উপসর্গ থাকলেও সংক্রমণ ধরা পড়ছে না, বিভ্রান্ত চিকিৎসকমহল

200
ছবিঃ সংগৃহীত।

রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি : করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা ধরেই নিচ্ছেন, করোনা সংক্রমণ না হলে এভাবে কোনও রোগীর মৃত্যু হতে পারে না। কিন্তু লালার নমুনা টেস্ট রিপোর্ট নেগেটিভ আসছে। ফলে কিছুটা বিভ্রান্ত চিকিৎসকমহল। তবে কি করোনা ভাইরাসের নতুন কোনও স্ট্রেন এই অঞ্চলে থাবা বসিয়েছে, যার আঘাতে মানুষ মারা যাচ্ছেন ঠিকই কিন্তু আরটি-পিসিআর পরীক্ষায় তা ধরা পড়ছে না। এই প্রশ্ন নতুন করে চিন্তা বাড়িয়েছে। কেন-না নতুন স্ট্রেন ধরার মতো ক্ষমতা উত্তরবঙ্গের ভিআরডিএলগুলিতে নেই বলে স্বাস্থ্য দপ্তর আগেই জানিয়েছিল। চিকিৎসকদের অপরপক্ষ আবার মনে করছেন, লালার নমুনা সংগ্রহ করা, সেটা সংগ্রহের পদ্ধতি এবং কিটের সমস্যার জন্যও এমনটা হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে সংক্রামিত হয়ে মৃত্যুর আশঙ্কা করা হলেও আরটি-পিসিআর রিপোর্ট নেগেটিভ থাকায় মৃতদেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। যার জেরে আরও সংক্রমণের আশঙ্কা থাকছেই। উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ভাইরাস রিসার্চ অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরির (ভিআরডিএল) দাযিত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক ডাঃ শান্তনু হাজরা অবশ্য বলেন, ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকেল রিসার্চ (আইসিএমআর)-এর গাইডলাইন অনুযায়ী আমাদের এই ভিআরডিএলেও যে চারটি স্ট্রেন এখনও ভারতে পাওয়া গিয়েছে সেগুলি ধরা পড়ার কথা। আমার মনে হয়, সঠিকভাবে লালার নমুনা না নেওয়া, সেটা সময়মতো পরীক্ষাগারে না পৌঁছানো এবং সঠিক প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা না হওয়ার জন্যই এই সমস্যাগুলি হচ্ছে। আমরা এই জন্য র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট (র‌্যাট)-এর উপর জোর দিতে বলেছি।

শিলিগুড়িতে গত এক সপ্তাহের হিসাব দেখলে শুধুমাত্র উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালেই করোনায় সংক্রামিত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রতিদিন গড়ে ১০ জনের মৃত্যু হচ্ছে। এছাড়া শিলিগুড়ির বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল, নার্সিংহোম মিলিয়ে আরও অন্তত ২০-২৫ জনের মৃত্যু হচ্ছে। যাঁর অনেকটাই প্রকাশ্যে আসছে না। আবার পাহাড়েও দার্জিলিং, কার্সিয়াং, কালিম্পং এবং মিরিকে করোনায় সংক্রামিত হয়ে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।

- Advertisement -

একাধিক হাসপাতালের চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, এমন একাধিক রোগী প্রতিদিনই আসছেন, যাঁদের শরীরে করোনার সমস্ত রকম উপসর্গ রয়েছে। যার মধ্যে অক্সিজেনের মাত্রা অত্যধিক কমে যাওয়া, প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট, জ্বর সবকিছুই থাকছে। ওই ব্যক্তিকে আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি করে লালার নমুনা নিয়ে পরীক্ষার জন্য ভিআরডিএলে পাঠানো হচ্ছে। রিপোর্ট আসার আগেই ওই ব্যক্তি মারা যাচ্ছেন। পরবর্তীতে রিপোর্ট নেগেটিভ আসছে। গত কয়েকদিনে দার্জিলিং জেলা হাসপাতালে এমন চারটি ঘটনা ঘটেছে। যেখানে করোনার উপসর্গ নিয়ে রোগীরা চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় মারা গেলেও টেস্ট রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। হাসপাতাল সুপার ডাঃ শুভাশিস চন্দ বলেন, আমরাও এই ঘটনায় হতবাক। হয়তো ভাইরাস ক্রমাগত মিউটেশনের ফলে তৈরি নতুন স্ট্রেন আরটি-পিসিআরে ধরা পড়ছে না।

চিকিৎসকরা বলছেন, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছাড়া এভাবে মানুষ মারা যাওয়ার কোনও কারণই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু আরটি-পিসিআর রিপোর্টে সংক্রমণ ধরা না পড়ায় মরদেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।

শিলিগুড়ির একাধিক নার্সিংহোমেও এমন ঘটনা আকছার ঘটছে। কোনও রোগী মারা গেলে লালার নমুনা পরীক্ষার জন্য কলকাতায় যাচ্ছে। সেখান থেকে নেগেটিভ রিপোর্ট পেয়ে মরদেহ পরিবারকে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নার্সিংহোমগুলি আবার বেসরকারি ল্যাবে পরীক্ষা করে। বেশিরভাগটাই হয় কলকাতায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিকভাবে নমুনা নেওয়া, সেটির সংরক্ষণ করে বাসে চাপিয়ে কলকাতায় পাঠানো এবং সেখানে পরীক্ষাগারে পেঁছানো পর্যন্ত ওই নমুনা সঠিকভাবে সংরক্ষিত থাকে কি না, প্রশ্ন রয়েছে। এই সমস্ত ক্ষেত্রে আইসিএমআর-এর গাইডলাইন মানা হচ্ছে কি না তা স্বাস্থ্য দপ্তরের দেখা উচিত।