উত্তর দিনাজপুরে মুখ থুবড়ে পড়েছে মিশন মাতৃকা প্রকল্প

বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ : প্রসূতিদের জন্য নিশ্চয়যান অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা থাকলেও রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে টাকা। এমনই অভিযোগ রোগীর পরিজনদের। বৃহস্পতিবার রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে নয়জন প্রসূতি ছাড়া পেয়েছেন। যাঁরা ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার বিনিময়ে নিশ্চয়যানে বাড়ি যেতে বাধ্য হয়েছেন। আর যাঁরা টাকা দিতে পারেননি, তাঁরা হাসপাতালেই পড়ে রয়েছেন। এই অভিযোগ খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন জেলার স্বাস্থ্যকর্তারা।

রায়গঞ্জ থানার মারাইকুড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের টেনহরির বাসিন্দা ধনিকা বর্মন, ইটাহার থানার বালিহারার বাসিন্দা সাইনা খাতুন সহ ছয়জন প্রসূতি ছুটি পেলেও অ্যাম্বুল্যান্স চালককে টাকা না দেওয়ায় তাঁদের দিনভর হাসপাতালেই কাটাতে হয়। রোগীর পরিজনদের অভিযোগ নিশ্চয়যান চালকরা নিয়ে যাওয়ার জন্য ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা দাবি করছে। কেউ কেউ আবার ৫০০ থেকে ৬০০ টাকাও করে দাবি করছে বিশ্বকর্মাপুজো উপলক্ষ্যে। হাসপাতালে ভর্তি করার সময় নিশ্চয়যান চালককে দেড়শো টাকা বকশিশ দেওয়া হয়। এদিন বাড়ি ফেরার সময় অ্যাম্বুল্যান্স চালক দাবি করেন, আগে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বকশিশ নিতাম। আজকে পুজোর দিন তাই আমরা ৫০০ টাকা বকশিশ চেয়েছি। রোগীর পরিজনদের অভিযোগ, আমরা গরিব মানুষ দিনমজুর, খেতমজুর। আমাদের পক্ষে অত টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। আমরা অ্যাম্বুল্যান্স চালকদের বিরুদ্ধে ১০২-এ অভিযোগ করেছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

- Advertisement -

এদিকে ইটাহার থানার নমনিয়া গ্রামের বাসিন্দা সাবানা খাতুনের প্রসববেদনা শুরু হয়। ১০২-এ বার বার ফোন করেও কোনও সুরাহা হয়নি। দীর্ঘ তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর ভুটভুটিতে চেপে রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। মাঝ রাস্তায় ওই মহিলা কন্যাসন্তান জন্ম দেন। এরপর তড়িঘড়ি রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করে প্রসূতির পরিজনেরা। ১০২ অ্যাম্বুল্যান্স চালকদের টাকার মাধ্যমে রোগী নিয়ে যাওয়া, আসার ফলে মিশন মাতৃকা ১০০ প্রকল্পে কমছে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার। রাজ্য সরকার প্রসূতিদের জন্য নিখরচায় রোগী নিয়ে আসা এবং বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার পরিষেবা চালু থাকলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মিলছে না মাতৃযান। ২০১৭ সালে এই মিশন মাতৃকা ১০০ প্রকল্প চালু করেছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নবজাতকের মৃত্যুর হার ঠেকাতে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবে জোর দেওয়া হয়েছিল উত্তর দিনাজপুর জেলায়। চালু হয়েছিল মিশন মাতৃকা ১০০ প্রকল্প।

এই প্রকল্পে নিরাপদে শিশুর জন্ম দিতে সরকারি হাসপাতালে যাওয়ার উৎসাহ বেড়েছিল। উত্তর দিনাজপুর জেলায় মিশন মাতৃকা চালুর দুই বছরের মধ্যেই এক ধাক্কায় সরকারি হাসপাতালে প্রসব ৬২ শতাংশ থেকে ৯০ শতাংশ হয়েছিল। বর্তমানে সেই প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার ৫০ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। বর্তমানে ইসলামপুর মহকুমা এলাকায় প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার প্রায় ৪৮ শতাংশ। তবে সারা জেলার নিরিখে ৫০ শতাংশ। তবে নিশ্চয়যান প্রকল্পের গাড়িচালকদের বেপরোয়া মনোভাব ও টাকা নেওয়ার দরুন হাসপাতালে গিয়ে সন্তান প্রসবের চেয়ে বাড়িতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। বাড়িতে প্রসবের ট্র‌্যাডিশন ক্রমশই বাড়ছে। উত্তর দিনাজপুরের মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক কার্তিকচন্দ্র মণ্ডল বলেন, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, অ্যাম্বুল্যান্স চালক থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যদপ্তরের আধিকারিকদের গা ছাড়া মনোভাব হওয়ায় মিশন মাতৃকা ১০০ প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে।