ভোটকৌশলী নিয়োগের অর্থ দলের বিশ্বাসযোগ্যতার গ্রাফ ক্রমে নিম্নমুখী

140

দেবদুলাল ঠাকুর

নির্বাচন এবং কিছু প্রশ্ন

- Advertisement -

অমৃতলোকে চলে গেলেন শঙ্খ ঘোষ। এমন একজন মানুষ, যিনি ছিলেন একমাত্রিক চিন্তাভাবনার ধরাছোঁয়ার অনেক বাইরে। বেশ কিছুদিন আগে কবির কলম গর্জে উঠে বজ্রনির্ঘোষে উচ্চারণ করেছিল, দ্যাখ খুলে তোর তিন নয়ন, রাস্তা জুড়ে খড়্গ হাতে দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়ন। ভবিষ্যতে হয়তো কোনও কবি শঙ্খ-ধ্বনিতে অনুপ্রাণিত হয়ে লিখে ফেলবেন, দ্যাখ খুলে তোর তিন নয়ন, রাস্তা জুড়ে খড়্গ হাতে দাঁড়িয়ে আছে নির্বাচন।

পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান নির্বাচন, পূর্ববর্তী সমস্ত নির্বাচনের সময়কার শালীনতা, ভদ্রতার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে। এই অস্থির সময়ে নির্বাচন কেনও পিছিয়ে দেওয়া গেল না, সেটা কিন্তু প্রশ্ন হয়ে রয়ে গেল। একদিকে সরকারি নির্দেশে চূড়ান্ত কড়াকড়ির কথা। অন্যদিকে, নেতাদের সভার জন্য বাসবোঝাই করে জমায়েত। অদ্ভুত এক বৈপরীত্য।

হাল্লা চলেছে যুদ্ধে

একরকম যুদ্ধ ঘোষণা করেছে সব্বাই। নির্বাচন তো নয়, যেন কৌশল আর সুকৌশলের লড়াই। দুই যুযুধান দল – তৃণমূল কংগ্রেস এবং ভারতীয় জনতা পার্টি মেতে উঠেছে এই কৌশলের খেলায়। কে জিতবে, কে হারবে  – সেটা সময় বলবে। তবে ক্ষমতায় যেই আসুক, পশ্চিমবঙ্গে আগামীদিনে সাংঘাতিক রকমের জৈবিক পরিবর্তন (অর্গানিক ট্রান্সফরমেশন) আশা না করাই শ্রেয়। আলাদা করে বলা নিষ্প্রয়োজন যে, ভারতীয় জনতা পার্টি এই নির্বাচন জেতার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। করবে না-ই বা কেন? উত্তর ভারতে  একরকম স্থায়ী মসনদ, উত্তর-পূর্বেও পদ্ম ফুটেছে, পশ্চিমবঙ্গে ফোটাতে পারলে দেশে একরকম একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার হবে। তামিলনাডু বা কেরলে যে খুব সুবিধে হবে না, সেটা এরা  বুঝে গিয়েছে।

তবে আলাদা করে শুধু এই একটি দলের কথা বলে লাভ নেই।  এই নির্বাচনে সবাই সমস্ত ন্যায়-অন্যায়ের সীমা লঙ্ঘন করে ফেলেছে। তাই চিন্তা হয়, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে জন্য। নির্বাচনজুড়ে শুধু দেদার প্রতিশ্রুতি। এর সঙ্গে জুড়েছে দলবদল করে আমি ভালো, বাকিরা খারাপ গোছের অদ্ভুত তত্ত্ব। অন্যদিকে, নির্বাচনে সম্প্রতি নতুন পেশার জন্ম হয়েছে। নির্বাচন কৌশল বিশেষজ্ঞ। ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখলে, এটা কোচিং সেন্টারের মতো। আমরা স্কুল-কলেজ, জয়েন্ট এন্ট্রান্স, ফুটবল, ক্রিকেট  ইত্যাদিতে কোচিং সেন্টারের কথা জানি, যেখানে মেধা ঘষামাজা চলে ভালো ফল করার জন্য। কিন্তু এই নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ব্যাপারটা একদম আলাদা। এর প্রেক্ষিত এবং সিলেবাস একদম আলাদা। এখানে ভালো কাজ ও সামগ্রিক উন্নয়ন একমাত্র মাপকাঠি। তবে যখন কোনও রাজনৈতিক দলের নির্বাচন কৌশল তৈরির জন্য আলাদা করে বিশেষজ্ঞ নিয়োগের দরকার হয় তখন বুঝতে হবে, জনমানসে দলটির গ্রহণযোগ্যতা প্রায় নিঃশেষিত।

রং দে মোহে গেরুয়া

এই নির্বাচনের আরেকটা দিক হল দলবদল। সাম্প্রতিককালে অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র‌্যাটিক রিফর্মস (এডিআর) নামে একটি সংস্থার রিপোর্ট অনুয়াযী, ২০১৬ থেকে ২০২০-র মধ্যে যত বিধায়ক দলবদল করেছেন এবং পুনরায় নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের ৪৫ শতাংশ ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দিয়েছেন। রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে মূলত কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যাওয়ার প্রবণতাই বেশি। পশ্চিমবঙ্গে অবশ্য তৃণমূল থেকে। তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, এঁদের বেশিরভাগ হয় দলে বিক্ষুব্ধ নয়তো নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেননি। সোজাসাপটা কথায় এ এক অন্যরকম এলাকা দখলের লড়াই।

এডিআর-এর রিপোর্ট এই দলবদলের তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছে। প্রথমত, নীতিহীন রাজনীতি। দ্বিতীয়ত, অর্থের প্রতি আদিম মোহ এবং সর্বোপরি অর্থ এবং বাহুবলের মাধ্যমে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার অনন্ত স্পৃহা। এই প্রবণতা ততদিন চলবে, যতদিন মানুষ একে চালানোর অনুমতি তুলে দেবেন এই সমস্ত বিশেষজ্ঞ নির্ভর বা দল পালটানো মানুষকে নির্বাচিত করে। এটা একটা মারাত্মক সময়। এখন আমাদের দায়িত্ব, এই গণতন্ত্রের পরিহাস-কে বন্ধ করার জন্য রুখে দাঁড়ানোর। আমাদের সংবিধান কিন্তু সমস্ত রকমের বৈষম্যের বিরুদ্ধে। জাত, বর্ণ, ধর্ম ইত্যাদি যতই বৈষম্য হোক, তার বিরুদ্ধে।

অথচ আমাদের দেশে সমস্ত রাজনৈতিক দল সুকৌশলে বেছে নেয় প্রভাবশালী এবং সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিদের, যাদের জেতার সম্ভাবনা বেশি। প্রায়শই শোনা যায়, জনতাকে অর্থের প্রলোভন দেওয়া হচ্ছে বা ভোট কেনাবেচা হয়েছে। আমাদের বর্তমান ব্যবস্থায় এই কেনাবেচা ফলাফল প্রমাণ করা শুধু দুষ্কর নয়, অসম্ভব। পরিস্থিতি তাই এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রার্থীর বা দলের বিশ্বাসযোগ্যতা আর পর্যাপ্ত নয়, বরং কৌশলভিত্তিক রাজনীতিই নির্বাচনের এক এবং অদ্বিতীয় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

শুধু নেতারাই দলবদল করছেন এমনটা কিন্তু নয়। সাধারণ ভোটাররাও বেশ দোদুল্যমান।  ২০০৪-এর ৩৫টি লোকসভা আসন থেকে ২০১৯-এ একেবারে শূন্যে  উপনীত বামফ্রন্ট। বিধানসভায় ২৩৫ থেকে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি আসন পেল ২০১১-তে। উত্থান হল তৃণমূলের। আবার অতি সাম্প্রতিককালে ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে একেবারে ১৮টি আসন ছিনিয়ে নিল বিজেপি। সামগ্রিকভাবে ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের মোট ভোটের ৪০ শতাংশ পেয়ে গেল। অর্থাত্ যাঁরা একদিন লাল লাল, লালসেলাম বলতেন, তাঁরাই কিছুদিন সবুজ হয়ে এখন গাইছেন রং দে মোহে গেরুয়া। অর্থাত্ সাধারণ ভোটাররাও দলবদল করেছেন। কিন্তু কেন? শুধুই কি টাকা দিয়ে বা ছাপ্পা ভোট দিয়ে ব্যালটে এই মেরুকরণ সম্ভব?

প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

বিপুল পরিমাণ ঋণে জর্জরিত পশ্চিমবঙ্গে মুক্তির উপায় অজানা। উত্তরবঙ্গ মূলত চা বাগান অধ্যুষিত। মূলত গ্রামকেন্দ্রিক বললে অত্যুক্তি হবে না। উত্তরবঙ্গের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ তপশিলি জাতি বা উপজাতি সম্প্রদায়ের। রাজবংশী, মেচ, রাভা, টোটো, বোড়ো, ওরাওঁ, মুন্ডা, লোহার ইত্যাদি সম্প্রদায়ের ঘন সজীব অস্তিত্ব উত্তরবঙ্গের বিধানসভা আসনগুলিকে বৈচিত্র‌্যময় করে রেখেছে। সামাজিক বঞ্চনার পাশাপাশি এই প্রত্যন্ত অঞ্চল অর্থনৈতিকভাবেও বঞ্চিত। অথচ ইতিহাস সাক্ষী, উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে উত্তরবঙ্গের প্রত্যন্ত অঞ্চলেই বাংলায় প্রথম বিদেশি পুঁজির অনুপ্রবেশ হয় কৃষিভিত্তিক বৃক্ষরোপণের (ক্যাপিটালিস্টিক প্ল্যান্টেশন এগ্রিকালচার) মাধ্যমে। সহজ কথায় চায়ে ব্যাপক চাষ ও পরবর্তীতে চা শিল্পের ব্যাপক উত্থানের মধ্য দিয়ে। অথচ এখনও এখানে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি নামমাত্র। এখনও এই অঞ্চলে অন্য কোনও শিল্প সেভাবে গড়ে ওঠেনি। ভ্রমণকেন্দ্রিক শিল্প এখানকার অর্থনীতির মেরুদণ্ড হতে পারত। তবে হয়নি। সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল চা শ্রমিকদের বিনামূল্যে বিদ্যুৎ, বিনামূল্যে বাসস্থান দেবে। যে দলই  ক্ষমতায় আসুক না কেন, এইসব প্রতিশ্রুতি পূরণ হওয়া নিয়ে কিন্তু সংশয় থেকেই যায়। রাজ্যের কি সেই সামর্থ্য আছে? যদি পূরণ করতেই হয়, তবে রাজ্যের অর্থ সংকুলানের উৎস কী কী হতে পারে? আরও সোজাসাপটা জানতে চাইব, উত্তরবঙ্গকেন্দ্রিক কী কী ধরনের কর্মসংস্থান ও আয়ে উৎসের কথা রাজনৈতিক দলগুলি ভাবছে?

আবারও বলছি, আমাদের পরশপাথর চাই না। ছোটবেলার শোনা স্লোগান আজও অমলিন, রোটি, কাপড়া অউর মকান । কত সরকার এল-গেল, স্লোগান কিন্তু একই রয়ে গিয়েছে। গণতান্ত্রিক সমাজে নিবার্চন একটা সামাজিক পরীক্ষা। রক্তস্নাত হয়ে ঘরে ফেরার নাম নির্বাচন নয়। মানুষকে মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে রাজত্ব দখলের নাম নির্বাচন নয়। দুর‌্যোগের সময়ে একটা জিনিস পরিষ্কার, দায় নয়, দরকার দায়বদ্ধতার।

(লেখক পুনের ক্রাইস্ট ইউনিভার্সিটির অ্যাসোসিয়েট প্রফেসার)