এই মুহূর্তে কংগ্রেস-মুক্ত ভারত মানেই বিরোধী-মুক্ত দেশ নয়

124

অতনু বিশ্বাস

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার ভোটে বামেদের বিপর্যয় নিয়ে বিস্তর চর্চা চলছে। তুলনায় কংগ্রেসের ভরাডুবি নিয়ে শোরগোল যথেষ্ট কম। এ রাজ্যের ৩৪ বছরের বাম শাসনের লেগ্যাসি হিসেবে জনগণ বামেদের সাড়ে পাঁচ শতাংশ ভোট আর আসন সংখ্যা শূন্য হয়ে যাওয়াটাকে যে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেবেন, সেটাই বোধকরি স্বাভাবিক। বামেদের মুখরক্ষার জন্য তবু কেরল আছে। যদিও দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষিত, ভিন্ন আঙ্গিক, ভিন্ন লড়াই।

- Advertisement -

সদ্যসমাপ্ত বিধানসভার ভোটে কংগ্রেসের অবস্থা সত্যিই সঙিন। তামিলনাডুতে বিজযী ডিএমকের জোটসঙ্গী হিসেবে তারা গোটা আঠারো আসন পেয়েছে বটে, কিন্তু সে রাজ্যে কংগ্রেসের সওয়া চার শতাংশ ভোট যে মোটেই শ্লাঘার বিষয় নয়, সে নিয়ে আলোচনার অবকাশ কম। কংগ্রেস ক্ষমতায় আসতে পারেনি পুদুচেরিতে। অসমে বিজেপির বিরুদ্ধে অ্যান্টি ইনকামবেন্সিকে কাজে লাগাতে পারেনি। কেরলে পাঁচ বছর পরপর বামজোট আর কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোট ঘুরে ঘুরে ক্ষমতায় আসে, এমনটাই দেখে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল ভারত। তাই কেরলে সেই ট্রেন্ড ভাঙার কৃতিত্ব শুধুমাত্র পিনারাই বিজয়নকে দিলে চলবে না, এই মহামারির সংকটকালে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প হয়ে উঠতে কংগ্রেসের ব্যর্থতাকেও অস্বীকার করার উপায় নেই। স্বয়ং রাহুল গান্ধি কেরল থেকে সাংসদ হওয়া সত্ত্বেও। আর পশ্চিমবঙ্গের ছবিটা তো আমরা জানিই।

এ রাজ্যে কংগ্রেসের আসন সংখ্যা তাদের জোটসঙ্গী বামেদের মতোই শূন্যে এসে ঠেকেছে। ৪৪ থেকে। ভোট শতাংশ সওয়া বারো থেকে কমে দাঁড়িয়েছে তিনে। এর রসায়নকে কিন্তু বামেদের শক্তিক্ষয়ের ফর্মুলার সঙ্গে পুরোপুরি এক করে দেখলে চলবে না। কারণ, বাম আর কংগ্রেসের শক্তির বিন্যাস এ রাজ্যে আলাদা। আগের বিধানসভায় কংগ্রেসের থেকে অনেক বেশি ভোট পেয়ে বামেদের আসন ছিল অনেক কম। আসলে ৩৪ বছরের শাসনের লেগ্যাসি হিসেবেই বামভোট ছড়িয়ে রয়েছে এ রাজ্যের প্রতিটা প্রান্তে। তাই মোট ভোটের এক-চতুর্থাংশ তাদের গোটা ৩২ আসন দেয়। তুলনায় কংগ্রেসের শক্তি কিছু কিছু অঞ্চলে জড়ো হয়ে থাকার সুফল তারা পেয়েছে অল্প ভোট সত্ত্বেও বেশি আসন পেয়ে আমাদের ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট ভোটিং সিস্টেমে এমনটাই হয়। আর সেই কারণেই এবারের ভোটে কংগ্রেস কিছু আসন পাবে, এমনটাই ধরে নিয়েছিলেন অনেকে। কিন্তু বাস্তবে মালদা কিংবা মুর্শিদাবাদের মতো শক্ত ঘাঁটিতেও জমি হারিয়েছে তারা।

আসলে আমাদের ভোটিং সিস্টেমে বহুদলীয় গণতন্ত্র ক্রমে দুই দলীয় বা দুই জোটের লড়াইয়ে পর্যবসিত হয়। যাদের সরকার গড়ার ন্যূনতম সম্ভাবনা নেই বলে জনগণ মনে করেন, তাদের দিক থেকে তাঁরা মুখ ফিরিয়ে নেন। সেক্ষেত্রেও তৃতীয় দলের কিছু সম্ভাবনা হয়তো থাকে যদি জনগণ মনে করেন যে, প্রধান দুই দলের কেউই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না এবং তৃতীয় দলটি তাদের মধ্যে নির্দিষ্ট একটি দলকে নির্বাচনোত্তর সমর্থন জুগিয়ে সরকার গড়তে সাহায্য করবে। এটা গেম থিওরির তত্ত্ব। কিন্তু বাস্তবে এমনটা হয়নি একেবারেই। মোটের ওপর পশ্চিমবঙ্গের জমি হারানোটা কিন্তু আপাতক্ষয়িষ্ণু কংগ্রেসের কাছে এক ধাক্কা।

দীর্ঘদিন ধরেই বিজেপি ডাক দিয়েছে কংগ্রেস-মুক্ত ভারতের। তারা হয়তো মনে করেছে যে, কংগ্রেস যত ক্ষয়প্রাপ্ত হবে ততটাই সহজ হবে তাদের পক্ষে কেন্দ্রে এবং যে রাজ্যগুলোয় কংগ্রেস শক্তিশালী সেখানে ক্ষমতা ধরে রাখা বা দখল করা। বাস্তবে কিন্তু অঙ্কটা অতটা সহজ নাও হতে পারে। আসলে গণতন্ত্রে শাসক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, বিরোধী দলেরও তো একটা পরিসর রয়েছে। সে পরিসর শাসকের পক্ষে কিছুতেই দখল করা সম্ভব নয়। তাই বিরোধিতা মাথাচাড়া দেবেই, কোনও না কোনও জায়গা থেকে। এমনকি প্রয়োজনে জন্ম নেবে বিরোধিতার ক্ষেত্র।

পশ্চিমবঙ্গের কথাই ধরা যাক। বিরোধী দল হিসেবে বাম-কংগ্রেস যত দুর্বল হয়েছে গত এক দশকে, ততটাই শক্তিবৃদ্ধি করেছে বিজেপি। বিরোধী ক্ষেত্র ফাঁকা পড়ে থাকেনি, কিংবা শাসক দখল করতে পারেনি তা। তাই কংগ্রেসের মতো বাস্তবিক অর্থেই সর্বভারতীয় দল যে রাজ্যগুলোতে দুর্বল হয়ে পড়বে, সেসব জায়গায় পরিবর্তে শক্তি বাড়াবে অন্য কোনও দল, যারা হয়তো একটি বা দুটি রাজ্যেই শক্তিশালী। যেমন উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেস শক্তি হারিয়েছে বেশ কিছু বছর ধরেই, বিজেপি প্রবলভাবে দখল নিয়েছে রাজ্যটার। বিরোধিতার জায়গাটা কিন্তু কেউ না কেউ ভরাট করে ফেলবেই। এটাই নিয়ম।

যেমন, সাম্প্রতিক পঞ্চায়েত ভোট প্রমাণ করেছে ২০২২-এর বিধানসভার ভোটে বিজেপির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেন অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি। ওদিকে, ত্রিপুরা ট্রাইবাল এরিয়াজ অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের সাম্প্রতিক নির্বাচনে দেখা গিয়েছে যে বিজেপিকে অনেকটা পিছনে ফেলে ক্ষয়িষ্ণু বামেদের প্রতিস্থাপিত করেছে নতুন তৈরি হওয়া প্রদ্যোৎকিশোর মাণিক্য দেববর্মনের টিআইপিআরএ। গত দশকে কীভাবে আম আদমি পার্টি প্রভাব বিস্তার করেছে দিল্লিতে, সেটাও তো আমরা দেখেছি। গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়মেই শূন্যস্থান পূর্ণ হয়ে যায় দ্রুত।

তাই কংগ্রেস-মুক্ত ভারত মানেই বিরোধী-মুক্ত দেশ নয়। আর বিরোধী দল হিসেবে রাজ্যে রাজ্যে স্থানীয়ভাবে শক্তিশালী দলগুলো কিন্তু কংগ্রেসের চাইতে প্রবলতর প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে পারে। কারণ কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তুলনায় সংশ্লিষ্ট রাজ্যে এই দলগুলোর ঝুঁকি বা বাজি অনেক বেশি। মহারাষ্ট্র কিংবা পশ্চিমবঙ্গের শেষ বিধানসভা ভোটের অভিজ্ঞতা অন্তত সেটাই বলে। আবার মধ্যপ্রদেশ বা গোয়ায় বিজেপির ক্ষমতা দখলের সঙ্গে মহারাষ্ট্রের গত বিধানসভা নির্বাচনের পরে মূলত বিজেপি-শিবসেনার টক্করের তুলনা করলে বোঝা যাবে যে ক্ষেত্রবিশেষে এই আঞ্চলিকভাবে শক্তিশালী দলগুলি বিজেপির মতো দলকেও কী কঠিন চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে!

কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে প্রায় ধারাবাহিকভাবে কীভাবে কংগ্রেসের প্রভাবের সংকোচন হয়ে চলেছে সাম্প্রতিক অতীতে, একের পর এক রাজ্যে, তা সত্যিই বিস্ময়কর। পশ্চিমবঙ্গে বামেদের দ্রুত ক্ষমতা হারানোর সঙ্গে বোধকরি এর তুলনা চলতে পারে। কীভাবে দিল্লি বা বিহারে কংগ্রেস নিজেদের অস্তিত্বকে সংকুচিত করে ফেলেছে, সে নিয়ে চলতে পারে দীর্ঘ বিশ্লেষণ। নেহরু-গান্ধি পরিবারের ছত্রছায়া থেকে বেরোতে না পারার জন্য বিজেপির মতো দল প্রতিনিয়ত শ্লেষে বিদ্ধ করলেও নেতৃত্বের রাশ এই পরিবারের বাইরে গেলে কংগ্রেসের বাঁধন কতটা অটুট থাকবে সে নিয়ে এমনকি কংগ্রেসেরই অনেকে সন্দিহান। তবু যতদিন প্রিয়াঙ্কা গান্ধি সক্রিয় রাজনীতিতে আসেননি কংগ্রেসের হাতে একটা ম্যাজিক কার্ড লুকোনো ছিল। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস এই তাসখানাও উজাড় করে দিয়েছে। তবু, এখনও কংগ্রেস ক্ষমতায় রয়েছে রাজস্থান, পঞ্জাব, ছত্তিশগড়ে। এ ছাড়াও মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক, গুজরাট কিংবা মহারাষ্ট্রে এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী তারা এবং দীর্ঘ শাসনের উত্তরাধিকার হিসেবে কংগ্রেসের কিছু সমর্থন-ভিত্তি এখনও রয়েছে দেশের প্রায় যে কোনও প্রান্তে।

কংগ্রেসের দুর্বলতা কোথায়, কীভাবে তারা নিজেদের সংগঠন সামলে উঠতে পারে, কিংবা আদৌ পারে কি না, সে নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে টিভিতে, সংবাদপত্রে। বিভিন্ন রাজ্যের ক্ষেত্রে স্ট্র‌্যাটেজি নিশ্চয়ই এক হতে পারে না। তবে কিনা শাসক এবং প্রধান বিরোধী, এই দুইয়ে মধ্যে থাকার লড়াইটা একেবারেই রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব। তাদের অস্তিত্বের লড়াই। সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাপনের লড়াইয়ে সঙ্গে এর সম্পর্ক কম। সাধারণ মানুষ ঠিক খুঁজে নেয় শাসককে এবং উপযুক্ত কোনও বিরোধী দলকেও।

(লেখক ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের রাশিবিজ্ঞানের অধ্যাপক)