পেটের টানে সস্ত্রীক ইটভাটায় কাজ করেন দোতারা শিল্পী

বুল নমদাস, নয়ারহাট : সংসারে অনটন থাকলেও তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী দোতারা। দোতারাই তাঁর ধ্যান ও জ্ঞান। দোতারা বাজিয়ে মনের ক্লান্তি দূর করেন। সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মাতেন ৪৯ বছরের কালাচান বর্মন। তাঁর যথেষ্ট নামডাক রয়েছে এলাকায়। পথভোলা পথিকও থমকে দাঁড়ান তাঁর দোতারার সুর শুনে। দোতারার সুরে সকলকে মোহিত করে মন ভরলেও তাতে পেট ভরেনি। এখনও দারিদ্র‌্যের নাগপাশ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি এই যন্ত্রশিল্পী। সরকার থেকে পাওয়া মাসিক হাজার টাকা শিল্পীভাতা ও মাত্র ৮ শতক জমির আবাদে সংসার ঠিকমতো চলে না বলে স্ত্রীকে নিয়ে বছরে ৬ মাস ইটভাটায় কাজ করতে হচ্ছে এই শিল্পীকে। এই নিয়ে আক্ষেপ থাকলেও কারও বিরুদ্ধে তাঁর অভিযোগ নেই। জীবনের কষ্টকেই ভবিতব্য হিসাবে মেনে নিয়েছেন তিনি।

মাথাভাঙ্গা-১ ব্লকের কুর্শামারি গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত দলুয়ারপার এলাকার বাসিন্দা কালাচানবাবুর স্ত্রী, তিন ছেলেমেয়ে ও মা সহ ৬ জনের সংসার। খুব অল্প বয়সেই দোতারা বাজানোর প্রতি আকৃষ্ট হন তিনি। তারপর তালিমও নিয়েছেন। বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে দোতারা বাজিয়ে প্রশংসা কুড়ালেও দারিদ্র‌্য দূর হয়নি তাঁর। চরম অভাবের মধ্যে দিন কাটলেও তাঁর সেই সাধের দোতারাকে হাতছাড়া করতে রাজি নন তিনি। নির্জন দুপুর বা পড়ন্ত বিকেল-যখনই দুঃখের স্মৃতি মাথায় কিলবিল করে আপন মনে দোতারা বাজিয়ে নিজেকে সান্ত্বনা দেন তিনি। তাঁর এই কাজে সায় দেন পরিবারের সদস্যরাও। তাঁরা ভালো করেই জানেন, দোতারার জন্যই তাঁর নামডাক হয়েছে।

- Advertisement -

তাঁর বাড়িতে বসে কালাচান আক্ষেপ করে বলেন, একফালি জমি চাষ করে এবং সরকারের দেওয়া হাজার টাকা ভাতায় ৬ জনের সংসার ঠিকমতো চলে না। তাই স্ত্রীকে নিয়ে বছরে ৬ মাস ভিনরাজ্যে ইটভাটায় কাজ করতে যাই। বাড়িতে রেখে যাই মা ও সন্তানদের। ১৩ বছর ধরে এমনটাই চলছে। এবারও ভাটায় কাজ করতে যাচ্ছি। সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি দোতারা। তিনি বলেন, ভাটায় সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর দোতারা হাতে নিলেই নিমেষে উধাও হয়ে যায় ক্লান্তি। ফিরে পান বেঁচে থাকার রসদ। দোতারাকেই আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চান তিনি। তিনি জানান, বাড়িতে থাকার সময় ভাওয়াইয়া শিল্পী বিকাশ বর্মনের সঙ্গে বিনা পারিশ্রমিকে এলাকার উঠতি শিল্পীদের গান ও দোতারা বাজানোর তালিম দেই। গান লেখা ও গানে সুরও দেই। কারও উপর অভিযোগ না থাকলেও গুণী এই শিল্পী ভবিষ্যতে দোতারা বাজানোর প্রশিক্ষণকেন্দ্র খুলতে চান। এই কাজ যে একার পক্ষে সম্ভব নয় সেটা ভালো করেই জানেন তিনি। তাই এ ব্যাপারে এগিয়ে আসার জন্য উৎসাহী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে আর্জি জানিয়েছেন তিনি।