সহযোগী শহর হতে ব্যর্থ বাগডোগরা-মাটিগাড়া 

87

খোকন সাহা, বাগডোগরা : কলকাতা বিমানবন্দরের গণ্ডি ছাড়িয়ে ডান হাতে খানিকটা এগোলেই আজকের নিউটাউন। চোখে পড়বে একের পর এক আকাশচুম্বী অট্টালিকা। চওড়া রাস্তায় হুহু করে ছুটে চলছে গাড়ি। অথচ নয়ের দশকের শুরুতেও ধু-ধু জমি আর ভেড়ি ছাড়া সেখানে বিশেষ কিছুই ছিল না।

এবার চলে আসা যাক শিলিগুড়ি শহর সংলগ্ন মাটিগাড়া, বাগডোগরা, শিবমন্দিরের দিকে। চওড়া ফ্লাইওভার হয়েছে। এশিয়ান হাইওয়ে ২ হয়েছে। কিন্তু সামনের সেই খোলস ছাড়িয়ে অল্প ভেতরে ঢুকলেই পরিকাঠামোর কঙ্কালটা স্পষ্ট হয়ে যাবে। পুরোটাই পঞ্চায়েত এলাকা। পাথরঘাটা, আঠারোখাই এবং লোয়ার ও আপার বাগডোগরা গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে পড়ে এই এলাকাগুলি। রাজারহাট ও ভাঙড় গ্রাম দুটিকে নিয়ে যে কলকাতার পাশেই আরও একটা শহর গড়ে তোলা যায়, নয়ের দশকে সেই পরিকল্পনা নিয়েছিল তৎকালীন রাজ্য সরকার। অথচ শিলিগুড়ির এই এলাকাগুলি নিয়ে পুরসভা গঠনের দাবি উঠলেও কাজ এগোয়নি।

- Advertisement -

স্থানীয় বাসিন্দারাই বলছেন, শিলিগুড়ি শহর সংলগ্ন এই এলাকার চরিত্র আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে। মাটিগাড়া ব্লকের আঠারোখাই এবং পাথরঘাটা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় একের পর এক আকাশচুম্বী ফ্ল্যাট গড়ে উঠছে। চাকচিক্য ও দামের দিক থেকে সেসব রীতিমতো পাল্লা দিচ্ছে খাস শিলিগুড়ি শহরের বহুতলগুলির সঙ্গে। পঞ্চায়েত এলাকার সেসব ফ্ল্যাট বিক্রিও হচ্ছে হুহু করে। কেবল শিলিগুড়ি নয়, সেসব ফ্ল্যাটের ক্রেতারা দার্জিলিং, কালিম্পং, কার্সিয়াং থেকে আসছেন। আসছেন দক্ষিণবঙ্গ বা অসম, মণিপুর অথবা সিকিম থেকে। কিন্তু যে কোনও বড় শহরের সঙ্গে টক্কর দেওয়া সেসব বহুতলগুলির বাসিন্দারা কিন্তু সুষ্ঠু নাগরিক পরিষেবা পাচ্ছেন না। নাগরিক পরিষেবার বলতে বোঝায় পানীয় জল, রাস্তাঘাট, নিকাশি ব্যবস্থা, বর্জ্য সংগ্রহের মতো বিষয়গুলি। কিন্তু নতুন নতুন গড়ে ওঠা সেসব বহুতলগুলির বাসিন্দাদের অভিযোগ, সেখানে নিয়মিত নিকাশিনালা সাফাই করা হয় না। স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েতের তরফে বর্জ্য  নিয়ে ডাম্পিং গ্রাউন্ডে ফেলার কোনও ব্যবস্থা করা হয়নি। জল সরবরাহের কোনও সুবন্দোবস্ত নেই। বাধ্য হয়ে ফ্ল্যাটগুলির আবাসিকরাই বোরিং করে জলের ব্যবস্থা করে নেন। রাস্তাঘাটের অবস্থাও তথৈবচ। কদমতলার (ডিগলিজোত) এরকমই একটি ফ্ল্যাটের আবাসিক জেপি দেওয়ান বলেন, আমাদের এখানে নিজস্ব উদ্যোগে বোরিং করে জলের ব্যবস্থা করে নিয়েছি। দৈনন্দিন আর্বজনা ফ্ল্যাট চত্বরে বালতি করে জমা করে রাখি। আমরাই ফ্ল্যাটের সোসাইটির পক্ষ থেকে লোক রেখেছি। তিনি আবর্জনা নিয়ে যান। কোথায় ফেলেন বলতে পারব না। স্থানীয় পঞ্চায়েতের তরফ থেকে কোনওরকম পরিষেবাই আমরা পাই না।

পাথরঘাটা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার উত্তরায়ণ, ঘোকলাজোত, মোটাজোত, বারোঘরিয়া, ত্রিপালিজোত, পাসকেলগুড়ি, মীরজাংলা, নিউচামটা, বান্দ্রিজোত, হিমাঞ্চল বিহার, আঠারোখাই গ্রাম পঞ্চায়েতের কদমতলা (ডিগলিজোত), রবীন্দ্র সরণি, বিবেকানন্দপল্লি, সারদাপল্লি, সূর্য সেন পল্লি, ইউনিভার্সিটি অ্যাভিনিউ, রামকৃষ্ণ সরণির মতো এলাকাগুলি কয়েক বছরে বড় বড় ফ্ল্যাটে ভরে গিয়েছে। এইসব ফ্ল্যাটের ক্রেতাদের অধিকাংশই শিক্ষক, অধ্যাপক, চিকিৎসক, ব্যবসায়ীদের মতো উচ্চমধ্যবিত্ত। এমনই একটি বহুতলের বাসিন্দা, পেশায় চিকিৎসক এসকে মুখোপাধ্যায় বলেন, আমাদের কাছ থেকে সম্পত্তি কর এবং অন্যান্য বাবদ যে পরিমাণে কর নেওয়া হয় সেই তুলনায় কোনও পরিষেবাই আমরা পাই না। আমরা চাই, এই এলাকা পুরসভায় উন্নীত করা হোক।

মাটিগাড়ায় উত্তরায়ণের বিশাল আবাসনটি গড়ে উঠেছে দীর্ঘদিনই। চাঁদমণি-উত্তরায়ণ ওয়েলফেয়ার সোসাইটির সভাপতি সরবন চৌধুরী বলেন, এখানে গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে কোনও পরিষেবা দেওয়া হয় না। রাস্তা মেরামত, জল, পথবাতি, আর্বজনা ফেলার সমস্ত খরচ সোসাইটিই বহন করে।

পরিষেবা না মেলার ফলে একদিকে যেমন বাসিন্দারা সমস্যায় পড়ছেন, তেমনই সমস্যায় পড়ছে স্থানীয় পঞ্চায়েতও। আঠারোখাই গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রাক্তন প্রধান অভিজিত্ পাল বলেন, আবাসনের বর্জ্য যেখানে-সেখানে ফেলা হচ্ছে। নদী এমনকি রাস্তার পাশেও ফেলে দিচ্ছে। এতে দূষণ বাড়ছে। এখানে সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রকল্প নেই। তাতেই সমস্যা হচ্ছে।

পরিকাঠামোর অভাবের রেশ পড়ছে পরিবেশের ওপরেও। স্থানীয় পরিবেশপ্রেমী বিপ্লব রায় বলেন, একটি পরিবারে প্রতিদিন গড়ে দু কেজি বর্জ্য হয়। এই বর্জ্যগুলি নদীতে ফেললে দূষণ হবে। আবার ক্রমাগত বেহিসেবিভাবে ভূগর্ভস্থ জল তুলে নিলে জলস্তর নেমে যাবে। শহর হলে হয়তো এসব পরিকাঠামো হবে। অবিলম্বে সমস্যাগুলি নিয়ে ভাবা না হলে আগামীদিনে ভয়ানক বিপদ হতে পারে।