শ্রমিকদের মৃতদেহের উপর খেলবেন মেসি-রোনাল্ডোরা

দোহা : কথিত আছে, চিনের প্রাচীরের নীচে শ্রমিকদের দেহ চাপা পড়ে আছে। কাতার বিশ্বকাপের ক্ষেত্রেও প্রায় একই কথা বলা চলে। অন্তত ইংল্যান্ডের দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত একটি রিপোর্টের পর তা আরও মান্যতা পেয়েছে।

ওই রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, কাতারে বিশ্বকাপের পরিকাঠামো তৈরির কাজে জড়িত বিপুল পরিমান শ্রমিকের ইতিমধ্যেই মৃত্যু হয়েছে। এদের অধিকাংশই কর্মরত অবস্থায় মারা গিয়েছেন। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচ দেশ, ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সাড়ে ৬ হাজারেরও বেশি শ্রমিক গত ১০ বছরে কাতারে মারা গিয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি সপ্তাহে গড়ে ১২ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। বিশ্বকাপের পরিকাঠামোর তৈরির জন্য বর্তমানে প্রায় ২০ লক্ষ প্রবাসী শ্রমিক কাতারে রয়েছেন বলে দাবি।

- Advertisement -

সরকারি হিসেব অনুযায়ী, ২০১১ সাল থেকে ২০২০ প্রথমদিক পর্যন্ত কাতারে পাকিস্তান বাদে বাকি চার দেশের ৫ হাজার ৯২৭ জন শ্রমিক মারা গিয়েছেন। এরমধ্যে ২,৭১১ জন ভারতের। এছাড়া নেপালের ১,৬৪১ জন, বাংলাদেশের ১,০১৮ জন এবং শ্রীলঙ্কার ৫৫৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। অন্যদিকে, সেদেশের পাকিস্তানের দূতাবাস সূত্রে খবর, এই সময়ে ৮২৪ জন পাক নাগরিক মারা গিয়েছেন। যদিও এটাই মৃত্যুর গোটা চিত্র নয়। কারণ কেনিয়া ও ফিলিপিন্স থেকে বহু শ্রমিক কাতারে কাজে এলেও তাঁদের মৃত্যু সংক্রান্ত কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি।

ফেয়ারস্কোয়ার প্রোজেক্টস নামে একটি সংগঠন উপসাগরীয় দেশগুলিতে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করে। সংগঠনের কর্তা নিক ম্যাকগিহানের কথায়, এই শ্রমিকদের অধিকাংশই কাতার বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পাওয়ার পর সেদেশে এসেছেন। সরাসরি না বললেও, বিশ্বকাপের পরিকাঠামো তৈরির সঙ্গে যে শ্রমিকদের মৃত্যু মিছিলের যোগ আছে, তা বুঝিয়ে দিয়েছেন নিক। সূত্রের খবর, বিশ্বকাপের স্টেডিয়াম তৈরির সঙ্গে জড়িত ৩৭ জন শ্রমিক এখনও মারা গিয়েছেন। যদিও আয়োজক কমিটির দাবি, মাত্র তিনজন শ্রমিক স্টেডিয়ামের কাজ চলাকালীন মারা গিয়েছেন।

তবে এই মৃত্যুর অধিকাংশই স্বাভাবিক বলে দাবি করেছে কাতার। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশের শ্রমিকদের ৬৯ শতাংশ স্বাভাবিকভাবে মারা গিয়েছেন বলে সেদেশের দাবি। এছাড়া ১২ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন, আত্মহত্যা করেছেন ৭ শতাংশ। শুধুমাত্র ৭ ভাগ কর্মীর মৃত্যুর সঙ্গে কাজের পরিবেশের যোগ রয়েছে। এমনকি ভারতীয় শ্রমিকদের মধ্যে ৮০ শতাংশের মৃত্যুই স্বাভাবিক বলে দাবি করেছে কাতার।

যদিও গার্ডিয়ানের দাবি, অধিকাংশ শ্রমিকেরই ময়নাতদন্ত হয়নি। বছর ছয়েক আগে কাতারের আইনজীবীরা মৃত শ্রমিকদের ময়নাতদন্ত নিয়ে সরব হলেও সেদেশের সরকার পাত্তা দেয়নি। ২০১৯ সালে এক রিপোর্টে কাতারের তাপমাত্রাকে শ্রমিক-মৃত্যুতে অনুঘটক বলে চিহ্নিত করা হয়। এমনকি আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠনের গবেষণায় বলা হয়েছে, বছরে অন্তত চারমাস শ্রমিকদের কাতারের তীব্র দাবদাহের মধ্যে কাজ করতে হয়।

শ্রমিকদের মৃত্যু নিয়ে কোনও অস্বাভাবিকতা নেই ও সমস্ত মৃত্যুর তদন্ত হয়েছে বলে স্টেডিয়ামের নির্মাণকারী সংস্থা দাবি জানিয়েছে। একই সুরে ফিফার বক্তব্য, বিশ্বজুড়ে যত নির্মাণ হচ্ছে তার নিরিখে কাতারে মৃত্যুহার বেশ কম। যদিও ওই সাড়ে ছহাজার শ্রমিকের পরিবার জানে, আগামী বছর তাঁদের প্রিয়জনের লাশের উপর শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে নামবেন লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোরা।