অমিতের দাদাগিরিতে আর্মিওয়ালা রুমিত

134

মোস্তাক মোরশেদ হোসেন, বীরপাড়া : এ এক অন্য রকম দাদাগিরি। এ কাহিনীর একদিকে যেমন রয়েছে দারিদ্র‌্যকে চ্যালেঞ্জ করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার চিত্র, অন্যদিকে রয়েছে ভ্রাতৃত্ব ও কর্তব্যবোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। টাই বেঁধে আংরেজি স্কুলে পড়তে যেত চা বাগানের আদিবাসী পরিবারের ছোট ছেলেটা। বড় ছেলেটা তখন কলেজে পড়ে। কিন্তু ছোটটাকে সরকারি স্কুলে পড়িয়ে মন ভরেনি চা বাগান শ্রমিক আগনু কিন্ডোর। ছোটটা আবার গোড়া থেকেই পড়াশোনায় ভালো। তাকে বড় অফিসার বানানোর স্বপ্ন দেখতেন শ্রমিক বাবা। এই স্বপ্ন নিয়ে ছোট ছেলেকে তিনি ভর্তি করেছিলেন বীরপাড়ার ইংরেজিমাধ্যমের এক বেসরকারি বিদ্যালয়ে। ভুটান সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে  সাইকেলে চেপে ১৩-১৪ কিমি দূরের স্কুলে পড়তে যেত ছেলেটা। ছোটু যখন গলায় টাই বেঁধে পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে বেরিয়ে যেত, বুকটা যেন চওড়া হয়ে উঠত আগনুর।

কিন্তু আগনুর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে ২০১৩ সালে। বাগানটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে বাড়িতে উনুন জ্বালানোই মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। হাল ধরতে এগিয়ে আসে বড় ছেলে অমিত। বাবাকে জানায়, মঁয় তর সপনা ব্যর্থ হোয়ে নি দ্যাবো। ভাইকে মঁয় পড়হাবো। সেই থেকে পড়াশোনায় ইতি অমিতের। সংসারে ভাত জোটানোর পাশাপাশি ভাইকে পড়াতে চেপে ধরে গাড়ির স্টিয়ারিং। লড়াইয়ের শুরুটা তখন থেকেই। অমিত সহ গোটা পরিবার খুশির হাসি হাসল এতদিনে। অফিসার হতে পারেনি অমিতের ভাই রুমিত। কিন্তু সুযোগ মিলেছে দেশের সেবার কাজে ব্রতী হওয়ার। বিএসএফের জওয়ান হিসেবে কাজে যোগ দেওয়ার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার এসেছে বাড়িতে। কিন্ডো পরিবার তাই সাময়িকভাবে ভুলেছে বাগান বন্ধ হওয়ার যন্ত্রণা। মহল্লায় হইচই, আর্মিওয়ালা বন গেলাক রুমিত। তবে কিন্ডো পরিবার সহ গোটা মহল্লা রুমিতের সাফল্যের যাবতীয় কৃতিত্ব দিচ্ছেন তাঁর দাদা অমিতকেই। ওঁরা বলছেন, অমিত দাদাগিরি না করলে রুমিতের পড়াশোনাই মাঝপথে বন্ধ হয়ে যেত। চাকরি তো দূরের কথা!

- Advertisement -

ভুটান সীমান্তবর্তী বান্দাপানি চা বাগান থেকে বীরপাড়া যেতে এমনিতেই অনেক বাধাবিপত্তি পেরোতে হয়। পথে রয়েছে একের পর এক সেতুবিহীন নদী। তবু মাইলের পর মাইল পথ সাইকেলে পাড়ি দিয়ে মাঝে মাঝেই প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছে বান্দাপানির নয়া প্রজন্ম। ওদের কাছে লড়াইটা অনেক বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে বাগান বন্ধ থাকায়।

কিন্তু তারই মাঝে চলছে লড়াই। যেমন হার মানেনি কিন্ডো পরিবার। কিন্তু রুমিত চাকরি পেলেও অমিতের প্রশংসাই বেশি ঘুরছে প্রতিবেশীদের মুখে। ওঁদের প্রতিবেশী লচমন ওরাওঁ বলছেন, চাকরি রুমিত পেয়েছে। কিন্তু এতে জয় হয়েছে অমিতের। ও বারবার বলত, ভাইকে জীবনে দাঁড় করাব। ও সেটা করে দেখিয়েছে। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে একসময় ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে কলেজে ভর্তি হয় রুমিত। পাশাপাশি বসতে থাকে চাকরির পরীক্ষায়। বরাবরই মাথার ওপর ছায়ার মতো ছিলেন তাঁর দাদা, জানান রুমিত।

বীরপাড়া থেকে সেতুবিহীন বিরবিটি, ডিমডিমা ও চারো নদীর সেতুবিহীন একটি শাখা (অন্য শাখায় সেতু তৈরি হয়েছে) পেরিয়ে পৌঁছুতে হল বান্দাপানি চা বাগানের কালীবাড়ি লাইনে। বাড়ির কর্তা আগনু ওরাওঁ তখন নদী থেকে বালি-বজরি তুলছেন। গিন্নি দুসরি ওরাওঁ গিয়েছেন ঘাস কাটতে। তবে বাড়িতেই ছিলেন অমিত ও রুমিত। কথায় কথায় অমিত হেসে বলেন, জানি না এমন কী করলাম যে আমি ইন্টারভিউ দেওয়ার সুযোগ পেলাম। তবে, আমার বুকের ওপর থেকে একটা বড় বোঝা নেমে গিয়েছে। এবার হয়তো বাবাকে আর এত কষ্ট করতে হবে না। রুমিত বলেন, বাবা শখ করে ভর্তি করিয়েছিল বেসরকারি স্কুলে। উঁচু ক্লাসে পড়াশোনার খরচ বেড়ে যায়। এদিকে, বাগান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাবার রোজগারও বন্ধ হয়ে যায়। দাদা যদি পড়ানোর দায়িত্ব না নিত এতদিন হয়তো আর পাঁচজনের সঙ্গে আমিও নদী থেকে বালি-বজরি তুলতাম।