এলাকায় ঘুরে ঘুরে টাকা তুলছেন ডাককর্তা

375

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : ডাক নিয়োগ জালিয়াতিতে কেঁচো খুঁড়তেই কেউটের হদিস। ডাকবিভাগের অন্দরেই রমরমা হয়েছে প্রতারণাচক্র। সরকারি চেয়ারে বসেই দিনের পর দিন এই কারবার চালাচ্ছেন এক শ্রেণির কর্মী ও আধিকারিক। ব্যক্তিগত গাড়িতে গভঃ অফ ইন্ডিয়া স্টিকার লাগিয়ে অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিন্টেন্ডেন্ট পদমর্যাদার এক ডাক আধিকারিক বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে টাকা তুলছেন বলে অভিযোগ। বছরের পর বছর ধরে এই কারবার চললেও কেন ডাকবিভাগ কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না, সেই প্রশ্ন উঠেছে।

উত্তরবঙ্গ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতে ডাক নিয়োগ জালিয়াতির অন্যতম ঘাঁটি হয়ে উঠছে কোচবিহার ডিভিশন। এই ডিভিশনকে কেন্দ্র করেই ভুয়ো মার্কশিট, সার্টিফিকেট সহ অন্য নথি সরবরাহ হচ্ছে সর্বত্র। উত্তরবঙ্গে জাল মার্কশিট সরবরাহ এবং চাকরি পাইয়ে দেওয়ার মাথা হিসাবে আলিপুরদুয়ারের সলসলাবাড়ির দক্ষিণ ঢালকর এলাকার এক ডাককর্মীর নাম উঠে এসেছে।

- Advertisement -

সূত্রের খবর, মালদার গাজোলের এক ডাককর্মীর মাধ্যমে বিহারের একটি প্রতারণাচক্রের সঙ্গে সলসলাবাড়ির ওই ডাককর্মীর যোগাযোগ হয়। সেখান থেকেই জাল সার্টিফিকেট দিয়ে গ্রামীণ ডাক সেবক পদে নিয়োগের পরিকল্পনা হয়। সেইমতো উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় চক্রটি এজেন্ট নিয়োগ করে। এই এজেন্টদের কাজ, চাকরিপ্রার্থীদের  জোগাড় করে চক্রের কাছে নিয়ে আসা। কারবার চালানোর জন্য দপ্তরের ভেতরেও প্রতারকরা ফাঁদ পেতেছে। মোটা টাকার লোভে সেই ফাঁদে পা দিয়ে একাধিক কর্মী ও আধিকারিকও চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন।

বিশ্বস্ত সূত্রের খবর, উত্তরপ্রদেশ এবং বিহারের যেসব শিক্ষা বোর্ডের নামে ভুয়ো মার্কশিট, সার্টিফিকেট তৈরি করা হচ্ছে সেইসব শিক্ষা বোর্ডেও প্রতারণাচক্রের লোকজন রয়েছে। নথিগুলি যাচাইয়ের জন্য সেইসব শিক্ষা বোর্ডে পাঠানো হলে চক্রের কারবারিরা ভুয়ো নথিকে আসল উল্লেখ করে রিপোর্ট দিচ্ছে।

সম্প্রতি একাধিক গ্রামীণ ডাক সেবকের নথি যাচাই করতে গিয়ে বিষয়টি সামনে এসেছে। ভেরিফিকেশন রিপোর্ট-এ সব ঠিক থাকলেও সংশ্লিষ্ট বোর্ডের সরকারি ওয়েবসাইটে নথির কোনও অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডাকবিভাগের উত্তরবঙ্গের এক পদস্থ আধিকারিক বলেন, প্রতারণাচক্রটি একটি ভুয়ো ওয়েবসাইটও খুলে ফেলেছিল। সেই ওয়েবসাইটে ঢুকলে ভুয়ো সার্টিফিকেটগুলি পাওয়া যেত। শুরুতে আমরাও সেটা বুঝতে পারিনি। পরে বোঝা গেল যে ওয়েবসাইটটিই ভুয়ো।

ডাকবিভাগ সূত্রে খবর, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন ডিভিশনভিত্তিক ভুয়ো মার্কশিট এবং সার্টিফিকেট দিয়ে কর্মরত সন্দেহভাজন গ্রামীণ ডাক সেবকদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সেই তালিকা মিলিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করবে ডাকবিভাগ। শাস্তি পাওয়ার ভয়ে ইতিমধ্যে যারা চাকরি ছেড়ে দিয়েছে তদন্তের আওতা থেকে তাদেরও বাদ দেওয়া হচ্ছে না। তারা কোথা থেকে কীভাবে জাল সার্টিফিকেট জোগাড় করল সেই বয়ান নথিভুক্ত করে আইনি পদক্ষেপ করতে চাইছে পোস্টাল ভিজিলেন্স বিভাগ।

ডাকবিভাগের মালদা ডিভিশনের এক পদস্থ আধিকারিক জানিয়েছেন, জিডিএসের মেধাতালিকায় স্থান পাওয়া অনেক জাল সার্টিফিকেটধারী ভয়ে চাকরিতে যোগ দিতে আসেনি। তাঁর কথায়, অনেকের সার্টিফিকেট, মার্কশিট দেখেই আমরা আন্দাজ করতে পেরেছিলাম সেগুলি জাল। তাদের ধমক দিয়ে পুলিশের ভয় দেখানোর পর তারা সেটা স্বীকার করে এবং চাকরিতে যোগ না দিয়ে ফিরে যায়। এভাবেই গোটা উত্তরবঙ্গজুড়ে মেধাতালিকায় স্থান পাওয়া কয়েকশো জাল সার্টিফিকেটধারী চাকরিতে যোগ দেয়নি। একই কথা বলেছেন কোচবিহার, জলপাইগুড়ি ও দিনাজপুর ডিভিশনের একাধিক ডাক আধিকারিক।

জাল সার্টিফিকেট, মার্কশিটের এই বিশাল কারবারের কথা জানার পরও কেন পুলিশের কাছে অভিযোগ জানায়নি ডাকবিভাগ, সেই প্রশ্ন উঠেছে সর্বত্র। পোস্টাল ভিজিলেন্স বিভাগের উত্তরবঙ্গের দায়িত্বে থাকা অ্যাসিস্ট্যান্ট ডাইরেক্টর অফ পোস্ট অফিসেস সব্যসাচী বর্মন বলেন, প্রতিদিন বহু অভিযোগ আসে। সেগুলির সত্যতা খতিয়ে দেখতে হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি বেশ সময়সাপেক্ষ। সবকিছুই খতিয়ে দেখা হবে।

চলতি মাসেই গ্রামীণ ডাক সেবক পদে সাইকেল-৩এর নিয়োগ শুরু হওয়ার কথা। প্রতারণাচক্রের কারবারিরা ইতিমধ্যে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার নামে লক্ষ লক্ষ টাকা তুলতে শুরু করেছে। দিনহাটার ভেটাগুড়ির যুবক স্বরূপ দত্তের কাছেও চাকরির টোপ দিয়ে কয়েক লক্ষ টাকা দাবি করেছে প্রতারকরা। স্বরূপের দাবি, ডাকবিভাগের কর্মীর পরিচয়ে অফার দেওয়া হয়েছিল। আমার সন্দেহ হওয়ায় ডাকবিভাগে আমার পরিচিতদের সঙ্গে কথা বলি। শেষপর্যন্ত আমি টাকা দিইনি।

সোমবার উত্তরবঙ্গ সংবাদ দুর্নীতির খবর প্রকাশ্যে আনার পর সর্বত্র শোরগোল পড়ে গিয়েছে। প্রতারকদের হাত থেকে রেহাই পাননি ডাকবিভাগের কর্মীরাও। বিশ্বস্ত সূত্রের খবর, কোচবিহার ডিভিশনের সদর দপ্তরের  অবসরপ্রাপ্ত এক চতুর্থ শ্রেণির কর্মী তাঁর ছেলের চাকরির জন্য প্রতারকদের কয়েক লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন। মেধাতালিকায় তার নামও উঠেছিল। তবে তৎকালীন কোচবিহার ডিভিশনের সুপারিন্টেন্ডেন্ট নিজে নথি যাচাই শুরু করেন। জাল সার্টিফিকেট নিয়ে চাকরিতে যোগ দিতে আসা বেশ কয়েকজনকে ধরে ফেলেন তিনি। খবর পেয়ে ভয়ে সেই ডাককর্মী ছেলেকে চাকরিতে যোগ দিতে পাঠাননি। আর এই ঘটনায় কোচবিহার সদর দপ্তরে কর্মরত এক পোস্টাল অ্যাসিস্ট্যান্টের মাধ্যমে টাকা লেনদেন হয়েছিল বলেই অভিযোগ।

ওই পোস্টাল অ্যাসিস্ট্যান্ট সম্পর্কে ইতিমধ্যে পোস্টাল ভিজিলেন্স বিভাগ খোঁজখবর নিতে শুরু করেছে। এর আগেও ওই পোস্টাল অ্যাসিস্ট্যান্টের শাস্তিমূলক বদলি হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপের দাবিতে সরব হয়েছেন কোচবিহার ডিভিশনের কর্মীদের একাংশ। যেসব ডাক আধিকারিকের সঙ্গে ওই কর্মীর ঘনিষ্ঠতা রয়েছে, তাঁদের সম্পর্কেও খোঁজখবর নেওয়া শুরু হয়েছে।

কোচবিহার, মালদা ও দিনাজপুর ডিভিশনের বেশ কয়েকজন ডাককর্মী ও আধিকারিকের আয়ের থেকে অনেক বেশি টাকার সম্পত্তির হদিস পেয়েছে ডাকবিভাগ। ওই কর্মী, আধিকারিক ও তাঁদের আত্মীয়পরিজনদের সম্পত্তি খতিয়ে দেখার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। যদিও এখনই এই বিষয়ে কোনও আধিকারিকই মুখ খুলতে চাইছেন না।