গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার কান্ডারি আশাদিদিরা অন্ধকারে

0
1306
- Advertisement -

আশাকর্মীদের ডিউটি করার পর আইসোলেশনে রাখার প্রয়োজনীয়তা কেউ বোধ করেননি। কাজ সেরে এঁরা বাড়ি ফিরে যান। এঁদের অধিকাংশের বাড়িতে আইসোলেশনে থাকার মতো আলাদা ঘর নেই। ফলে আশাকর্মীদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবার-পরিজনরাও সংক্রামিত হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। লিখেছেন বিকাশ দাস।

পৃথিবীতে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ বিভিন্ন কারণে প্রতিবাদে পথে নামেন। কৃষক, সাফাইকর্মী, ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক। মুম্বইয়ের রাজপথে কৃষক মার্চ থেকে শুরু করে দিল্লির শাহিনবাগ, আমেরিকায় বর্ণবিদ্বেষ বিরোধী লড়াই, মিছিলটা দীর্ঘ। তার মাঝে এই লকডাউনে জীবনের স্বাভাবিক ধারায় কিছুটা ছন্দপতন এলেও প্রান্তিক মানুষের বঞ্চনার হিসাবের খাতাটি হারিয়ে যায়নি। যেকারণে এই লকডাউনের মাঝেও বেঙ্গালুরু শহরে জুলাই মাসের ১০ তারিখ থেকে প্রায় ৪০ হাজার আশাকর্মী ধর্মঘটে নামলেন, যা দ্রুত সারা কর্ণাটক রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ল। এরপর গত অগাস্ট মাসের ৭ এবং ৮ তারিখ দেশের প্রায় ৬ লক্ষ আশাকর্মী সম্মানজনক বেতন কাঠামো, পর্যাপ্ত সুরক্ষা সামগ্রী ইত্যাদির দাবিতে দুদিন ধর্মঘটে শামিল হলেন। এই প্রতিবাদের আঁচ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছোল। অবশ্য আশাকর্মীরা এই প্রথমবার প্রতিবাদে শামিল হলেন, এমন নয়। চলতি বছরের প্রথম সপ্তাহে ৪ জানুয়ারি বেঙ্গালুরু শহরে ফ্রিডম পার্কের উড়ালপথে হাজার হাজার আশাকর্মীর প্রতিবাদ-জমায়েত আকাশের রংকেও গোলাপি করে তুলেছিল। এই ঘটনাগুলি আমাদের সামনে অনেকগুলি প্রশ্ন তুলে ধরেছে। সারা বিশ্বে করোনা মহামারি একপ্রকার যুদ্ধের চেহারা নিয়েছে। আমাদের দেশে সেই যুদ্ধের মাঠে সব থেকে প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা সৈনিক এই আশাকর্মীরা। গ্রামীণ ভারতের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং পরিষেবা যে স্তম্ভগুলির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তাঁরা হলেন আশাকর্মী, অগজিলিয়ারি নার্স-মিডওয়াইফ (এএনএম), অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী এবং অঙ্গনওয়াড়ি সহায়িকা।

এই ফ্রন্টলাইন হেলথ ওয়ার্কাররা আমাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার মেরুদণ্ড। এই স্বাস্থ্যকর্মীরা দেশের প্রতিটি গ্রামে করোনা মহামারিতে সবার সামনে দাঁড়িয়ে লড়ছেন। ২০০৫ সালের ন্যাশনাল রুরাল হেলথ মিশনে ভারতের প্রতিটি গ্রামে একজন করে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করার প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল, যাঁদের পোশাকি নাম অ্যাক্রেডিটেড সোশ্যাল হেলথ অ্যাক্টিভিস্ট, সংক্ষেপে আশা। গোলাপি, বেগুনি অথবা নীল ইউনিফর্ম পরা এই স্বাস্থ্যকর্মীরা গ্রামাঞ্চলে আশাদিদি নামে অধিক পরিচিত। ভারত সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রকের ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে মোট ৬০,৬৬৪ জন আশাকর্মী প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন ৫১,৮৬৪ জন। সারাদেশে আশাকর্মীর মোট সংখ্যা ৯,২৯,৮৯৩। ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, দেশে যে কটি রাজ্যের মানুষ সবচাইতে বেশি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে যান, সেগুলির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ অন্যতম। যদিও এর বেশ কিছু অন্য কারণ থাকতে পারে, তবুও এটা স্বীকার করতেই হবে যে, গ্রামাঞ্চলের মানুষকে অসুখে-বিসুখে ঝাড়ফুঁক-তুকতাক বাদ দিয়ে হাসপাতালমুখী করানোর পিছনে আশাদিদিদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রচার, মাতৃত্বকালীন চিকিৎসা পরিষেবা, নবজাতকদের স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখা, টিবি বা যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে কাজ করা, বিভিন্ন প্রতিষেধক এবং টিকাকরণ কর্মসূচি ইত্যাদি বিভিন্ন সরকারি স্বাস্থ্যবিধি এবং নির্দেশাবলিকে গ্রামাঞ্চলে দরজায় দরজায় ঘুরে বাস্তবায়িত করেন আশাদিদিরা।

উত্তরবঙ্গের চা বাগানগুলিতে মাতৃত্বকালীন মৃত্যু, শিশুমৃত্যু, ম্যালেরিয়া জ্বর, এবং টিবি সংক্রমণের হার অন্যান্য অঞ্চলের থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি। এই চা বাগানগুলির সিংহভাগ পাহাড়, নদী, অথবা জঙ্গলে ঘেরা দুর্গম এলাকায় অবস্থিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই বাগানগুলোর সঙ্গে সরাসরি যানবাহন চলাচলের পথ নেই। এই বাগানগুলির লেবার লাইনগুলোতে রাতবিরেতে আজও এই আশাদিদি আর এএনএম-দিদিরা একমাত্র ভরসা। বক্সা পাহাড় থেকে টোটোপাড়া, মধু চা বাগান থেকে বান্দাপানি, জলদাপাড়া থেকে গরুমারার জঙ্গল, উত্তরবঙ্গের সমস্ত প্রত্যন্ত এবং প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের দরজায় বিনামূল্যে সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা পেঁছে দেওয়ার পিছনে আশাকর্মীদের অবদান অসীম। এই কোভিড মহামারির সময় আশাকর্মীদের ওপর কাজের চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে দ্বিগুণ। লকডাউনের সময় ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে কাতারে কাতারে পরিযায়ী শ্রমিক উত্তরবঙ্গের গ্রামগুলিতে ফিরেছেন। আশাদিদিরা তাঁদের সারাবছরের অন্যান্য রুটিন কাজের পাশাপাশি পরিযায়ী শ্রমিকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাঁদের কোভিড-১৯ সংক্রান্ত স্বাস্থ্য দপ্তরের নির্দেশাবলি সম্পর্কে অবহিত করিয়েছেন, সংক্রামিতের সংস্পর্শে আসা মানুষকে খুঁজে বের করেছেন, গ্রামে কারও শরীরে উপসর্গ দেখা গেলে স্বাস্থ্য দপ্তরের নজরে এনেছেন এবং সংশ্লিষ্ট মানুষটিকে লালার নমুনা পরীক্ষা করানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন। আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, আশাকর্মীরাই কিন্তু প্রথম সংক্রামিতের সংস্পর্শে আসেন। অথচ এই আশাদিদিরা সাধারণ কিছু মাস্ক আর কিঞ্চিৎ পরিমাণ হ্যান্ড স্যানিটাইজার ছাড়া অন্য কোনওরকম সুরক্ষা সামগ্রী বা পিপিই ইত্যাদি কিছুই পাননি।

একপ্রকার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই ফ্রন্টলাইন হেলথ ওয়ার্কাররা এই করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে কাজ করে যাচ্ছেন। করোনা চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত ডাক্তার, নার্স, এবং অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের বিভিন্ন হস্টেল, হোটেল বা গেস্টহাউস ইত্যাদিতে সরকারি খরচে কোয়ারান্টিনে রাখার ব্যবস্থা হয়েছে। অথচ কেউ এই আশাকর্মীদের ডিউটি করার পর আইসোলেশনে রাখার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেননি। প্রতিদিনের কাজ সেরে এঁরা বাড়ি ফিরে যান। এই আশাদিদিদের অধিকাংশের বাড়িতেই আইসোলেশনে থাকার মতো আলাদা করে কোনও ঘর নেই। ফলে আশাকর্মীদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবার-পরিজনরাও সংক্রামিত হওয়ার আশঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। অথচ হোয়াটসঅ্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুয়ো গুজব, আমাদের অসীম অজ্ঞতা, আর পুরুষশাসিত সমাজের ক্ষমতা প্রদর্শনের অপার বাসনার জাঁতাকলে পরে এই মহিলা স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতিদিন হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে। এই কিছুদিন আগে বেঙ্গালুরুর মতো শহরে কয়েকজন আশাকর্মী করোনা সংক্রান্ত সমীক্ষা করতে গিয়ে সংক্রামিত এবং হেনস্তা হলেন উন্মত্ত জনতার হাতে। সারাদেশে এরকম ঘটনা অসংখ্য। কেন্দ্রীয় বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে একজন অদক্ষ শ্রমিকের মাসিক বেতন ৯,৭৫০ টাকা হওয়ার কথা। অথচ এই আশাকর্মীরা অতি সামান্য পরিমাণ সাম্মানিক ভাতা পেয়ে থাকেন। বিভিন্ন রাজ্যে যা ২,০০০ থেকে ৩,৫০০ টাকার মধ্যে। এঁদের না আছে কোনও সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো, না আছে কোনও পেনশন, মহার্ঘভাতা, বা অন্য সরকারি কর্মচারীদের মতো সুযোগসুবিধা।

গত এপ্রিল মাসে কেন্দ্রীয় সরকার এক বিজ্ঞপ্তিতে রাজ্য সরকারগুলিকে আশাদিদিদের করোনা সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে যুক্ত থাকার জন্য আলাদা করে ১,০০০ টাকা ইনসেন্টিভ দিতে নির্দেশ দিয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের ৭৫ শতাংশ রাজ্য এই ইনসেন্টিভ আশাকর্মীদের দেয়নি। ৬৯ শতাংশ রাজ্য আশাকর্মীদের সারাবছর সাম্মানিক মাসিক ভাতাটুকু পর্যন্ত সময়মতো দেয় না। কিছুদিন আগে সংবাদপত্রের প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, এই করোনা মহামারির সময়ে মালদা জেলায় কালিয়াচক ২ নম্বর ব্লকে প্রায় ১৯০ জন আশাকর্মী প্রায় তিন মাসের ইনসেন্টিভ পাননি। কারণ, অর্থ দপ্তর থেকে টাকা মিলছে না। পরিস্থিতি সহজেই অনুমেয়। মাসের পর মাস এই কর্মীদের একপ্রকার বিনা বেতনে কাজ করতে হয়। আসলে আশাদিদিদের সরকারি খাতায় ওয়ার্কার-এর মর্যাদা দেওয়া হয়নি। তাঁদের ভলান্টিয়ার করে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ তাঁরা সরকারি কর্মচারী নন, তাঁরা স্বেচ্ছাসেবক। তাই তাঁরা বেতন নয়, ভাতা পেয়ে থাকেন। অথচ এই মহামারির সময় তাঁরা দিনে ১০-১২ ঘণ্টা কাজ করে যাচ্ছেন। সমাজবিজ্ঞানে এই ঘটনার দুই রকম বিশ্লেষণ হতে পারে। প্রথম ব্যাখ্যাটি হল, যাঁরা নীতিনির্ধারণ করেন, পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোয় তাঁরা অধিকাংশ পুরুষ। হয়তো দুএকজন নারী আছেন, কিন্তু সেটা ব্যতিক্রম। ব্যতিক্রম কখনোই নিয়মের গণ্ডিতে পড়ে না। অর্থনীতির মাপকাঠিতে সমাজের নীচুস্তর থেকে আসা এই মহিলা স্বাস্থ্যকর্মীরা তাই স্বাভাবিকভাবেই পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শোষণের শিকার।

অন্য ব্যাখ্যাটি হল, নব্য উদারনৈতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পূর্ণসময়ের কর্মী নিয়োগ যেমন মারাত্মকভাবে কমেছে, তেমনই চুক্তিভিত্তিক, অস্থায়ী, আংশিক সময়ের কর্মী, ঠিকাকর্মী ইত্যাদি নিয়োগের প্রবণতা পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। এই ঘটনা এখন আর শুধুমাত্র বেসরকারি এবং বহুজাতিক সংস্থাগুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিগত এক দশকে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরেও চুক্তিভিত্তিক এবং অস্থায়ী কর্মীর সংখ্যা বিপুলভাবে বেড়েছে। এই ব্যবস্থায় কর্মীদের সামাজিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত খাতে কোনও প্রকার খরচ না করে শুধুমাত্র ন্যূনতম পারিশ্রমিকের বিনিময়ে অপেক্ষাকৃত কম উৎপাদন খরচে পরিষেবা সৃষ্টি করা যায়। বাজারকেন্দ্রিক অর্থনীতির এটা সোজা সমীকরণ। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিকীকরণের যুগে দাঁড়িয়ে বাজারনির্ভর অর্থনীতি স্বাস্থ্য পরিষেবাকে একইভাবে নিয়ন্ত্রিত করে থাকে। জনসাধারণের স্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করে দেশের আর্থসামাজিক সমৃদ্ধি এবং মানব উন্নয়ন সূচকে অগ্রগতি সম্ভব নয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার গ্রামীণ ভারতে যে উন্নত প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থা তৈরির পক্ষে সওয়াল করেছেন, তার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন ফ্রন্টলাইন হেলথ ওয়ার্কাররা। পুরুষশাসিত এই সমাজে হাজার বঞ্চনার মাঝেও এই আশাদিদিরা ভারতীয় গ্রামীণ স্বাস্থ্যক্ষেত্রে এক নীরব বিপ্লবের কান্ডারি। কাজেই গ্রামীণ ভারতের প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতি একমাত্র তখনই সম্ভব, যখন আমাদের ফ্রন্টলাইন হেলথ ওয়ার্কারদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত অধিকারগুলি সুনিশ্চিত হবে।

(লেখক আইআইটি গুয়াহাটিতে জনস্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষক)

- Advertisement -