লকডাউনে সংকটে মালদার ব্যান্ডপার্টির গায়ক-বাদকরা

জসিমুদ্দিন আহম্মদ, মালদা : বিযোড়ি হোক, কিংবা হোক জন্মদিন, অন্নপ্রাশন। যাঁদের তোলা সুরে অনুষ্ঠানবাড়ি হয়ে উঠে প্রাণবন্ত, সেই ব্যান্ডপার্টির দল আজ লকডাউনের ফলে দিশেহারা। ফাল্গুন মাসে শেষ কাজ, তারপর থেকে শুরু লকডাউন। অগ্রিম বুকিংও হয়েছে। এখন বুকিংয়ে টাকা ফেরত পেতে তাঁদের দুয়ারে হানা দিচ্ছেন অনুষ্ঠানবাড়ির মানুষজন। হঠাৎ করে কর্মহীন হয়ে পড়ায় রুজিরুটিতে টান পড়েছে। প্রায় অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন এই পেশার সঙ্গে যুক্ত মালদা শহরের শতাধিক পরিবার।

মালদা শহরের ব্যান্ডপার্টি দলের একটা বড় অংশ বসবাস করে থাকেন মিরচক এলাকায়। মিরচকের এই এলাকাটি ঢুলিপাড়া নামে খ্যাত। ব্যান্ডের জাদুকর নামে খ্যাত লাল মহম্মদের পরিবার এই এলাকায় আসেন উত্তরপ্রদেশের বেনারস শহর থেকে। ব্রিটিশ আমলে এই পরিবার প্রথমে মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর পরে মালদা শহরের মিরচকে আসেন। মালদা শহরে লাল মহম্মদ তাঁদের জাত পেশা ব্যান্ডপার্টির সূচনা করেন। মালদা জেলার বহু ব্যান্ডপার্টির দলের শিক্ষাগুরু হলেন লাল মহম্মদ। লাল মহম্মদের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও বর্তমানে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। শুধুমাত্র মিরচকের ঢুলিপাড়ায় রয়েছে ১০টি ব্যান্ডের দল। মালদা শহরে ব্যান্ড পার্টির সংখ্যা ৫০-এর বেশি। মিরচক ছাড়াও ব্যান্ডপার্টির ব্যবসায় জড়িত রয়েছেন শহরের বিএস রোড, ফুলবাড়ি, কৃষ্ণপল্লি, মালঞ্চপল্লি, মাধবনগর এলাকার বহু মানুষ। প্রতিটি দলের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ২৫ থেকে ৩০ জন করে।

- Advertisement -

লাল মহম্মদ পরিবারের সদস্য মহঃ সফির দুটো বাজনার দল রয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। আমার দলে বাদক রয়েছেন কমপক্ষে ৫০ জন। তাঁদের সংসার চলে এই বাজনার কাজ থেকেই। ফাল্গুন মাসের শেষলগ্নে আমাদের কাজ হয়েছে। তারপর থেকে কাজ বন্ধ। একমাস ধরে শুরু হয়েছে লকডাউন। কতদিন চলবে কারও জানা নেই। অনেক অনুষ্ঠানবাড়ির কাজ ধরা ছিল। এখন সবগুলো বুকিং বাতিল হয়েছে। শুধু তাই নয় বুকিংয়ের অগ্রিম ফেরত চাইতে আসছেন। অনেকের টাকা ফেরত দিয়েছি। আবার অনেকের দিতে পারিনি। সংসার টানতে সেই টাকা খরচ হয়ে গিয়েছে। বাড়িতে আর কিছু নেই। স্থানীয় কাউন্সিলার আর পাড়ার ক্লাব সামান্য রিলিফ দিয়ে গিয়েছিল সেটাও শেষ। এখন চলব কীভাবে বুঝে উঠতে পারছি না।

তিনি আরও বলেন, আমাদের কর্মচারীদের অবস্থা আরও খারাপ। অনেকের বাড়ি গ্রামগঞ্জে। তাঁদের হাতেও টাকা নেই। আমার কাছে ধার চাইছেন। আমি বা কোথা থেকে তাঁদের সাহায্য করব? একই অবস্থা মালদা শহরের প্রতিটি বাজনা দলের। বিএস রোড এলাকার একটি দলের কর্ণধার মনতোষ ঋষি। তিনি বলেন, ২ মাস ধরে কাজ নেই। আমি খাব কী আর কর্মচারীদের বা দেব কী! আমার দলে রয়েছে কমপক্ষে ৪০ জন বাদক। তাঁরাও আমার ওপরে নির্ভরশীল। আমরা একটা বিয়ে বাড়ি থেকে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা রোজগার করি। খরচ বাদ দিয়ে সেই টাকা আমরা ভাগ করে নিই। মরশুমে ভালো রোজগার হলে আমাদের সকলের কোনওমতে চলে যায়। এই রোজগারটা এখন পুরোপুরি বন্ধ। আমাদের ভরসা এখন র‌্যাশনের চাল।

ছোটন রবিদাসের বাড়ি শহরের ফুলবাড়ি এলাকায়। ট্রাম্পেট বাজান তিনি। এদিন তিনি বলেন, লকডাউনের ফলে কাজ বন্ধ রয়েছে। দলের মালিকের কাছ থেকে দুইবার টাকা অগ্রিম হিসেবে নিয়েছি। এখন সেই টাকাও শেষ। আবার টাকা চাইব কীভাবে। কারণ, তাঁর অবস্থাও শোচনীয়। আমরা চাইছি সরকার আমাদের দিকটাও একটু ভাবুক! আর্থিক অনুদান আমরা পেলে বেঁচে থাকতে পরব নচেৎ অনাহারে মরতে হবে। ছটু সেখ ভাংড়া ঢোল বাজান তিনি। তিনিও একটা দলে কাজ করেন। এদিন তিনি বলেন, ২ মাস ধরে কাজ নাই। শেষ কাজ করেছি ফাল্গুন মাসে। সেই টাকা কবেই শেষ হয়েছে। মালিকের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়েছি। আপাতত তাই দিয়ে চলছে। এই টাকা শেষ হয়ে গেলে কী করব জানি না। সরকারের কাছে আর্জি আমাদের দিকে একটু তাকান। লকডাউন চালু রাখলে রাখুন, কিন্তু আর্থিক বরাদ্দ আমাদের জন্য কিছু করুন। না হলে না খেয়ে মরতে হবে আমাদের।