খোলা আকাশের নীচে রাত কাটছে ভাঙনদুর্গতদের

সেনাউল হক, বৈষ্ণবনগর : গঙ্গা কেড়ে নিয়েছে মাথার ওপরের ছাদটা। গিলে নিয়েছে বাপ-দাদার জমিও। ত্রাণ বলতে কারও কারও একটা ত্রিপল জুটেছে। কোনওরকমে সেই ত্রিপলে মাথা গুঁজে রাত কাটিয়েছেন অনেকে। তবে নদীর রোষে সর্বস্ব হারিয়ে চিনাবাজারের সিংহভাগ ভাঙনদুর্গতকেই সারারাত খোলা আকাশের নীচেই কাটাতে হয়েছে। একদিন আগেই পাকা বাড়িতে যাঁদের বসবাস ছিল, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আজ তাঁরা খোলা আকাশের নীচে। কিন্তু কেন এমন দুর্দশার মুখে পড়তে হল হাজার হাজার মানুষকে? এই অসহায় অবস্থার জন্য দায়ী কে?

বৈষ্ণবনগরের বিজয়নগর-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের চিনাবাজারের বাসিন্দাদের একটাই উত্তর, এর জন্য সম্পূর্ণভাবে দায়ী ফরাক্কা ব্যারেজ কর্তৃপক্ষ। ভাঙন পীড়িতদের অভিযোগ, ফরাক্কা ব্যারেজের ১০৮ নম্বর ও ১০৯ নম্বর গেট খুলে দেওয়ার ফলেই রবিবার সকাল থেকে ব্যাপক ভাঙন দেখা দেয় চিনাবাজার এলাকায়। ভাঙনের ফলে নিমেষের মধ্যে চল্লিশটিরও বেশি বাড়ি গঙ্গাগর্ভে তলিয়ে যায়। গঙ্গার তাণ্ডবে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এলাকার বাসিন্দারা। ওই গ্রামের আশপাশের শতাধিক পাকাবাড়ি ভেঙে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় দেড়শোও বেশি পরিবার। সোমবার ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শনে যান অতিরিক্ত জেলাশাসক (উন্নয়ন) অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কালিয়াচক-৩ ব্লকের উন্নয়ন আধিকারিক গৌতম দত্ত, জেলা পরিষদের সহকারি সভাধিপতি চন্দনা সরকার সহ প্রশাসনিক কর্তারা। অতিরিক্ত জেলা শাসককে সামনে পেয়ে গ্রামবাসীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ফরাক্কা ব্যারেজ কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবেই এই ভাঙন পরিস্থিতি তৈরি করেছে বলে অভিযোগ করেন ভাঙনদুর্গতরা গ্রামবাসীরা।

- Advertisement -

গ্রামের বাসিন্দা রহিম শেখ, আব্বাস আলিরা বলেন, ফরাক্কা ব্যারেজের ১০৮ নম্বর ও ১০৯ নম্বর গেট রয়েছে মালদার সীমানায়। এই গেট দুটি খুলে দেওয়ার ফলেই গঙ্গার জল প্রচন্ড বেগে ব্যারেজের দিকে যেতে থাকে। ফলে মার্জিনাল বাঁধের ভাঙা অংশে প্রচণ্ডভাবে ধাক্কা মারে। সেই জল ঢুকে যায় চিনাবাজার এলাকায়। ওই এলাকার পাঁচশো মিটারের বেশি অংশ নিয়ে ঘুরতে থাকে গঙ্গার প্রবল জলস্রোত। ফলে মুহুর্তের মধ্যে চল্লিশটিরও বেশি বাড়ি গঙ্গাগর্ভে চলিয়ে যায়। এই দুটি গেট কেন খোলা হল? এই প্রশ্ন করা হলে ফরাক্কা ব্যারেজের জিএম শৈবাল ঘোষ কোনও সদুত্তর দিতে পারেননি। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, ফরাক্কার জিম এই মার্জিনাল বাঁধ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা শুরু করেছেন। যে অংশ ভেঙে গিয়েছে, সেই অংশ মেরামত করতে কোটি কোটি টাকা আসছে। অথচ বালির বস্তা ছাড়া কিছুই ফেলা হয় না।

জেলা পরিষদের সহকারি সভাধিপতি চন্দনা সরকার বলেন, গ্রামবাসীদের অভিযোগ একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ ফরাক্কা ব্যারেজের ১০৮ নম্বর ও ১০৯ নম্বর গেট দুটি খোলার কোনও যৌক্তিকতা ছিল না। বছর কয়েক আগে ওই গেটদুটি খুলে দেওয়ার ফলে সরকারটোলায় ব্যাপক ভাঙন হয়েছিল। একইভাবে এবার চিনাবাজার এলাকায় ভাঙন হয়েছে। বিডিও গৌতম দত্ত বলেন, অতিরিক্ত জেলা শাসক এসেছিলেন। তিনি এলাকা ঘুরে দেখেছেন। আমরা সম্পূর্ণ বিষয়টি তাঁকে বলেছি। যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের জন্য জায়গা খোঁজা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত সকলকের জন্যই পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে।