উদ্ধার হওয়া গোরু ফের বাংলাদেশে পাচারের অভিযোগ

298

গৌতম সরকার, মেখলিগঞ্জ: সীমান্তে গোরু-মোষ উদ্ধারের পর সেই গোরু ফের কৌশলে বাংলাদেশেই পাচার হয়ে যাচ্ছে। এমনও খবর রয়েছে যে একই গরু একাধিকবারও ধরা পড়ছে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে, যা দেখে প্রথমদিকে তাঁরাও অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তবে বর্তমানে বিষয়টি সকলের কাছেই প্রায় পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে।

একটি অংশের বক্তব্য, সীমান্তে গোরু উদ্ধারের পর শেষ অবধি সেই গোরু কোথায় যাচ্ছে এই বিষয়ে সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত করলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে। একটি সূত্র জানিয়েছে, এই গোরু পাচারের কাজে ভারতীয় সীমান্ত গ্রামের এক শ্রেণির মানুষ জড়িত রয়েছেন। তাদের সঙ্গে বাইরের বড় চক্রেরও যোগসূত্রের বিষয় নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। গোরু পাচারের কাজে এতটাই লাভ যে কয়েকবছর আগেও যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা বর্তমানে তাঁদের অনেকের গাড়ি বাড়িতো বটেই বহু সম্পত্তির মালিক হয়ে উঠছেন। তবে এই গোরু পাচারের কাজে বর্তমানে ঝুঁকি অনেকটাই নাকি কমেছে। কারণ এপারের চক্রীদের কাজ শুধু বাইরে থেকে গোরু নিয়ে এসে সীমান্ত এলাকায় মজুত করে রাখা। তারপর মোবাইল মারফত ওপারের পাচারকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে গোরু মজুতের কথা জানিয়ে দেওয়া। সেই অনুযায়ী বাংলাদেশের পাচারকারীদের লোকজনই যাঁরা এইসব এলাকায় ‘ভারী’ নামে পরিচিত। সেইসব ‘ভারী’র দল সুযোগবুঝে রাতের অন্ধকারে চুপিসারে সীমান্ত টপকে ভারতে ঢুকে গোরু নিয়ে ফের বাংলাদেশে পালিয়ে যাচ্ছে।

- Advertisement -

‘ভারী’রা অবশ্য বিনিময়ে কিছু অর্থ পেয়ে থাকে। তবে মূল পাণ্ডা সহজে কখনও সীমান্তের কাছে ঘেঁষেন না। ‘ভারী’র দল গোরু নিয়ে যাওয়ার সময় ধরা পড়লে তার দায় নাকি ওপারের পাচারকারীদের বহন করতে হয়। অর্থাৎ এপারের চক্রীদের এক্ষেত্রে লোকসানের কোনও বিষয়ই নেই। যে কারণেই দেখা যাচ্ছে এপারের অনেকে এই গোরু পাচারের কাজে আরও দারুণভাবে জড়িত হয়ে পড়েছেন।

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক কয়েকজন জানান, সীমান্ত এলাকায় গোরু পাচারের মতো লাভজনক কাজ আর নেই। কয়েকমাস ঠিকমতো কাজ জমিয়ে দিতে পারলেই গরিব থেকে ধনী হতে খুব বেশি সময়ের দরকার পড়ে না। স্বাভাবিকভাবেই যারা একবার এর স্বাদ পেয়েছেন তাঁরা সহজে ভুলতে পারবেন না। বাংলাদেশে গোরু পাঠানো এবং গোরুর পেমেন্ট পেতেও খুব একটা অসুবিধা হয়না। বেশ কিছু বড় মাপের ব্যবসায়ী এই গোরুর কাজে অর্থ লগ্নি করে চলেছেন। তাঁদের মাধ্যমে বাংলাদেশ পার্টির টাকাও এপারে অর্থাৎ ভারতে পৌঁছে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন।

তবে সীমান্তে গোরু উদ্ধারের পর কিভাবে হাত বদল করে সেইসব গোরু পুনরায় বাংলাদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে? এইবিষয়ে তদন্তে নেমে প্রশাসনেরই একটি অংশ নাকি জানতে পেরেছেন, গোরু উদ্ধারের পর সেই গোরু বিএসএফ পুলিশ হয়ে নির্দিষ্ট খোঁয়ারে পৌঁছে যায়। কিন্তু অনেকক্ষেত্রেই নাকি বেশ কয়েকটি স্থানে পৌঁছোনোর সঙ্গে সঙ্গেই সেই গোরু বাংলাদেশে চলে যায়। তবে কাগজপত্রে গোরুর অস্তিত্ব ভারতেই দেখানো থাকে। যে কারণে নথিপত্র দেখে সহজে কারোর বিষয়টি বোঝা সম্ভব নয়।

প্রশাসনের সেই সূত্রটিই জানিয়েছে, গোরু উদ্ধারের পর খোঁয়ার এবং নিলাম প্রক্রিয়া অবধি বিভিন্ন দপ্তরের কর্তারাদেরও নানা কাজ থাকে। এরপরও উদ্ধার হওয়া গোরু দিনের পর দিন বাংলাদেশে চলে যাচ্ছে। অনেকেরই বক্তব্য, সীমান্তে প্রায়ই প্ৰচুর গরু-মোষ উদ্ধার করা হচ্ছে। কারা দিনের পর দিন এইসব গোরু কিনে নিচ্ছেন, শেষে সেই গোরুগুলি কোথায় বিক্রি করছেন। কারণ চাষের কাজের জন্য প্রতিদিন এত পরিমাণ গোরু কৃষকরা কিনে থাকেন না। তাই এই বিষয়টি নিয়ে সঠিকভাবে তদন্ত করলে অনেককিছু বেড়িয়ে আসতে পারে বলে তাঁদের ধারণা।

সন্দেহ খোঁয়ারে যত গোরু থাকার কথা বাস্তবে তা নেই। তাই ২০১৮ সাল থেকে আজ অবধি কত গোরু উদ্ধার হয়েছে, বর্তমানে কত গোরু রয়েছে। সঠিকভাবে তদন্ত করে সমস্ত হিসেব প্রকাশ্যে এনে পুরো নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বিষয়েও জনপ্রতিনিধিদের তরফে সম্প্রতি একটি দাবিপত্র জেলা প্রশাসনের কাছেও পাঠানো হয়েছে বলে সূত্রের খবর। উদ্ধার হওয়া গোরু বাংলাদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে, সাধারণ মানুষের পাশাপাশি এলাকার জনপ্রতিনিধিদের একাংশও এই অভিযোগ করে আসছেন। তাদের বক্তব্য মেখলিগঞ্জ সীমান্তে এই কারবার নিয়ে বড় ধরণের তদন্ত হওয়া দরকার। কারণ এর পিছনে কোটি কোটি টাকার খেলা রয়েছে। মেখলিগঞ্জ পঞ্চায়েত সমিতির প্রাণী কর্মাধ্যক্ষ বাবুল হোসেন বলেন, ‘সীমান্ত থেকে গোরু উদ্ধারের পর নিলামের জন্য কত গোরু রয়েছে। মোট কত গোরু উদ্ধার হয়েছে আজ অবধি এইসব হিসেব চেয়ে চেয়েও মিলছেনা। এইনিয়ে অনেক গরমিল রয়েছে বলে তার কাছে প্রতিনিয়ত অভিযোগ আসছে। তিনিও মনে করছেন, এর পিছনে একটি বড় চক্রের হাত থাকতে পারে। যে কারণেই ঠিকমতো নিলামের কাজ হচ্ছেনা। ছোট গোরু বদল করে বাছুর রাখা হচ্ছে। এইসব বিষয়ে সঠিক তদন্ত করলেই অনেকের মুখোশ খুলে যাবে বলে তিনি মনে করছেন। মেখলিগঞ্জ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি নিয়তি সরকার বলেন, ‘গোরুর কারবার নিয়ে ইদানিং মারাত্মক কিছু অভিযোগ তার কাছেও আসছে। কোনও হিসেব পাওয়া যাচ্ছেনা। তাই বিষয়টি আরও ভাবিয়ে তুলেছে। এই নিয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে আলোচনা করা হয়েছে। এইবিষয়ে সঠিক তদন্তের দাবিও করেছেন তিনি। মেখলিগঞ্জ সীমান্তেও গোরুর কারবারি নিয়ে সঠিকভাবে তদন্তের প্রয়োজন বলে পঞ্চায়েত সমিতির বিদ্যুৎ কর্মাধ্যক্ষ বাপী চক্রবর্তী মনে করেন। তিনি জানান, সঠিকভাবে তদন্ত হলে অনেক কিছু বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। মেখলিগঞ্জ সীমান্তের গরুর কারাবার, নিলাম ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ প্রসঙ্গে কোচবিহারের জেলা শাসক পবন কাদিয়ানের নিকট জানতে চাইলে তিনি অবশ্য জানিয়েছেন, বিষয়গুলি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।