এক টুকরো কাপড় এখনও ভরসা চা বলয়ে

কৌশিক দাস, ক্রান্তি : প্যাডম্যান অক্ষয় কুমারকে চেনে না, উঠতি বয়সের এমন কাউকে ডুয়ার্সের প্রত্যন্ত এলাকার গ্রাম বা চা বাগানেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু যে স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে সচেতন করতে এই সিনেমা, ডুয়ার্সের বহু পরিবারের মেয়েরা এখনও সেই স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবহার জানেন না। টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে অনেকে জানলেও চড়া দামের কারণে তা কিনতে পারেন না। অনেকে আবার ন্যাপকিন কিনতে লজ্জাবোধ করেন।

দেখা গিয়েছে, ওষুধের দোকানে স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনার সময় অনেক মহিলা লজ্জা পান। স্যানিটারি ন্যাপকিন এমনভাবে প্যাকেটে মুড়ে নিয়ে যাওয়া হয় যেন কোনও নিষিদ্ধ বস্তু নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ডুয়ার্সের লাটাগুড়ি, ক্রান্তি, রাজাডাঙ্গা, চ্যাংমারি, চাপাডাঙ্গার চা বাগান অধ্যুষিত এবং প্রত্যন্ত এলাকার নানা জায়গা ঘুরে জানা গিয়েছে, মাসের ওই কয়েকটা দিন আজও এক টুকরো কাপড়ই তাঁদের ভরসা। মা-কাকিমা-ঠাকুমাদের আমল থেকে ঋতুস্রাবে ছেঁড়া কাপড় ব্যবহার করে আসার অভ্যাসও এর জন্য দায়ী। মহিলারা যাতে বাধ্যতামূলকভাবে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করেন তাঁর জন্য সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে প্রচার না হওয়ায় তিমিরেই রয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। অথচ এই অভ্যাস বজায় থাকলে বড়সড়ো বিপদের সম্ভাবনা আছে, এমনই বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

- Advertisement -

ক্রান্তির এক ওষুধ ব্যবসায়ী বলেন, একটু ভালো কোম্পানির ন্যাপকিনের দাম ৫০-৭০ টাকার মধ্যে। অনেক মহিলাই কম দামের ন্যাপকিন খোঁজেন। তবে গ্রামাঞ্চলের মহিলাদের স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবহার অনেকটাই কম। রাজাডাঙ্গার আনন্দপুর চা বাগানের এক মহিলার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বাগানে শ্রমিকের কাজ করে সারাদিনে যা উপার্জন তা দিয়ে দুবেলা খাবারই ঠিকমতো জোগাড় করতে অবস্থা নাজেহাল হয়ে যায়। ঋতুকালীন সময়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার সেখানে বিলাসিতা। চা বাগানে ঘুরে দেখা গিয়েছে, বহু বাড়িতেই তিন-চারজন করে কিশোরী রয়েছে। সেই হিসেবে মাসিক উপার্জনের একটা বড় অংশই স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতেই খরচ হয়ে যাবে। তাই স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করার চল নেই বললেই চলে। দশম শ্রেণির সুনেতা ওরাওঁ বলে, টেলিভিশনের বিজ্ঞাপনে স্যানিটারি ন্যাপকিনের নাম শুনলেও ব্যবহার কীভাবে করতে হয় তা জানা নেই। তবে গ্রামাঞ্চলের মেয়েদের ঋতুকালীন সময়ে স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবহার সম্পর্কে ধারণা না থাকার বিষয়ে সচেতনতার অভাবই অনেকটা দাযী।

মাল ব্লকের বিভিন্ন চা বাগান এলাকা বা গ্রামাঞ্চলে সরকারি ও বেসরকারিভাবে ঋতুকালীন সময়ে স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সেভাবে প্রচার হয় না বললেই চলে। এমনকি প্রতিটি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভেন্ডিং মেশিনও নেই। লাটাগুড়ি উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ে ভেন্ডিং মেশিন দীর্ঘদিন ধরেই নষ্ট হয়ে রয়েছে। ঋতুকালীন সময়ে এজন্য সমস্যায় পড়তে হয় মেয়েদের। লাটাগুড়ি উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষিকা অর্চিতা সিহি বলেন, ওই দিনগুলিতে বিদ্যালয়ে ছাত্রীদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে প্রায় ৩০ শতাংশ কম থাকে। ঋতুচক্র চলাকালীন বিদ্যালয়ে আসতে ছাত্রীরা শারীরিকভাবে স্বচ্ছন্দবোধ করে না। এর পিছনে মূল কারণ সচেতনতার অভাব। আমাদের বিদ্যালয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিনের ব্যবহার নিয়ে একাধিক কর্মশালা হলেও অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। তিনি আরও বলেন, আমাদের সমাজ এখনও মেয়েদের ঋতুচক্রর বিষয়টি বাঁকা চোখে দেখে। এটা যে একটা অত্যন্ত স্বাভাবিক শারীরিক পরিবর্তন সেটা বুঝতে হবে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি ওষুধের দোকানে স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনার সময়ও মহিলারা দোকান ফাঁকা হওয়ার অপেক্ষাতেই যেন থাকেন।

গ্রিন ভ্যালি জলপাইগুড়ি নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্ণধার প্রশান্ত সরকার বলেন, মাস কয়েক আগে লাটাগুড়ি উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসে আবাসিক ছাত্রীদের নিয়ে একটি সচেতনতার শিবিরের আয়োজন করেছিলাম এবং সেখানে ছাত্রীদের স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ করা হয়েছিল। চড়া দামের কারণে গ্রামাঞ্চলের বহু পরিবারের মেয়েদের সামর্থ্য হয় না ঋতুকালীন সময়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করার। সরকারি উদ্যোগে বাজারের থেকে কম দামে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে ন্যাপকিন সরবরাহ করলে এই চিত্র বদলাতে পারে। তবে আগামীতে আমরা চা বলয়ে এই নিয়ে আরও জোরদার প্রচার চালাব।

মাল সুপারস্পেশালিটি হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডা: প্রদীপ কালসার বলেন, স্যানিটারি ন্যাপকিন বিজ্ঞানসম্মতভাবে মেনষ্ট্রুয়াল ফ্লুইড শুষে নিয়ে জায়গাটিকে পরিচ্ছন্ন রাখে। ছেঁড়া কাপড় কিন্তু সেই সুরক্ষা দিতে পারে না। ফলে সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। আগেকার দিনে অনেকেই ছেঁড়া কাপড় রোদে শুকিয়ে বা জীবাণুনাশক ব্যবহার করে তবে ব্যবহার করতেন। কিন্তু সচেতনতার অভাবে এখন অনেকেই সেটা করে না। তবে সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে রোগীভর্তির সংখ্যা সেভাবে দেখা না গেলেও আউটডোরে প্রচুর রোগী আসেন। আমরা তাঁদের ঋতুচক্র চলাকালীন স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করার পরামর্শ দিই। কিন্তু তাতে খুব একটা কাজ হয় না। মাল ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক প্রিয়াঙ্কু জানা বলেন, আশাকর্মীদের মাধ্যমে অঙ্গনওয়ারি কেন্দ্র এবং বিভিন্ন স্কুলে এনিয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিয়মিত করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন স্কুলে ভেন্ডিং মেশিন রয়েছে। সেখানে স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির তৈরি স্যানিটারি ন্যাপকিন খুব স্বল্পমূল্যে পাওয়া যায়। গ্রামাঞ্চল এবং চা বাগানে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করার বিষয়ে আরও প্রচার করার চেষ্টা চলছে।