ত্রিপলের নীচেই রাত কাটে চিত্রশিল্পীর

দীপংকর মিত্র, রায়গঞ্জ : বাড়ির চারিদিকে ঘন জঙ্গল। মাথা গোঁজার মতো রয়েছে একটি ভাঙা ঘর। বৃষ্টির হাত থেকে রেহাই পেতে মাথার ওপরে টাঙানো রয়েছে ত্রিপল। কয়েক বছর হল রান্নাঘর ভেঙে পড়েছে। বাড়িতে নেই শৌচাগার। ফলে চূড়ান্ত অসহায় অবস্থার মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে রায়গঞ্জ শহরের চিত্রশিল্পী উদয় সরকারকে। রায়গঞ্জ শহরের ২১ নম্বর ওয়ার্ডে বাস করেন বছর সাতান্নর উদয় সরকার। আত্মীয়পরিজন কেউ না থাকায় একাকীই চলে তাঁর জীবন। অভিযোগ, ভাঙাচোরা বাড়িতে থাকলেও পুরসভার তরফে তাঁকে সরকারি কোনো প্রকল্পে বাসগৃহ তৈরি করে দেওয়া হয়নি। যদিও পুরসভার দাবি, বাসগৃহের জন্য একাধিকবার তাঁকে কাগজপত্র জমা দিতে বলা হলেও তিনি তা জমা করেননি। ফলে তিনি বঞ্চিতই থেকে গিয়েছেন।

শিল্পীর বাড়ির উলটোদিকে পুরসভার প্রাক্তন ভাইস চেয়ারম্যান ভোলা পালের বাড়ি। এছাড়াও রায়গঞ্জের বিধায়ক মোহিত সেনগুপ্ত সহ একাধিক বিশিষ্টজন বাস করেন তাঁর এলাকায়। অভিজাত এলাকায় থাকলেও তাঁর বাসগৃহটি সংস্কারের অভাবে ভেঙে পড়তে বসেছে। দেয়াল থেকে উঠে গিয়েছে পলেস্তারা। ইটগুলিও নোনা ধরা। ছাদে ফাটল ধরেছে। ফলে বৃষ্টি হলেই ঘরের মধ্যে জল পড়ে। বাধ্য হয়ে বৃষ্টির সময় ত্রিপলের ছাউনির নীচে আশ্রয় নিতে হয় তাঁকে। একজন বিশিষ্ট শিল্পীর বাড়ির এমন করুণ চিত্র দেখে সকলেই হতবাক।

প্রায় ৪ বছর আগে রায়গঞ্জ পুরসভা গীতাঞ্জলি আবাস যোজনায় একটি ঘর তৈরির জন্য ১ লাখ  টাকা অনুমোদন করলেও সেই টাকা এখনও তুলতে পারেননি। ফলে ব্যাংকের অ্যাকাউন্টেই টাকা পড়ে রয়েছে। প্রতিদিন সকালে সেদ্ধ ভাত খেয়ে সাইন বোর্ড লিখতে বেরিয়ে পড়েন তিনি। সারাদিন কাজের শেষে যে টাকা পারিশ্রমিক পান, তা দিয়ে সেদ্ধ ভাতের সংস্থানটুকু হয় তাঁর। তাই পাকাবাড়ি তৈরির কথা ভাবতে পারেন না। বর্তমানে ফ্লেক্সের বাজার রমরমা হওয়ায় সেভাবে কাজ মিলছে না। তাই নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো অবস্থা চলছে তাঁর।

উদয়বাবুর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, ত্রিপলের নীচে খড়ির উনুনে ভাত বসিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার কথা বলতেই উদয়বাবু বলেন, এক বছর আগে কাউন্সিলার মিটিংয়ে ডেকেছিলেন। সেখানে জানতে পারি প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় আমার নামে ঘর বরাদ্দ হয়েছে। এরপর কেউ আর যোগাযোগ করেননি। খুব কষ্টের মধ্যে থাকতে হয়। এই জায়গা ছেড়ে কোথায় যাব। পুরসভা থেকে যদি একটা ঘর তৈরি করে দেওয়া হত, তাহলে বাড়িতে বসেই কাজ করতে পারতাম। বয়স হয়েছে, আর ছুটতে পারি না। রায়গঞ্জ পুরসভার সিআইসি মেম্বার তথা প্রাক্তন উপপুরপ্রধান ভোলা পাল বলেন, উদয়বাবু খুব কষ্টের মধ্যে থাকেন। অবশ্যই তাঁর সরকারি ঘর পাওয়া দরকার। কেন ঘর পাচ্ছেন না বুঝতে পারছি না। তবে অনেকবার তাঁকে বলেছি বাড়ির দলিলপত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজ জেরক্স করে দেওয়ার জন্য। কিন্ত আজ পর্যন্ত তিনি দেননি।

এলাকার সিপিএম কর্মী সন্টু সরকার বলেন, উদয়বাবু একজন নামি শিল্পী। খুব কষ্টের মধ্যে থাকেন। আমরা অনেকবার তাঁর কাছে গিয়েছি। দলীয়ভাবে তাঁকে সাহায্য করতে চাইলে তিনি নিতে অস্বীকার করেছেন। তবে দলের বিভিন্ন কর্মসূচির উপর দেয়াল লিখনের কাজে ওনাকে ডাকলেই আমরা পাই। বিধায়ক তথা প্রাক্তন পুরপ্রধান মোহিত সেনগুপ্ত বলেন, আমি পুরপ্রধান থাকাকালীন সময়ে গীতাঞ্জলি আবাসন প্রকল্পে ১ লাখ টাকা বরাদ্দ করেছিলাম। তাঁর অ্যাকাউন্টে টাকাও ঢুকে যাওয়ার কথা। কিন্তু কেন ঘরের কাজ শুরু করতে পারেননি, তা খোঁজ নিয়ে দেখব।

এলাকার কাউন্সিলার কল্পিতা মজুমদার বলেন, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় উদয়বাবুর নাম তালিকাভুক্ত হওয়ার পর বাড়ির দলিলপত্র সহ প্রযোজনীয় কাগজ ও ছবি জমা দেওয়ার জন্য অনেকবার বলা হয়েছে। কিন্তু তিনি আজ পর্যন্ত কাগজপত্র জমা করেননি। আমরাও চাই, উদয়বাবু ভালোভাবে থাকুন। ওনার যদি ঘরের ব্যবস্থা করে দিতে পারি তবে ভালো লাগবে।