জাতীয় স্তরে মমতার ‘খেলা হবে’ নিয়ে জটিল প্রশ্ন থাকছে অনেক

436

পুলকেশ ঘোষ

এমনিতে একুশে মানেই রক্তাক্ত বিপ্লব। একুশে মানেই জয়। রক্তে রাঙা একুশে যেমন শহিদ স্মরণের দিন, তেমনই রক্তঋণ শোধ করার দিন। শাসকের বিরুদ্ধে স্পর্ধায় উন্নত শিরে সতর্কতার বাণী। আন্দোলনের শপথগ্রহণের দিন। একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের দিন। এপার বাংলায় একুশে জুলাইকে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শহিদ স্মরণের দিনটিকে তাঁর নতুন পদক্ষেপের দিন হিসাবেই বরাবর পালন করে থাকেন।  এবারও একুশে জুলাই সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপটে মমতা তাঁর দলকে নতুন আঙ্গিকে মাঠে নামাচ্ছেন। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, এবারের একুশে মমতার জীবনে অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট হিসাবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

- Advertisement -

১৯৯৩ সালের একুশে জুলাই তৃণমূল ছিল না।  প্রদেশ যুব কংগ্রেসের সভানেত্রী হয়ে মমতা শাখা সংগঠনকেই চাঙ্গা করার কাজে হাত দিয়েছিলেন। মাঠঘাটে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা থেকে খুঁজে নিচ্ছিলেন এমন ইস্যু, যা মানুষের উপলব্ধিকে ছুঁয়ে যাবে। আর সেভাবেই তিনি ভোটার পরিচয়পত্রের ইস্যুতে মহাকরণ অভিযানের ডাক দিয়েছিলেন। এক যুবনেত্রীর ডাকে এভাবে উত্তাল জনসমুদ্র মহাকরণের দিকে এগোবে তা বামফ্রন্ট বা পুলিশবাহিনী ভাবতেই পারেনি। তাই বেগতিক থেকে অপ্রস্তুত  পুলিশবাহিনী গুলি চালায়। আর তাতেই অকালে ঝরে যায় ১৩টি প্রাণ।

এত বড় ঘটনার পর যথারীতি সেই দিনটিকে স্মরণ করার দায়টুকুও বইতে পারেনি কংগ্রেস। বরং তৃণমূল গড়ার পরেও মমতাই এই দিনটির রাজনৈতিক তাৎপর্যকে কাজে লাগিয়েছেন। জাতীয় রাজনীতিতে মমতা নতুন নন। কাগজে-কলমে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস জন্মলগ্ন থেকেই সর্বভারতীয় কাঠামো তৈরি করেই রেখেছিল। এবার সেই কাঠামোর প্রাণপ্রতিষ্ঠার পালা।  একদিকে যেমন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রকের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রক সামলেছেন, তেমনি ৩৪ বছরের বাম শাসনকে টেনে নামিয়ে পরপর দুটো  মেয়াদ মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ার সামলেছেন।  কিন্তু প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়াকে পুরোপুরি উলটো মুখে বইয়ে দিয়ে মমতা বিপুল জয় নিয়ে তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফিরেছেন। নিজে হেরেছেন। কিন্তু সেই হার তাঁর ইমেজে একটু আঁচড়ও ফেলতে পারেনি।

বিজেপির মতো শক্তিশালী ও সংগঠিত প্রতিপক্ষ যেভাবে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দিল্লির মসনদে ফিরেছে, তাতে কংগ্রেস সহ সব বিরোধী দলের নেতাই কার্যত হাত তুলে দিয়েছেন। বিরোধী শিবির ছিন্নভিন্ন। সবাই ধরে নিয়েছিলেন, এবার মমতার দল ভেঙে পড়বে তাসের ঘরের মতো। পিকে বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নরেন্দ্র মোদি-অমিত শা দুটি স্লোগান তৈরি করেছিলেন- ইস বার দোশো পার। সারা ভারত তা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল। আর সেইজন্যই বিবিসি থেকে শুরু করে অধিকাংশ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যম বিধানসভা নির্বাচনের কয়েক মাস আগে থেকেই ঘাঁটি গেড়েছিল কলকাতার নামীদামি হোটেলে। কিন্তু সবাইকে বোকা বানিয়ে মমতা একদিকে হুইলচেয়ারে চেপে একাই রাজ্যটা ফালাফালা করে ঘুরেছেন। সেইসঙ্গে প্রতিটি জাত ও জাতির অঙ্ক কষে তাঁদের জন্য আলাদা প্রকল্প ঘোষণা করে বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁদের তিনি কতটা গুরুত্ব দেন। চাষি ও মহিলাদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি টাকা ঢোকানোর ঘোষণা করে তাঁদের মন জয় করে নিয়েছেন তিনি।  ছাত্রদের ক্রেডিট কার্ডে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করে স্বস্তি এনে দিয়েছেন অভিভাবকদের। সবদিকের মন জুগিয়ে যেভাবে মমতা তাঁর আত্মপ্রত্যয় বেশ কয়েকগুণ বাড়িয়ে নিয়েছেন তাতে তিনি এবার বিজেপি বিরোধী শক্তির একমাত্র নেত্রী হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন।

এই মুহূর্তে সব বিজেপি বিরোধী দলই ঘর সামলাতে জেরবার। নিজস্ব রাজ্যের বাইরে স্টেপআউট করে খেলার মতো অবস্থায় কোনও বিরোধী নেতাই নেই। সাধারণভাবে এই বিরোধী নেতাদের অধিকাংশই এতদিন মমতাকে পছন্দ করেননি। নিজেদের আলোচনায় তাঁকে নিয়ে হাসিঠাট্টাও করতে ছাড়েননি। আবার বিজেপিকে ২০২৪ সালে পরাস্ত করতে পারলে মমতাকে লাল কার্পেট বিছিয়ে হাত ধরে নিয়ে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসাবেন, এতটা কল্পনাও করতে পারছে না রাজনৈতিক মহল। তারা মনে করছে, এ যেন শত্রুকে বাঘ মারতে পাঠানো হচ্ছে। হয় বাঘ মরবে, নয় শত্রু।

মমতা এই প্রেক্ষাপটে ভালো জায়গায়। তাঁর রাজ্যে এখন স্থিতিশীল সরকার। এই পরিস্থিতিতে তিনি সর্বভারতীয় রাজনীতিতে সময় দিলেও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রবীণ মন্ত্রীদের পরামর্শদাতার ভূমিকায় রেখে রাজ্যটা কৃতিত্বের সঙ্গে সামলে নেবেন। সর্বভারতীয় সম্পাদক হিসেবে অভিষেক তাঁর প্রথম সাংবাদিক বৈঠকেই বলেছিলেন, অন্যান্য রাজ্যে আমরা শুধু নাম কা ওয়াস্তে প্রার্থী দিতে বা ভোট কাটতে যাচ্ছি না। যাচ্ছি জিততে।

প্রশ্ন থাকছে, তৃণমূলকে সর্বভারতীয় পার্টি হিসেবে দাঁড় করানো এখন কতটা সম্ভব? ত্রিপুরা ছাড়া আর কোনও জায়গায় কি মমতার নামে আবেগ সেভাবে কাজ করবে? তবে বিভিন্ন রাজ্যে মমতার নজর আরও কেন্দ্রীভূত হবে একুশে থেকেই।  এদিনের ভার্চুয়াল সমাবেশে মমতার ভাষণ বড় পর্দায় দেখানো হবে  গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ, অসম, ত্রিপুরা, দিল্লি, তামিলনাডু ও মহারাষ্ট্রে। যা শুনছি, তাতে ভারতের নানা রাজ্যের ১১০টি জেলায় সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের অফিস তৈরি। বিজেপির নাকের ডগায় বসে তাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে বেছে নেওয়া হয়েছে নরেন্দ্র মোদির কেন্দ্র বারাণসীকে, অমিত শার কেন্দ্র গান্ধিনগরকে।

বিধানসভা নির্বাচনের সময়ে খেলা হবে গানটি রাজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে ভারতের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। আমার এক সহকর্মী দিল্লিতে এ রাজ্যের বাসিন্দা হিসাবে পরিচয় দিতে তাঁকে শুনতে হয়েছে, ও বঙ্গাল সে আয়ে হ্যায়। খেলা হবে? জবাবে সহকর্মীটি বলেছিলেন, খেল তো শুরু হুয়া, আভি দেখতে রহিয়ে..।

জাতীয় স্তরে খেলা হবে সফল হবে কতটা? প্রশ্ন কিন্তু থাকছে অনেক।
মমতাকে নেত্রী মানা ছাড়া বিরোধীদের গত্যন্তর নেই। কিন্তু মমতার হাতে নানা উপায় আছে। ২৬ জুলাই দিল্লি যাচ্ছেন মমতা। ১৮টি বিরোধী দলের নেতার সঙ্গে তাঁর কথা হতে পারে। কিন্তু এর মধ্যে অনেক অঙ্ক রয়েছে। সবাই মিলে জোট গড়লে, সেইসব দলকেও এ রাজ্যে আসন ছাড়তে হবে মমতাকে। তামিলনাডুতে দেওয়াল লিখনে আম্মা মমতার কথা লিখলেই হবে না, তার বদলে এ রাজ্যে এআইডিএমকে বা ডিএমকে-র মতো দলকে কি তৃণমূলের পক্ষে আসন ছাড়া সম্ভব? সোনিয়া গান্ধির ইচ্ছায় মমতার সঙ্গে কংগ্রেসের জোট হতেই পারে। কিন্তু মালদা, মুর্শিদাবাদ সহ অনেক জেলায় তাদের আসন ছাড়তে হবে। জোটের জট ছাড়তে সময় লাগবে। এই সূত্রপাত। এবার জাতীয় স্তরে কেমনতরো খেলা হবে সেটাই দেখার।

আরও একটা কথা। মমতা যেভাবে কেন্দ্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে চলে যাচ্ছেন, তাতে বাংলার মানুষের ক্ষতিই হবে না তো? ইতিমধ্যেই রাজ্যের অনেক প্রকল্পে কেন্দ্র টাকা আটকে রেখেছে। রাজ্য টাকা পাচ্ছে না। পাশের ওডিশা সরকার কিন্তু কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রেখে নিজেদের প্রাপ্য টাকা নিয়ে চলে যাচ্ছে। নবীনের নীতি পরিষ্কার। কেন্দ্রকে অকারণ তোপ দাগব না, রাজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকব বেশি। তাতে দেখা যাচ্ছে, ওডিশারই লাভ। তাদের সরকার চলছে স্বস্তিতে। বড় কোনও বিতর্ক ছাড়াই। মমতা কেন্দ্রে নজর দিলে, বিজেপি আরও করে ঝাঁপিয়ে পড়বে বাংলায়। মমতা ও তাঁর সঙ্গীদের এ সবও মাথায় রাখতে হবে।