তৃণমূল বিধায়ক ঘনিষ্ট ভাইপোর হাতে খুন হওয়ার আশঙ্কায় মুখ্যমন্ত্রীর দ্বারস্থ বৃদ্ধ

448

প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়,বর্ধমান: সম্পত্তি হাতানোর জন্য বৃদ্ধ কাকাকে মারধোর করে নানা কাগজে সই করিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তৃণমূল বিধায়ক ঘনিষ্ট ভাইপোর বিরুদ্ধে। পূর্ব বর্ধমানের মেমারি পৌরসভার হাটপুকুর এলাকার ঘটনা। ভাইপো রামশঙ্কর চক্রবর্তীর হাতে খুন হওয়ার আশঙ্কায় বাড়ি ছেড়ে বৃদ্ধ পিযুষকান্তি চক্রবর্তী আত্মগোপন করেছেন। একই সঙ্গে ভাইপোর কুকীর্তি সবিস্তার উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লিখে সুবিচার প্রার্থনা করেছেন বৃদ্ধ। পাল্টা বৃদ্ধর বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে প্রতারণার মামলা। পুলিশ সমস্ত অভিযোগের তদন্ত শুরু করলেও ভাইপোর অত্যাচার থেকে আদৌ নিস্কৃতি মিলবে কিনা তা নিয়ে সন্দিহান রয়েছেন বৃদ্ধ।

মুখ্যমন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে পীযূষবাবুর দাবি করেছেন, তাঁর বয়স ৭০ বছর। তিনি ২০১১ সাল থেকে তিনি ও তাঁর অবিবাহিত বয়স্ক ভাই গুরুচরণ নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। জেলা পুলিশ সুপারের কাছেও চিঠিতে অত্যাচারের ঘটনা জানানো হয়। মুখ্যমন্ত্রীকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে পীযূষকান্তি বাবু বলেছেন, “এরআগেও ভাইপোর অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে মূখ্যমন্ত্রীর কালীঘাটের বাড়িতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে তাঁকে ডিজির কাছে পাঠানো হয়। ডিজি তাঁর কথা শুনে মেমারির থানার ওসিকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ডিজির নির্দেশ মেনে মেমারি থানার ওসি উভয় পক্ষকে নিয়ে আলোচনায় বসেছিলেন।

- Advertisement -

বৃদ্ধ পীযূষকন্তি বাবু বলেন, এরপর কিছু দিন তিনি শান্তিতে থাকতে পারলেও ফের তাঁর উপর একইরকম ‘অত্যাচার’শুরু হয়। সম্পত্তি কেড়ে নেওয়ার জন্য বেপরোয়া মারধোর করে নানা কাগজে তাঁকে দিয়ে সই করিয়ে নেওয়া হয়। পীযূষকান্তি বাবুর অভিযোগ ,একই কারণে তাঁর বয়স্ক ভাই গুরুচরণ চক্রবর্তীও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ভাইপোর অত্যাচার সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় ‘আত্মগোপন’ করে থাকতে বাধ্য হয়েছেন বলে দাবি করেছেন।

পীযূষকান্তি বাবু জানান, তাঁদের যৌথ পরিবারের কারখানার সমস্ত মালপত্র, যন্ত্রপাতি, আচ্ছাদন কাঠ, ব্লোয়ার, গাড়ি ডিজেল ইঞ্জিন ইত্যাদি সবকিছু বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। এই ঘটনার প্রতিবাদ করাতে তাঁকে রামশঙ্কর চক্রবর্তী-সহ অপর আরও দুই ভাইপো প্রাণে মারার হুমকি দেয়। তা নিয়ে তিনি থানায় জানানোর পর থেকে তাঁর উপর ধারাবাহিকভাবে অত্যাচার চলতে থাকে।

চিঠিতে পীযূষকান্তি বাবু মুখ্যমন্ত্রীকে আরও জানিয়েছেন, তাঁর ভাইপো রামশঙ্কর মেমারির বিধায়ক নার্গিস বেগমের বিশেষ ঘনিষ্ঠ। রামশঙ্করের নামে থাকা একটি দামি চারচাকা গাড়ি বিধায়ক চাপেন। রামশঙ্কর আবার পালশিট টোলপ্লাজার তৃণমূল শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা হওয়ার সুবাদে মাঝেমধ্যেই মাঝরাতে বেশ কিছু ছেলে নিয়ে এসে তাঁর শোওয়া ঘরে তালা-চাবি মেরে দেয়। এ কারণে তাঁদের বাইরে রাত কাটাতে হয়।

পীযূষকান্তি বাবু বলেন, ২০১৬ সালে তাঁদের বাড়ির একাংশে বিধায়ক নার্গিস বেগমের অফিস করে দিয়েছে রামশঙ্কর। বিধায়ক ঘনিষ্ট হওয়ায় রামশঙ্কর বুকফুলিয়ে বলে বেড়ায় ‘আমার হাতে বিধায়ক রয়েছে, কেউ কিছু করতে পারবে না। আর বাস্তবে সেটাই হচ্ছে।”

মেমারির বিধায়ক নার্গিস বেগম যদিও রামশঙ্করের সঙ্গে ঘনিষ্টতা থাকার কথা মেনে নিয়েই বলেন ‘ কারুর পারিবারিক বিবাদে আমার কি ভূমিকা থাকতে পারে? এই বিষয়ে রামশঙ্করের সঙ্গে কথা বলার উপদেশ দেন বিধায়ক। রামশঙ্গর যদিও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেছেন।

বৃদ্ধ পীযূষকান্তি চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে আবার পাল্টা অভিযোগ করেছেন মেমারি নিবাসী নীলকমল সরকার, মনোজ রায়-সহ চারজন। তঁদের অভিযোগ, ‘একটি জমি কেনার ব্যাপারে পীযূষকান্তিবাবু-সহ আটজনের সঙ্গে তাঁরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন। ওই জমির দাম নির্ধারণ হয় ১ কোটি ৩২ লক্ষ ৪৩ হাজার টাকা। তার মধ্যে ৩৬ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা তাঁদের দেওয়া হয়ে গিয়েছে। এরপর থেকে হঠাৎ করেই পীযূষাকান্তি বাবু গা ঢাকা দিয়েছেন।’

যদিও পীযূষকান্তি বাবু জানিয়েছেন, ‘তাঁর মালিকাধীন সম্পত্তিগুলি জোর পূর্বক লিখিয়ে নেওয়া হয়। ওই সব কাগজে তিনি সই করতে না চাওয়ায় তাঁকে রাতের পর রাত দরজায় চাবি দিয়ে বারান্দায় বসিয়ে রেখে মারধর করতো ভাইপো রামশঙ্কর। তাঁকে নামমাত্র টাকা দিয়ে ওই জমির মূল্যের বাকি টাকা রামশঙ্কর সহ অন্যরা আত্মসাৎ করে নিয়েছে।’

যদিও পীযূষকান্তি বাবুর এই সব অভিযোগ মানতে চাননি রামশঙ্করবাবু। তাঁর বক্তব্য “ তাঁর বাবার অগাধ সম্পত্তি রয়েছে। সেই সম্পত্তি কীভাবে ব্যবহার করবেন সেটাই বুঝে উঠতে পারছেন না। অন্য কারুর সম্পত্তি দখল করার স্প্রীহা তাঁর নেই। বরং, পীযূষকান্তি বাবু নানাজনের সঙ্গে প্রতারণা করে গা ঢাকা দিয়ে মিথ্যা অভিযোগ করে চলেছেন “।

জেলা পুলিশের এক কর্তা বলেন, “পারিবারিক বিবাদের বিষয়টি নিয়ে রবিবার দু‘টি অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছে। দু’টি চিঠির অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করা হয়েছে।’’