পৃথক ইসলামপুর: বিজেপি মন্ত্রী দেবশ্রীর মন্তব্যে ক্ষোভ

1422

ইসলামপুর: ইসলামপুর মহকুমাকে নিয়ে পৃথক জেলায় সায় নেই রায়গঞ্জের সাংসদ তথা দেশের শিশু ও নারী কল্যান দপ্তরের মন্ত্রী দেবশ্রী চৌধুরী। বিষয়টি কেন্দ্র করে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে  ‘ট্রান্সফারড এরিয়ার’ বাসিন্দাদের মধ্যে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দেবশ্রী চৌধুরী জানান, ‘ইসলামপুরকে নিয়ে পৃথক জেলা হোক আমি তা চাই না। ইসলামপুরের জনসংখ্যা ও আয়তন হিসাবে জেলা হওয়ার মত নয়।‘ আর তাতেই ক্ষোভে ফুঁসছে ইসলামপুর তথা ট্রান্সফারড এরিয়ার বাসিন্দারা।

এবিষয়ে তৃণমূলের উত্তর দিনাজপুর জেলা সভাপতি কানাইয়ালাল আগরওয়াল বলেন, ‘আসলে বহিরাগত হলে যা হয়। তিনি এলাকার ভৌগলিক অবস্থান সম্বন্ধে অবহিত হন। ঠান্ডা ঘরে বাস করে মঞ্চে জ্বালাময়ী ভাষণ দিলে হয় না। মানুষের কষ্টে সামিল হলে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের সমস্যা অনুভব করা যায়। দাসপাড়া, হাপ্তিয়া, সুজালি সহ সীমান্তবর্তী গ্রামের বাসিন্দাদের জেলায় কোনও কাজ পড়লে তা সেরে ওই দিন বাড়ি ফিরতে পারেন না। তাদের হোটেলে থাকা ছাড়া কোনও উপায় থাকে না। ইসলামপুরকে জেলা করা নিয়ে ইতিহাস রয়েছে তা তিনি জানেন না।

- Advertisement -

সূত্রের খবর, কালিম্পং, ঝাড়গ্রাম, আলিপুরদুয়ার, কিংবা ২৪ পরগনা এমনকি মেদিনীপুর জেলা ভাগের বহু আগে থেকেই ট্রান্সফারড এলাকা নিয়ে পৃথক জেলা গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয় ইসলামপুরে। ২০১৭ সালে ৪ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের সর্বশেষ জেলার স্বীকৃতি লাভ করে ঝাড়গ্রাম। ইসলামপুর মহকুমা কখনও বিহারের পূর্নিয়া জেলায়, দার্জিলিং ও পশ্চিম দিনাজপুর। এখন উত্তর দিনাজপুরের একটি মহকুমা এবং চোপড়া, ইসলামপুর, গোয়ালপোখর, চাকুলিয়া ও ডালখোলা থানা নিয়ে ইসলামপুরকে পৃথক পুলিশ জেলা ঘোষণা করা হয়েছে প্রায় বছর খানেক আগে। তবে জেলা আদায় অধরাই থেকে গিয়েছে।

ইতিহাস ও বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গিয়েছে, স্টেট রি-অর্গানাইজেশন কমিটির সুপারিশ ক্রমে ১৯৫৬ সালের ২৫ অক্টোবর ইসলামপুর মহকুমা ও  ফাসিদেঁওয়া থানার ১৯টি মৌজা দার্জিলিং জেলার সাথে যুক্ত হয়। যার নোটিফিকেশন নম্বর এস.আর.ও ২৪৭৩। ওই বছরের ১ নভেম্বের থেকে ওই আদেশ কার্যকর করা হয়। ঠিক তার পরের দিন সরকারি বিজ্ঞপ্তি জারি করে দার্জিলিং জেলা থেকে ইসলামপুর মহকুমাকে সরিয়ে পূর্বতন পশ্চিম দিনাজপুর জেলার যুক্ত করা হয়। যার সরকারি জি.এ-৩৮৭৫, তাং ০২.১১.১৯৫৬। এরপর  ১৯৫৯ সালের ২০ মার্চ ১১৭৭ নং জি.এ দ্বারা মহানন্দা নদীর উত্তরাংশের মোট ১৯টি মৌজার প্রায় ৫৬.৯৬ বর্গ মাইল এলাকা দার্জিলিং জেলার সাথে যুক্ত হয়। অবশেষে ১৯৯২ সালের ১ এপ্রিল পশ্চিম দিনাজপুর বিভাজন হলে উত্তর দিনাজপুর জেলার মধ্যে পড়ে ইসলামপুর মহকুমা।

ইসলামপুর মহকুমাকে নিয়ে জেলার দাবি জোরালো হয় নব্বই দশকের গোড়াতেই। ওই সময় কোলকাতা হাই কোর্টে ইসলামপুরকে জেলা করার দাবি নিয়ে একটি মামলা হয়। ট্রান্সফারড এরিয়া সূর্যাপুর অর্গানাইজেশনের (টাসো) মুখপাত্র পাশারুল আলম জানান, আদালত ইসলামপুরকে জেলা করা যায় কিনা তা খতিয়ে দেখতে ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেয়। সেই সময় রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু আমাদের আশ্বাস দেন, যখনই নতুন জেলা করা হবে তখনই ইসলামপুরকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। এছাড়া দার্জিলিং এর প্রাক্তন সাংসদ ইন্দ্রজিৎ খুল্লার ইসলামপুরকে জেলা ঘোষনার দাবি নিয়ে সংসদে সরব হন।

তিনি ১৯৯০ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে ৪৯৩৪ নং প্রশ্ন তদানিন্তন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সুবোধ কুমার সহায় এর দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইসলামপুরকে জেলা করার দাবিতে জোড়ালো দাবি তোলেন। সুবোধ কান্ত সহায় ইন্দ্রজিৎবাবুকে লিখিতভাবে জানান যে জেলা ঘোষণা করা যেহেতু রাজ্যের বিষয়, সেই মোতাবেক তিনি রাজ্য সরকারের সাথে কথা বলে জেনেছেন বিষয় রাজ্য সরকারের প্রক্রিয়াধীন ও বিবেচনাধীন। তারপরে আমাদের রাজ্যে অনেক জেলার জন্ম হলেও ইসলামপুর আছে ইসলামপুরেই। আসলে মন্ত্রী দেবশ্রী চৌধুরী ইসলামপুরকে নিয়ে জেলা করার আন্দোলন ও তার ইতিহাস সমন্ধে জানেন না।‘ বিশিষ্ট সমাজসেবী মেধাপাটেকর ও বিশিষ্ট লেখিকা মহাশ্বেতা দেবী ইসলামপুরকে জেলা করার ব্যাপারে সওয়াল করেন।

উল্লেখ্য, উত্তরবঙ্গে আলিপুরদুয়ার জেলা ঘোষনা হওয়ায় ইসলামপুর মহকুমাকে নিয়ে পৃথক জেলা করার দাবিতে গোয়ালপোখর ও চাকুলিয়ার বিধায়ক যথাক্রমে গোলাম রব্বানী ও আলি ইমরান রমজ বিষয়টি নিয়ে বিধান সভায় সরব হয়েছেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দেবশ্রী চৌধুরী ইসলামপুরকে নিয়ে পৃথক জেলা হোক চান না। তার প্রভাব আগামী বিধানসভা নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে তা নিয়ে চিন্তিত রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল। তাদের ধারণা, ইসলামপুরকে পৃথক জেলার দাবির সাথে এলাকার মানুষের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দেবশ্রীর এই মন্তব্যে মানুষের আবেগে কিছুটা হলেও প্রভাব পড়বে।