মূলস্রোতের ইতিহাসে উপেক্ষিত দলিত জগজীবন

556

১৯৪২-এর আন্দোলনের পুরোভাগে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের অন্যতম বাবু জগজীবন রাম। চালককে নামিয়ে দিয়ে বিপ্লবীরা রেলগাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন পাটনায়, ইঞ্জিনে ছিলেন জগজীবন রাম। ৪২ নিয়ে মূলস্রোতের ইতিহাসে তিনি উপেক্ষিতই রয়ে গিয়েছেন। সাড়ে তিন বছরের কারাবাস সত্ত্বেও। আজ তাঁর তিরোধান দিবস। লিখেছেন দেবপ্রসাদ রায়। 

অগাস্ট বিপ্লব উদযাপন কমিটির উদ্যোগে আমরা ২০১৫-১৬-তে বর্ষব্যাপী অনুষ্ঠান করেছিলাম। বাংলার শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কবি সুকান্ত একসময় লিখেছিলেন –

- Advertisement -

ওরা বীর, ওরা আকাশে জাগাত ঝড়।

ওদের কাহিনী বিদেশীর খুনে

গুলি, বন্দুক, বোমার আগুনে

আজও রোমাঞ্চকর।

সেই শহিদদের স্মরণে একবছরের কর্মসূচি। শুরু হয়েছিল কলকাতা ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে। শেষ করেছিলাম মহাজাতি সদনে। মাঝে মাতঙ্গিনী হাজরাকে তমলুকে, যতীন দাসকে হাজরা পার্কে, কানাইলাল দত্তকে চন্দননগরে, বিনয-বাদল-দীনেশকে খিদিরপুরে, সূর্য সেনকে খড়দাতে, ভবানীপ্রসাদ ভট্টাচার্যকে দার্জিলিংয়ে গোপীনাথ সাহাকে শ্রীরামপুরে, মঙ্গল পান্ডেকে ব্যারাকপুরে, বসন্ত বিশ্বাসকে কৃষ্ণনগরে, বীরেন দত্তগুপ্তকে জলপাইগুড়িতে, আর সত্যেন বোসকে মেদিনীপুরে প্রণাম জানিয়েছি। সমাপ্তি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে মীরা কুমারকে আনতে চাইলাম। একসঙ্গে কিছুদিন এআইসিসিতে কাজ করেছি। অবশ্যই ওঁর অধীনে। উনি সাধারণ সম্পাদক, আমি ওঁর অধীনে যুগ্মসচিব। কিন্তু কখনও নিজেকে বস ভাবতেন না। বরং বেশি দায়িত্ব আমাকে দিয়ে বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করতেন, আমার গুরুত্ব কোনও অংশে কম নয়। তাই বিশ্বাস ছিল, উনি নিশ্চযই আসবেন। কিন্তু পুরো কর্মসূচিটি শুনে আর ওঁকে আমন্ত্রণ জানানোয় মীরাজি এতটা আবেগাপ্লুত হযে পড়বেন ভাবিনি। উনি বললেন, তোমার ব্যস্ততা নেই তো? আমার তাড়া নেই জানানোয়, উনি উঠে গিয়ে ভিতরের ঘর থেকে হলদে হয়ে যাওয়া একটি হিন্দি বই নিয়ে এসে তার খানিকটা অংশ পড়ে শোনাতে লাগলেন, ওঁর পিতার কথা।

১৯৪২-এর আন্দোলনের পুরোভাগে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের অন্যতম বাবু জগজীবন রাম। লোকসভার প্রাক্তন অধ্যক্ষ মীরা কুমারের বাবা। ৪২-এর আন্দোলনে তিনি নিজেই একটি অধ্যায়। চালককে নামিয়ে দিযে বিপ্লবীরা রেলগাড়ি নিযে গিয়েছিলেন পাটনায়, ইঞ্জিনে ছিলেন বাবুজি। কয়লার ধোঁয়ায় ও কয়েকদিন স্নান না করে থাকায় ধূলিধূসরিত চেহারায় যখন বাড়ি পৌঁছেছিলেন, তখন মীরাজির মা-ও প্রথম দর্শনে তাঁকে চিনতে পারেননি। যদিও ৪২ নিযে মূলস্রোতের ইতিহাসে তিনি উপেক্ষিতই রয়ে গিয়েছেন। সাড়ে তিন বছরের কারাবাস সত্ত্বেও। সম্প্রতি রামচন্দ্র গুহর গান্ধি পড়েছি। আম্বেদকার সাহেবের অল ইন্ডিয়া ডিপ্রেসড ফেডারেশন যখন ১৯৪৬-এর নির্বাচনে মাত্র দুটি আসন পেয়ে বিধ্বস্ত, বাবুজি তখন কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে, বিশেষত গান্ধিজির সঙ্গে পত্রালাপ করে আম্বেদকার সাহেবকে জাতীয় রাজনীতিতে পুনরায় প্রাসঙ্গিক হযে উঠতে সাহায্য করেছিলেন। পরে বাংলা বিভাজিত হওয়ার ফলে তিনি যখন গণপরিষদের সদস্যপদ হারান, সর্দার প্যাটেলের অনুরোধে বম্বে প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী বি জি খেড় একজন কংগ্রেস সদস্যকে পদত্যাগ করিয়ে আম্বেদকার সাহেবকে গণপরিষদে পাঠানোয় উনি আইনমন্ত্রী ও গণপরিষদের ড্রাফটিং গ্রুপের চেয়ারম্যান নিয়োজিত হন। ব্রিটিশরা ১৯০৯ সালে সেপারেট ইলেক্টোরেট করে দ্বিজাতি তত্ত্বের বীজ পুঁতে দিয়েছিল। আর ১৯৩২ সালে আম্বেদকার সাহেবের দাবি মেনে যখন দলিতদের জন্য সেপারেট ইলেক্টোরেটের সিদ্ধান্ত ম্যাকডোনাল্ড ঘোষণা করলেন, গান্ধিজি পুনার জেলে অনশন করে ব্রিটিশের সেদিনের চক্রান্ত ব্যর্থ করেছিলেন। পরবর্তীতে ক্যাবিনেট মিশনের সামনে ডিপ্রেসড ক্লাসেস ফেডারেশনের নেতা হিসেবে আম্বেদকার সাহেব আবার যখন সেপারেট ইলেক্টোরেট দাবি উত্থাপন করেছেন, তখন রাধাকান্ত দাস ও পৃথ্বী সিং আজাদকে সঙ্গে নিযে ডিপ্রেসড ক্লাসেস লিগের পক্ষ থেকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ক্যাবিনেট মিশনকে বাবু জগজীবন রাম বলেছিলেন, ‘আমরা দলিত, কিন্তু আমরা ততটাই হিন্দু, যতটা উচ্চবর্ণের মানুষরা। কিন্তু শতাব্দীর পর শতাব্দী উচ্চবর্ণের মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনা থেকে নিরাপত্তা দিতে দলিতদের জন্য সংবিধানে স্পষ্ট ভাষায় সংরক্ষণের কথা বলতে হবে। আমরা জিন্নার মতো আর একটা দেশভাগ চাই না। আমরা শোষণমুক্ত ভারত চাই।’

জিন্নাকে মৌলানা আজাদ ঠেকাতে পারেননি, যদিও প্রচেষ্টার অভাব ছিল না। কিন্তু দলিতদের ধর্মান্তরিত করে হিন্দুদের সঙ্গে সামাজিক বিভাজনের যে প্রয়াস, তাঁকে অসার প্রমাণ করতে বাবুজি দৃঢ়তার সঙ্গে বোঝাতে পেরেছিলেন, ধর্ম বদলালেও জাত বদলায় না। অত্যাচার তাঁকেও কম সহ্য করতে হয়নি। টাউন স্কুলে পড়ার সময় যখন কেবল তাঁর জন্য আলাদা জলের কুঁজো রাখার ব্যবস্থা হয়, তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানানোয় শেষ পর্যন্ত স্কুল কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও তাঁকে বারবার নীচু জাতে জন্মানোর খেসারত দিতে হয়েছে। যদিও তাঁর মেধা সবসময় তাঁকে আলাদা সম্মান আদায় করতে সাহায্য করেছে। দলিত কোটায কখনও স্কলারশিপ নেননি, কিন্তু কোনও দিন স্কলারশিপহীন হয়ে তাঁকে পড়াশোনা চালাতে হয়নি। প্রতিটি পরীক্ষায তাঁর উল্লেখযোগ্য সাফল্য তাঁকে এই সুবিধার ভাগীদার হতে সাহায্য করেছে। তরুণতম মন্ত্রী হিসেবে ১৯৪৬ সালের নেহরু মন্ত্রীসভায় স্থান পেয়েছিলেন। শ্রমিক আন্দোলনে আগ্রহ ও সাফল্য তাঁকে শ্রমমন্ত্রক পেতে সাহায্য করেছিল। ১৯২৮ সালে কলকাতায় বিদ্যাসাগর কলেজে পড়াকালীন এই মহানগরীতেও খেটেখাওয়া মানুষের সংগঠন গড়ে তুলে তদানীন্তন কংগ্রেস নেতৃত্বের সম্ভ্রম আদায় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। মানুষটি কেন এত স্বল্পালোচিত, আমি জানি না। কিন্তু দেশের যে কটি সাফল্য ইন্দিরাজিকে অকল্পনীয উচ্চতায় তুলে দিয়েছে, তার পিছনে নীরবে যে মানুষটি শক্তি জুগিয়ে গিছেন, তাঁর নাম বাবু জগজীবন রাম।

১৯৬৭ সালে প্রধানমন্ত্রী হযে ইন্দিরাজি চেয়েছিলেন, আমেরিকার কাছে মাথা নত করে পিএল ৪৮০-র শর্ত মেনে গম তিনি নেবেন না। এই সংকল্পকে বাস্তবায়িত করতে তৎকালীন খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী বাবু জগজীবন রাম সবুজ বিপ্লবের উদ্যোগ গ্রহণ করে শুধু ইন্দিরাজিকে পিএল ৪৮০ বর্জন করার পথকে প্রশস্ত করে দেননি, তাঁর প্রচেষ্টায় ভারত খাদ্যশস্য রপ্তানি করার মতো উৎপাদন ক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছিল। স্বাধীনতার পর দেশ তিনটি যুদ্ধ দেখেছে। প্রথম ১৯৬২-তে। তারপর ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালে। ৬২-তে পরাজিত হয় ভারত। ৬৫-তে অমীমাংসিত থাকে যুদ্ধ। কিন্তু ৭১-এ শুধু জয় নয়, একটি নতুন দেশের জন্ম হয়। ইন্দিরা গান্ধির অসামান্য সাফল্য আমাদের বলতে উদ্বুদ্ধ করেছিল, এশিযার মুক্তি সূর্য ইন্দিরা গান্ধি যুগ যুগ জিও। দেশ নতুন স্লোগানে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল- বিশ্বে এনেছে নতুন দিন, ইন্দিরা-মুজিব কোসিগিন। সেসময যিনি প্রতিরক্ষা দপ্তর সামলেছিলেন, তিনি বাবু জগজীবন রাম। সীমান্তে সামরিক চৌকিগুলি ব্যক্তিগতভাবে পরিদর্শন করতেন। এরকমই একবার সেনা ও আধাসেনাদের মনোবল বৃদ্ধির উদ্যোগে সীমান্ত ঘুরে বাবুজি জলপাইগুড়িতে এসেছিলেন। কংগ্রেস ভবনে তাঁকে সামনে থেকে দেখার ও শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল। যদিও মঞ্চ থেকে তাঁর ভাষণ ১৯৬৯ সালে বম্বের আজাদ ময়দানে শুনেছিলাম। যখন ইন্দিরাজি ব্যাংক জাতীয়করণ, রাজন্যভাতা বিলোপ ইত্যাদির মাধ্যমে দেশে এক নতুন বিশ্বাসের জন্ম দিচ্ছেন, সেই সময় তিনি অনেক প্রতিষ্ঠিত কংগ্রেস নেতাদের পাশে পাননি। কিন্তু বাবুজি তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন পূর্ণশক্তিতে। ইন্দিরাজির নেচৃত্বে ও বাবুজির সভাপতিত্বে দল লড়েছে ১৯৭১-এ। ৩৫৪টি আসন নিয়ে লোকসভায কংগ্রেস নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হাসিল করেছে জগজীবন রামের সভাপতিত্বেই। দলিতদের অধিকার রক্ষায় সবসময সচেতন থেকেছেন তিনি। গণপরিষদে তাঁরই উদ্যোগে তপশিলি জাতি ও জনজাতির সংরক্ষণের প্রস্তাব সংবিধানে সংযোজিত হয়। যখন যে দায়িত্বে থেকেছেন, নীচু জাতের মানুষের মর্যাদা ও অধিকার রক্ষার প্রচেষ্টা সবসময় তাঁর কাছে অগ্রাধিকার পেয়েছে। রেলমন্ত্রী থাকাকালীন সমস্ত স্টেশনে পানীয় জল বিতরণের কাজে দলিতদের নিযুক্ত করে বর্ণবিভাজিত সমাজে যে বার্তা দিতে চেয়েছেন, তা তাঁর মন্দিরে প্রবেশাধিকারের আন্দোলনের থেকে কোনও অংশে কম ছিল না। দারিদ্র্য তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে দমাতে পারেনি। মাত্র ৬ বছর বযসে বাবাকে হারিয়েছেন, কিন্তু মহীয়সী মা জানতেন, কোনওভাবে তাঁর ছেলের পঠনপাঠন বন্ধ হতে দেওয় যাবে না।

প্রলোভন এসেছে, আমেরিকান চার্চের নানরা বাড়িতে গিযে তাঁর মাকে বলেছেন, ওকে দিয়ে দিন, আমরা ওর দাযিত্ব নিচ্ছি। প্রয়োজনে উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকায় পাঠাব। কিন্তু বাসন্তীদেবী তাঁদের ধন্যবাদ জানিয়ে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আত্মমর্যাদা রক্ষা করেছেন। বোধহয় বাবু জগজীবন রামই একমাত্র রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি কোনওদিন নির্বাচনে পরাজিত হননি এবং তিনবার (১৯৩৭, ১৯৪৬ এবং ১৯৫৭) বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন। মীরাজির অধীনে কিছুদিন কংগ্রেসের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে তাঁর পিতার জীবনের স্বল্পালোকিত দিকগুলি সময়ে সময়ে আমার সামনে উঠে এসেছে। যতদিন দিল্লিতে থেকেছি, ৫ এপ্রিল বাবুজির জন্মদিবস উদযাপনে ও ৬ জুলাই তিরোধান দিবসে ৬ নম্বর কৃষ্ণ মেনন মার্গের সভায় হাজির থেকেছি। ১৯৮৬ সালে তাঁর পরলোকগমনের পর দীর্ঘদিন ওই বাড়িটি বাবু জগজীবন রাম সংগ্রহশালা হিসেবে ব্যবহৃত হত। ২০০৩ সালে বাড়ি ছাড়ার নোটিশ এলে সরকারিভাবে সংগ্রহশালার স্বীকৃতি আদায় করতে ১০৬ জন সাংসদের স্বাক্ষর সংগ্রহ করতে হয়েছিল। এই কাজটায আমি যুক্ত হতে পেরেছিলাম বলে আজও গৌরব বোধ করি। বাবু জগজীবন রামের মূল্যায়ন এখনও ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে হয়নি।

(লেখক রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ)