মার্শাল আর্টে নতুনদের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন বীরপাড়ার অনিল

172

মোস্তাক মোরশেদ হোসেন, বীরপাড়া : শৈশবেই বাবা-মাকে হারিয়েছিলেন। দাদার অনটনের সংসারে দেহচর্চার সুযোগ মিললেও বরাতে বাদাম-পেস্তা কোনওদিনও জোটেনি। জুটবেই বা কী করে! দাদা নিজেই তখন পরিবারের অন্ন জোটাতে হিমসিম খাচ্ছেন। তাই দুপয়সা রোজগারের তাগিদে স্কুল পড়ুয়া ছেলেটিকে পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে কখনও নদী থেকে বালি-বজরি তুলতে হয়েছে। কখনও বা গুদামে কাজ করতে হয়েছে। বাদাম-পেস্তা তো দূর, বরাতে মামুলি ছোলা আর গুড়ও জুটত না। তবুও ব্ল্যাক বেল্ট পাবে বলে চা বাগানের ছোট্ট ছেলেটা স্বপ্ন দেখত। স্বপ্ন অবশ্য ব্যর্থ হয়নি। স্থির লক্ষ্য, তিতিক্ষা আর অধ্যবসায় তাঁকে সেই স্বপ্ন ছুঁতে সাহায্য করে। আলিপুরদুয়ার জেলার বীরপাড়া থানার দলমোর চা বাগানের শ্রমিক পরিবারের ছেলে অনিল লোহারা এখন বীরপাড়ার বড় লাইনে উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের মার্শাল আর্টের প্রশিক্ষণ দেন। ডুয়ার্সের উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের আত্মরক্ষার লড়াই শেখান। কমবেশি ৩০০ ছেলেমেয়ে তাঁর কাছে প্রশিক্ষণ নেয়।
ডুয়ার্সের সীমানা ছাড়িয়ে জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক স্তরের প্রতিযোগিতায় অনেক আগেই অনিল তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। মুম্বইয়ে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল ক্যারাটে চ্যাম্পিয়নশিপ প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ, ভুটান, ইরান, জাপান, শ্রীলঙ্কা সহ বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে ২০১০ সালে রৌপ্যপদক এবং ২০১৫ সালে স্বর্ণপদক লাভ। ২০১৮ সালে ব্ল্যাক বেল্ট (থার্ড ডান) পান। অনিল জানান, ছোটবেলা থেকেই আর্থিক অনটন তাঁদের নিত্যসঙ্গী ছিল। বাবা সঞ্চারোয়া লোহারা ও মা লালিনা লোহারাকে তিনি শৈশবেই হারান। সাত বছর বয়স থেকেই খেলার ছলে মার্শাল আর্টের চর্চা করতেন। একদিন মার্শাল  আর্টে দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করবেন বলে স্বপ্নও দেখতেন। স্কুলে যাতায়াতের জন্য বাবা-মা গাড়িভাড়া জোটাতে পারতেন না। অনিল অবশ্য হাল ছাড়েননি। প্রতিদিন দলমোর চা বাগান থেকে কমবেশি ৭ কিলোমিটার দূরের বীরপাড়া হাইস্কুলে হেঁটেই তিনি যাতায়াত করতেন। পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি মার্শাল আর্টের চর্চাও চালিয়ে যেতে থাকেন। প্রচুর সাফল্যও আসে। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনও সরকারি সুযোগসুবিধা তাঁর বরাতে জোটেনি বলে অনিলের আক্ষেপ রয়েছে। বর্তমানে নিজের অনুশীলনের পাশাপাশি বীরপাড়া সহ বিভিন্ন গ্রামীণ এবং চা বাগান এলাকার ছেলেমেয়েদের মার্শাল আর্টের প্রশিক্ষণ দেন। ক্যারাটে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করেছেন।
অনিল বলছেন, আত্মরক্ষার স্বার্থে বর্তমানে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদেরও মার্শাল আর্ট শেখা অত্যন্ত জরুরি।  আমার স্বপ্ন ডুয়ার্সের প্রতিটি ছেলেমেয়ে মার্শাল আর্ট শিখে আত্মরক্ষায় স্বাবলম্বী হোক। এতে তাদের দেহমন সুস্থ থাকবে। আবার নিজেদের রক্ষা করার মতো সক্ষমতা গড়ে উঠবে। সবচেয়ে বড় কথা, খেলাধুলায় যুক্ত থাকলে বর্তমান প্রজন্মের  বিপথগামী হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। আমি চাই, আমার ছাত্রছাত্রীরা অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করুক। দলমোর চা বাগানের বাসিন্দা শশী সুনওয়ার বলেন, ডুয়ার্সে প্রতিভার অভাব নেই। উপযুক্ত সুযোগসুবিধা পেলে ডুয়ার্সের যুবক-যুবতীরা বিশ্বের দরবারে দেশের নাম উজ্জ্বল করার ক্ষমতা রাখে। অনিল তা প্রমাণ করে দিয়েছেন।