মালদার আমের পাশাপাশি চাহিদা বেড়েছে তালের

335

গাজোল: মালদার আমের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। কিন্তু বিগত বেশ কয়েকদিন ধরে মালদার আমের সঙ্গে জুড়েছে তালের নাম। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা এবং পড়শি রাজ্য অসমে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে মালদার তালের।

মালদার বরিন্দ অঞ্চল বলে পরিচিত হবিবপুর, পুরাতন মালদা এবং গাজোল এলাকায় রয়েছে প্রচুর তাল গাছ। এর মধ্যে শুধু গাজোল থেকেই তাল যাচ্ছে শিলিগুড়িতে। এরপর শিলিগুড়ির পাইকারি বাজার থেকে সেই তাল ছড়িয়ে যাচ্ছে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা এবং পড়শি রাজ্য অসমে। অন্যবার উত্তরবঙ্গগামী বিভিন্ন ট্রেনে করে শিলিগুড়ি পাড়ি দিত গাজোলের তাল। তাতে খরচ পড়ত অনেক কম। কিন্তু বর্তমানে করোনার জন্য বন্ধ রয়েছে ট্রেন। তাই অনেক বেশি ভাড়া দিয়ে সড়কপথে তাল যাচ্ছে শিলিগুড়িতে। যার ফলে একদিকে যেমন খরচ বেড়েছে তেমনি অন্যদিকে কমেছে লাভের অংক। তবুও উত্তরবঙ্গের মানুষের রসনা তৃপ্ত করার জন্য তাল পাঠাচ্ছেন গাজোলের ব্যবসায়ীরা।

- Advertisement -

গাজোল ব্লকের বারোকোনা, চিৎকুল এলাকার বাসিন্দা কুশ মণ্ডল, বিফল মণ্ডল, বিনয় মণ্ডল, নরেশ মণ্ডল এর মতো অনেকেই এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। কুশ মণ্ডল বলেন, ‘সারা বছরে ভাদ্র আর আশ্বিন দুই মাস এই ব্যবসা চলে। আমরা এখানে এক একটি তাল ৫-৬ টাকা দামে কিনে নিই। তারপর শিলিগুড়িতে নিয়ে যেতে তাল প্রতি খরচ পরে ৭-৮ টাকা। রাস্তাতেও কিছু খরচ হয়। শিলিগুড়িতে গিয়ে পাইকারি বাজারে সেই তাল আমরা বিক্রি করি ১৮-২০ টাকায়। এবার একেকটি তাল বিক্রি করে লাভ হচ্ছে মাত্র ২ থেকে ৪ টাকা। অন্যবার আমরা ট্রেনে করে তাল নিয়ে যেতাম। তাতে খরচ পড়ত অনেক কম। কিন্তু এবার করোনা পরিস্থিতির জন্য ট্রেন বন্ধ। তাই ট্রাকে করে তাল নিয়ে যেতে হচ্ছে। তাতে একদিকে যেমন খরচ বেড়েছে, তেমনি লাভের অংকটাও অনেকটা কমেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও যেহেতু উত্তরবঙ্গ এবং অসমের মানুষ মালদার তাল ভালবাসেন তাই খরচ বেশি হলেও এবারেও শিলিগুড়িতে তাল নিয়ে যাচ্ছি আমরা।’

শুধু ব্যবসায়ীরাই নয় তালের মরসুমে মাঠ ঘাট থেকে পাকা তাল কুড়িয়ে এনে বেশ কিছু রোজগার হয় এই সব এলাকার কিশোর এবং বালকদের। সকালবেলা সাইকেলে ঝুড়ি বেঁধে তাল কুড়োতে বেরিয়ে যান তারা। একেকজন সারাদিনে ৫০-১০০টি তাল কুড়িয়ে নিয়ে এসে বিক্রি করে এইসব ব্যবসায়ীদের কাছে। একেকটি তাল তারা বিক্রি করে ৫-৬ টাকায়। ভাগ্য ভালো থাকলে একেকদিন ৫০ থেকে ১০০ টি তাল কুড়িয়ে পাওয়া যায়। পুজোর আগে বেশ ভালই উপার্জন হয় তাদের। এই টাকা যেমন সংসারের কাজে লাগে তেমনি পুজোর সময় হাত খরচও উঠে আসে কুড়িয়ে পাওয়া তালের টাকায়। এই সব এলাকায় মূলত হলুদ এবং কালো এই দুই ধরনের তাল পাওয়া যায়। তবে তার মধ্যে কালো রংয়ের তাল বেশি মিষ্টি এবং সুস্বাদু। তাই শুধুমাত্র কালো তালই বিক্রির জন্য নিয়ে আসা হয়।

পাকা তাল দিয়ে তৈরি করা হয় নানা রকম খাদ্যদ্রব্য। যার মধ্যে প্রধান হচ্ছে তালের বড়া। পাকা তালের সঙ্গে চালের গুঁড়ো, নারকেল, সুজি এবং চিনি দিয়ে মন্ড তৈরি করে তেলে ভেজে তৈরি হয় সুস্বাদু তালের বড়া। এছাড়াও পাকা তাল থেকে তৈরি হয় তালের ক্ষীর, তালের পায়েস এবং তালের রুটি। তবে শুধু পাকা তালই নয়, কচি তালের শাঁস ও খুব উপাদেয়। এই তালের শাঁস ষষ্ঠী পুজোর অন্যতম উপাদান। এছাড়াও ফেলে দেওয়া তালের বীজ থেকে পাওয়া যায় তালের ফোঁপর। যা কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর অন্যতম প্রসাদ। শুধু তাইই নয়, তাল থেকে পাওয়া যায় ভিটামিন সহ রয়েছে জিঙ্ক, পটাসিয়াম, আয়রন, ক্যালসিয়াম সহ বিভিন্ন খনিজ উপাদান। তাল অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ। কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে ভালো ভূমিকা পালন করে পাকা তাল। এত গুণ থাকা সত্ত্বেও প্রথাগতভাবে চাষ করা হয় না তালগাছের। অবহেলা অনাদরে মাঠে-ঘাটে এবং পুকুরপাড়ে বেড়ে ওঠা বরিন্দ এলাকার তাল পাল্লা দিচ্ছে মালদার আমের সঙ্গে।