পাটের বীজ থেকে অ্যান্টিবায়োটিক, দিশা দেখাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

149

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে গোটা বিশ্বকে আশার আলো দেখাচ্ছে বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা পাটের বীজ থেকে আবিষ্কার করেছেন একটি নোভেল অ্যান্টিবায়োটিক, যার নাম দেওয়া হয়েছে হোমিকরসিন। প্রচলিত সমস্ত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্যান ড্রাগ রেসিস্ট্যান্ট ব্যাকটিরিয়া বা সুপারবাগকে খতম করতে হোমিকরসিন অত্যন্ত কার্যকর বলেই দাবি করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদল।

২৭ মে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানের জার্নাল নেচার-এর সায়েন্টিফিক রিপোর্ট বিভাগে ওই গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন ও অনুপ্রাণ বিভাগের অধ্যাপক হাসিনা খান, রিয়াজুল ইসলাম এবং জিন প্রকৌশল ও জৈব প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আফতাবউদ্দিনের নেতৃত্বে একদল তরুণ গবেষক হোমিকরসিন নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁদের গবেষণা স্বীকৃতি পাওয়ায় খুশি তিন অধ্যাপকই।

- Advertisement -

সম্প্রতি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকগুলির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে ব্যাকটিরিয়ার নতুন নতুন প্রজাতি। এমন অনেক ব্যাকটিরিয়ার হদিস পাওয়া গিয়েছে, যেগুলি একসঙ্গে বেশ কয়েকটি অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে লড়তে সক্ষম। আমাদের আশপাশে এমনও ব্যাকটিরিয়া আছে যেগুলি প্রচলিত সমস্ত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সফল হয়েছে, যা গোটা বিশ্বের কাছে চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই নতুন অ্যান্টিবায়োটিকের খোঁজে দিনরাত এক করে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশই। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের আবিষ্কার বিশ্বকে দিশা দেখাতে পারে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

পাটের বীজ থেকে অ্যান্টিবায়োটিক, দিশা দেখাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়| Uttarbanga Sambad | Latest Bengali News | বাংলা সংবাদ, বাংলা খবর | Live Breaking News North Bengal | COVID-19 Latest Report From Northbengal West Bengal Indiaকীভাবে খোঁজ মিলল অ্যান্টিবায়োটিকের? উত্তরে হাসিনা খান জানিয়েছেন, পাটের ডিএনএ বা জীবন রহস্য নিয়ে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছিলেন তিনি। ডিএনএ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে একসময় তিনি দেখতে পান, সেখানে ব্যাকটিরিয়ারও বেশ কিছু ডিএনএ রয়েছে। ভালো করে পরীক্ষানিরীক্ষার পর দেখা যায়, পাটের তন্তুর খাঁজে খাঁজে ৫০টিরও বেশি ব্যাকটিরিয়া বাস করছে। সেগুলির মধ্যে স্টেফাইলোকক্কাস হোমিনিস নামে ব্যাকটিরিয়ার শরীর থেকে এমন কিছু তৈরি হচ্ছে যা অন্য ব্যাকটিরিয়াদের মেরে ফেলছে। তখনই অ্যান্টিবায়োটিকের কথা তাঁর মাথায় আসে। সেইমতো নতুনভাবে গবেষণার কাজ শুরু হয় এবং তৈরি হয় হোমিকরসিন।

আফতাবউদ্দিন জানিয়েছেন, স্টেফাইলোকক্কাসের পাঁচটি নতুন প্রজাতির হদিস পেয়েছেন তাঁরা। টানা তিন বছর গবেষণার পর এসেছে সাফল্য। রিয়াজুল বলেন, সবথেকে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক মেরোপিনাম বা ভেনকোমাইসিন যেখানে কাজ করবে না সেখানে হোমিকরসিন কাজ করবে। সুপারবাগ বা মাল্টি রেসিস্ট্যান্ট ব্যাকটিরিয়ার বিরুদ্ধেও খুব ভালো কাজ করছে হোমিকরসিন। হাসিনার কথায়, অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে গোটা বিশ্ব উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। সেক্ষেত্রে নতুন একটি অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কার আমাদের ভরসা জোগাবে।

উত্তরবঙ্গের তিন নদী- মহানন্দা, তোর্ষা ও করলায় বেশ কিছু ভয়ংকর ব্যাকটিরিয়ার হদিস পাওয়া গিয়েছে। মহানন্দায় মিলেছে অ্যান্টি ড্রাগ রেসিস্ট্যান্ট ব্যাকটিরিয়া পিউটিডা, যা সিউডোমোনাস ব্যাকটিরিয়ার একটি উপজাতি। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনলজি বিভাগের একদল অধ্যাপক ও গবেষক দীর্ঘ গবেষণার পর পিউটিডা আবিষ্কার করেছেন। ফলে ওইসব ব্যাকটিরিয়া মানবদেহে প্রবেশ করলে কীভাবে চিকিৎসা হবে, তা নিয়ে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছিল চিকিৎসকদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খানিকটা হলেও স্বস্তি দিয়েছে তাঁদের।

উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনলজি বিভাগের অধ্যাপক রণধীর চক্রবর্তীর বক্তব্য, গোটা পৃথিবী হন্যে হয়ে নতুন অ্যান্টিবায়োটিকের খোঁজ করছে। বিভিন্ন দেশের ল্যাবরেটরিতে সেটা নিয়ে কাজ হচ্ছে। ওষুধ কোম্পানিগুলি দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবিষ্কার নিঃসন্দেহে বিশ্বকে ভরসা জোগাবে। এই মুহূর্তে একটি নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আফতাবউদ্দিন বলেন, কোনও আবিষ্কার শুধুমাত্র সেই দেশের জন্য কাজে লাগে না। গোটা মানবজাতি এর সুফল পাবে।

নতুন অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কার নিয়ে উচ্ছ্বসিত চিকিৎসকমহলও। তবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেও সাবধানবাণী শুনিয়েছেন তাঁরা। বিশিষ্ট চিকিৎসক শেখর চক্রবর্তী বলেন, নতুন অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কার নিঃসন্দেহে আশার খবর। তবে মুড়িমুড়কির মতো অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলেই ব্যাকটিরিয়াগুলির প্রতিনিয়ত মিউটেশন হচ্ছে এবং কয়েক বছরের মধ্যেই সেগুলি অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ শক্তি তৈরি করে ফেলছে। তাই এই ব্যবস্থাপনায় কড়া রাশ টানা না হলে কোনও অ্যান্টিবায়োটিকই বেশিদিন কার্যকরী থাকবে না।