মোস্তাক মোরশেদ হোসেন, রাঙ্গালিবাজনা : বাঁশের দাম বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি ডুলি সহ বাঁশ দিয়ে তৈরি অন্যান্য জিনিসপত্রের দাম। তার ওপর, বাঁশের জিনিসপত্রের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে প্লাস্টিকের তৈরি জিনিসপত্র। তবুও পিতৃপুরুষের পেশাকে আঁকড়ে রয়েছেন বাঁশের জিনিসপত্র তৈরির বেশ কিছু কারিগর। তবে ওই কারিগরদের অনেকেই জানান, তাঁদের উত্তরসূরিরা এই পেশায় আসুক সেটা চান না তাঁরা।

এই সময়টা ফসল ঘরে তোলার মরশুম। জমির পাকা ধান কেটে বাড়ি নিয়ে যেতে ব্যস্ত কৃষকরা। ধান রাখার জন্য ব্যবহৃত হয় বাঁশের ডুলি। ডুলি তৈরির জন্য কোচবিহারের মাথাভাঙ্গা মহকুমা থেকে মাদারিহাট-বীরপাড়া ব্লকের পশ্চিম খয়েরবাড়িতে এসে ঘাঁটি গেড়েছেন বাঁশের জিনিসপত্র তৈরির কয়েকজন কারিগর। তাঁরা জানান, প্রতিবছর দুমাস করে তাঁরা খয়েরবাড়িতেই থাকেন। মাথাভাঙ্গা মহকুমার পুঁটিমারি এলাকার বাসিন্দা গৌরাঙ্গ বিশ্বাস বাঁশের জিনিসপত্র তৈরি করেন। গৌরাঙ্গবাবু বলেন, ২৫ বছর ধরে বাঁশের জিনিসপত্র তৈরির কারবারের সঙ্গে জড়িত রয়েছি। তবে লাভের অঙ্ক আগের তুলনায় কমে গিয়েছে। প্রথমত, বাঁশের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। তার ওপর, ঝুড়ি থেকে শুরু করে ডুলি সবকিছুই এখন প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি হয়। ফলে বাঁশের তৈরি জিনিসপত্রের চাহিদা কমেছে। তাই একসময় সারাবছর বাঁশের জিনিসপত্র তৈরি করলেও বর্তমানে মাত্র দুএকমাস বাঁশের জিনিসপত্রের কারবার করি। বছরের বাকি দশমাস দিনমজুরি সহ অন্য কাজ করতে হয়।

বাঁশের জিনিসপত্রের কারিগর নকুল সরকার বলেন, বাঁশের জিনিসপত্রের চেয়ে প্লাস্টিকের জিনিসপত্র টেকে বেশি। তাই অনেকে বাঁশের চেয়ে প্লাস্টিকের জিনিসপত্র কিনতে বেশি আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু ঘটনা হল বাঁশের জিনিসপত্র ব্যবহারে পরিবেশের কোনো ক্ষতি হয় না। অথচ আজকাল শিক্ষিত মানুষরাও বিষয়টি নিয়ে কোনো মাথা ঘামান না। সরকারও আমাদের দিকে নজর দেয়নি। তাই বাধ্য হয়ে আমরা বছরের বেশিরভাগ সময় মূল পেশা থেকে সরে গিয়ে অন্য পেশার মাধ্যমে রুটিরুজির ব্যবস্থা করি। আর এক কারিগর জয়কুমার শর্মা বলেন, আগে ডুলি ছাড়া অন্য কোনো পাত্রে ধান রাখতেন না কেউ। অথচ এখন প্লাস্টিকের ডুলিও বাজারে বেরিয়েছে। ফলে আমাদের রোজগার বন্ধের মুখে। এ সময় সরকার যদি আমাদের পাশে দাঁড়াত বা আর্থিক অনুদান কিংবা ঋণ দিয়ে সহযোগিতা করত তাহলে অনেক সুবিধা হত। পশ্চিম খয়েরবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা অর্জুন ছেত্রী বলেন, খয়েরবাড়ি গ্রামে এসে বছরে দুমাস করে থাকেন ওই কারিগররা। তবে বাঁশের জিনিসপত্র বিক্রির হার এখন আগের চেয়ে অনেক কমে গিয়েছে, কারণ মানুষের পছন্দ পালটাচ্ছে। মানুষ প্লাস্টিকজাত জিনিসের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। এই অবস্থায় ওঁদের সরকারি সহযোগিতা অত্যন্ত প্রয়োজন।  গৌরাঙ্গ বিশ্বাস বলেন, আমাদের পেশার ভবিষ্যৎ অন্ধকার। তাই আমরা চাই না আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এই পেশায় আসুক। আমাদের ছেলেপুলেরা ইতিমধ্যেই অন্য পেশা বেছে নিয়েছে। লোকসানের পেশা আঁকড়ে কেই বা থাকতে চায়।