স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের চূড়ান্ত পরীক্ষা নিয়ে পরস্পর বিরোধী সিদ্ধান্ত, উদ্বেগে পড়ুয়ারা

305

কলকাতা : রাজ্যের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরের চূড়ান্ত সিমেস্টারের পরীক্ষা গ্রহণ নিয়ে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের পরস্পর বিরোধী সিদ্ধান্তে পরীক্ষার্থীরা হতাশ হয়ে পড়ছেন। কয়েকদিন আগেই রাজ্যের শিক্ষা দপ্তর জানিয়ে দিয়েছিল, স্নাতক স্তরে ৮০ শতাংশ নম্বর আগের সিমেস্টারে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পাওয়া সর্বাধিক নম্বর অনুসারে দেওয়া হবে। বাকি ২০ শতাংশ নম্বর দেওয়া হবে অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ণে। বিএ, বিএসসির সঙ্গে বিকমের একটি ফারাক রাখা হয়েছিল। তা ছিল আগের কতগুলি সিমেস্টার থেকে সর্বাধিক নম্বর বাছা হবে তার ওপর। স্নাতকোত্তর স্তরের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ নম্বর স্নাতক স্তরের মতোই আগের সিমেস্টারগুলির প্রাপ্ত সর্বাধিক নম্বরের ওপর ভিত্তি করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। তবে বাকি ২০ নম্বরের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাযিত্ব দেওয়া হয়েছিল সংশ্লিষ্ট ফ্যাকাল্টি কাউন্সিলের ওপর। আগের পরীক্ষায় অকৃতকার্য বা ব্যাকলগ থাকা পরীক্ষার্থীদেরও এভাবে নম্বর দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। রাজ্যের এই নির্দেশিকা দেখে পরীক্ষার্থীরা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন, তাঁদের আর নতুন করে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতির প্রযোজন নেই। কিন্তু আচমকাই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের নির্দেশিকা পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ঘোষণা করেছে, সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরের চূড়ান্ত সিমেস্টারের পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীদের বসতেই হবে। সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে অনলাইন বা অফলাইন বা দুধরনের ব্যবস্থা মিলিয়ে পরীক্ষা পদ্ধতি শেষ করে ফেলতে হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্যের পড়ুয়ারা সমস্যায় পড়েছেন। ইউজিসির তরফে সোমবার জারি হওয়া নির্দেশিকায় পরীক্ষা কোন পদ্ধতিতে হবে, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তপক্ষকে। দিনক্ষণ চূড়ান্ত করার দায়িত্বও তাঁদের। পরীক্ষার্থীরা আশা করেছিলেন, সোমবারের এই নির্দেশিকার পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবারই তাঁদের স্বস্তি দিয়ে রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি এসম্পর্কে বিশদ সিদ্ধান্ত জানাবে। কিন্তু মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলি বা রাজ্যের শিক্ষা দপ্তর এনিয়ে টুঁ শব্দটি না করায় পরীক্ষার্থীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। তাঁরা বলছেন, এপ্রিল মাসে পরীক্ষা হওয়ার কথা থাকলেও লকডাউনের জেরে এমনিতে তা অনেকটা পিছিয়ে গিয়েছে। ফলে আগে নেওয়া প্রস্তুতি ও মানসিকতা সবটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে এমন একটা সময়ে পরীক্ষাগ্রহণের কথা বলা হচ্ছে, যখন রাজ্যে করোনা সংক্রমণ ভয়াবহ গতি নিয়েছে। পড়াশোনার মানসিকতাকে ছাপিয়ে গিয়েছে লকডাউনে গৃহবন্দি থাকার মানসিক অবসাদ ও করোনা আতঙ্ক। বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উচিত আমাদের মানসিক চাপ কাটাতে অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট পরীক্ষা পদ্ধতি ও সূচি ঘোষণা করা।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উপাচার্যদের সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক সুবীরেশ ভট্টাচার্য বলেন, এই মুহূর্তে রাজ্যে করোনা সংক্রমণ যেভাবে বাড়ছে তাতে কীভাবে পরীক্ষা নেওয়া হবে, তা আমরা বুঝতে পারছি না। পরীক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বজায় রেখে পরীক্ষা নেওয়া কীভাবে সম্ভব ভাবতে হবে। শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার তো বলে দিয়ে খালাস। কিন্তু আমাদের কাছে করোনা সংক্রমণ থেকে পড়ুয়াদের জীবন রক্ষা করা সবথেকে বড় দায়িত্ব। কাজেই এটা কতটা বাস্তবসম্মত তা আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে। এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি।

- Advertisement -

পরীক্ষার্থীদের এই হতাশাজনক পরিস্থিতি উঠে এসেছে রাজ্যপাল জগদীপ ধনকরের টুইটেও। তিনি এদিন টুইটে বলেছেন, ছাত্রদের ইশ্যুকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকি। এই মহামারি পরিস্থিতিতে রাজ্যপাল এবং আচার্য হিসেবে আমাকে তাঁদের দুশ্চিন্তা নাড়া দিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে আলোচনার জন্য ১৫ জুলাই বেলা ১১টায় রাজ্যের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য ও সহ উপাচার্যদের নিয়ে একটি ভার্চুয়াল বৈঠক ডেকেছেন তিনি। উপাচার্যদের এদিন একটি চিঠি পাঠিয়ে তিনি বলেছেন, বিভিন্ন সময়ে পড়ুয়ারা আমার কাছে সমস্যা তুলে ধরছে। প্রচারমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে পড়ুয়াদের সমস্যাগুলি দেখতে পাচ্ছি। করোনা পরিস্থিতি ছাত্রসমাজকে অভতপূর্ব চাপে ফেলেছে। তাঁদের দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ আমি অনুভব করতে পারছি।

স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরের ফাইনাল পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের নির্দেশিকা জারি হয়েছে। কিন্তু ২৬ জুন রাজ্য উচ্চ শিক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, করোনার কারণে পরীক্ষা নেওয়া হবে না। ওই নির্দেশিকা মেনে ইনটারনাল অ্যাসেসমেন্টের উপর ভিত্তি করে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে ফলপ্রকাশের প্রস্তুতি শুরু করেছে। বিভিন্ন কলেজ কর্তৃপক্ষ পড়ুয়াদের থেকে অনলাইনে হোম অ্যাসাইনমেন্ট জমা নিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ামক দেবাশিস দত্ত বলেন, পরীক্ষা নিয়ে অবশ্যই ছাত্রছাত্রীরা বিভ্রান্ত। পড়ুয়াদের পাশাপাশি অভিভাবকদের মধ্যে অনেকেই আমাকে ফোন করেছেন। যেহেতু রাজ্যের উচ্চ শিক্ষা দপ্তরের তরফে আমাদের কাছে নির্দেশিকা এসেছে, সেই কারণে রাজ্যের নির্দেশ মেনে ফলপ্রকাশের কাজ করছি। যাতে রাজ্যের নির্দেশমতো ৩১ জুলাইয়ে মধ্যে ফলপ্রকাশ করা যায়। তবে রাজ্য সরকার বিষয়টি দেখছে। ছাত্রছাত্রীদের অধিকাংশ বলছেন, আমাদের জীবন নিয়ে খেলা হচ্ছে। স্পষ্ট করে কেন একটি নির্দেশিকার কথা বলা হচ্ছে না? এখন আবার নতুন করে পরীক্ষা নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। করোনা সংক্রমণ প্রত্যেক দিন নতুন রেকর্ড গড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পরীক্ষা দিতে গিয়ে কেউ সংক্রামিত হলে তার দায়িত্ব কে নেবে?