শিলিগুড়ি হারাচ্ছে গাছ, জীবিকা হারাচ্ছেন অশোক-নিরঞ্জনরা

60

শিলিগুড়ি : এখন আর কেউ পাড়ায় এসে হাঁক পাড়ে না, গাছ কাটাবে গো। কিংবা বাড়িতে ঢুকে কেউ আর জিজ্ঞাসা করে না,  নারকেল পাড়াবে? সুপারি গাছ পরিষ্কার করাবে? অশোক, হরিহর, নিরঞ্জন, নিশিকান্তরা পেশা হারিয়েছেন শিলিগুড়িতে। ফ্ল্যাটের দাপটে শহরের অলিগলিতেও আর গাছের দেখা মেলে না কোনও বাড়িতে। নারকেল কিংবা সুপারি গাছ তো উধাও হয়েছে কবেই। অশোক সরকারের একসময় পেশা ছিল বাড়ি বাড়ি ঘুরে গাছ, গাছের গোড়া পরিষ্কার করা, নারকেল-সুপারি পেড়ে দেওয়া। আক্ষেপ করছিলেন তিনি, কী করে আর বাঁচিয়ে রাখব পেশাকে?

আয় হত সামান্যই। তবু অভাবের সংসারে সেটাই বা কম কী। কখনও দয়া করে কেউ বাগানের একটা নারকেল বা কিছু সুপারি দিলে মুখে হাসি ফুটত ওঁদের। নারকেল, সুপারি বাজারে বিক্রি করে একটু বাড়তি আয় হত সেদিন। ইদানীং শহরজুড়ে ফ্ল্যাট সংস্কৃতির কোপে বাগানওলা বাড়ি হারিয়ে যাচ্ছে। কোনও বাড়িতেও আর গাছ খুঁজে পাওয়া যায় না। সামান্য জায়গা পেলেই ঘর তৈরি করে ফেলা হচ্ছে। ফলে বাপঠাকুরদার পেশা আর ধরে রাখতে পারছেন না অশোকের মতো আরও অনেকে। নিরুপায় হয়ে ওঁদের অনেকে এখন অন্য পেশায় ঝুঁকছেন।  কেউ কেউ আছেন, সংসার চালাতে কষ্ট হলেও বাপঠাকুরদার পেশাকে এখনও আঁকড়ে আছেন।

- Advertisement -

ফকদইবাড়ির অশোক সাহা তেমনই একজন। তিনি বলেন, একসময় গোটা শহর সবুজে ভরা থাকত। তখন আজকের মতো ঘুরে ঘুরে কাজ খুঁজতে হত না। বাড়ি ঠিক করা থাকত আগে থেকে। সময়মতো সেইসব বাড়িতে গিয়ে নারকেল, সুপারি গাছ পরিষ্কার করতাম। বাবুরা খুশি হয়ে বাগানের ফল-সবজিও দিতেন বটে। সেগুলি বিক্রি করেও বেশ চলত। এখন আর সেইদিন নেই।

২০-৩০ বছর আগেও শিলিগুড়ি শহরটা অন্যরকম ছিল। শহরে তখন বেশিরভাগ কাঠের বাড়ি। বাড়ির আশপাশে থাকত নারকেল-সুপারি বা অন্য গাছগাছালি। নিয়মিত সেসব পরিষ্কার করাতে ডাক পড়ত অশোক, হরিহরদের পূর্বপুরুষদের। ওঁরা নিজেরা এসেও জেনে নিতেন, কাজ আছে কি না। ব্যাগে থাকত মোটা দড়ি। অনেকদিন পর শুক্রবার হাকিমপাড়ায় নারকেল গাছ পরিষ্কারের কাজ পেয়েছিলেন নিরঞ্জন রায়। ফেরার পথে তাই মুখে সামান্য হাসি। তিনি বললেন, আজ আয় হল। তবে জানি না কাল কী হবে। ফ্ল্যাটের যুগে গাছটা এরপর আর থাকবে কি না, কে জানে।

সবাই অশোক বা নিরঞ্জনের মতো পেশা আঁকড়ে থাকতে পারেননি। সংসারের দিকে তাকিয়ে পুরোনো পেশা ছাড়তে হয়েছে মোহন বর্মনকে। নারকেল গাছ পরিষ্কারের যন্ত্র ছেড়ে তাঁর হাতে এখন টোটোর স্টিয়ারিং। তাঁর বক্তব্য, ঠাকুরদার আমল থেকে আমাদের পরিবারের এই পেশা ছিল। এক-একদিন পাঁচশো টাকা পর্যন্ত আয় করতাম। টোটো চালিয়ে আয় বেশি হয় বটে, কিন্তু বংশপরম্পরার পেশা বদলে ফেলার দুঃখটা থেকেই যায়।