবার সঞ্জিতবাবু ও তাঁর সঙ্গে থাকা এক পুলিশকর্মীকে মাটিগাড়া থানা থেকে সরিয়ে পুলিশ লাইনে ক্লোজড করা হয়। অন্যজন কিছুদিন আগে সদ্য অবসর নিয়েছেন। এই ঘটনায় পুলিশ মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। পুলিশের নীচুতলার কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়েছে।

এদিকে, ৩০ মিনিট ধরে ওঠবস করানোর ফলে সঞ্জিতবাবুর লিগামেন্টের সমস্যা আরও বেড়েছে বলে পরিবারের দাবি। শনিবার তাঁর অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা রয়েছে। বিষয়টি নিযে সঞ্জিতবাবু সংবাদমাধ্যমে মুখ খুলতে না চাইলেও তাঁর স্ত্রী প্রিয়াদেবী বলেন, স্বামীকে বিনা অপরাধে কান ধরে ওঠবস করানো হল। এটা কোথাকার আইন? অভিয়োগ জানানোর পরও এখনও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উলটে আমার স্বামীকে ক্লোজড করে দেওয়া হল। সেদিন সেখানে কতক্ষণ গাড়ি দাঁড়িয়েছিল তা বালাসন সেতুর সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখলেই পরিষ্কার বোঝা যাবে। সুরাহা চেয়ে প্রিয়াদেবীরা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বারস্থ হওয়ার বিষযে চিন্তাভাবনা করছেন।