মাথাপিছু আয় থেকে শিক্ষা-স্বাস্থ্য, বাংলাদেশ এগিয়েছে এবং আমরা পিছিয়েছি

2238

অনিকেত চট্টোপাধ্যায় : বেশিদিন আগের কথা নয়, এই বছরেরই ৯ ফেব্রুয়ারি, তখন দেশজুড়ে সিএএ, এনআরসি নিয়ে আন্দোলন হচ্ছিল, কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী জি কিষেন রেড্ডি এক অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, বাংলাদেশের অর্ধেক খালি হয়ে যাবে, যদি আমরা বহিরাগতদেরও নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দিই। বাংলাদেশিদের অর্ধেক চলে আসবেন এই ভারতবর্ষে। তখন কে দায়িত্ব নেবে? প্রায় সেই সময়ে, কৈলাসনাথ বিজয়বর্গীয়, অধুনা আমাদের রাজ্যের বিজেপির মাথা, তিনি সাতসকালে কেবল চিঁড়ে খেতে দেখেই বুঝেছিলেন, তাঁর ঘরে আসা লোকজনেরা বাংলাদেশি। তাঁর যুক্তি, ওইরকম হতদরিদ্র না হলে কেবল চিঁড়ে খায়?  ওই সময়ে দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে প্রচার অভিযানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা বলেছিলেন, বাংলাদেশি ঘুসপেটিয়ারা উইপোকার মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে সারাদেশে। এরপরেই আরেকধাপ সুর চড়িয়ে বিজেপি নেতা সুব্রহ্মণ্যম স্বামী বলেছিলেন, বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপরে অত্যাচার হলে, ভারতের উচিত বাংলাদেশ আক্রমণ করা।

কিছুদিন আগেই হাতে এসেছে ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ডের এক আর্থিক সমীক্ষা। যাতে বলা হচ্ছে, সারা পৃথিবীতে স্পেন আর ইতালির পরেই আমাদের অর্থনীতির সংকোচন হচ্ছে, এবং তা প্রায় ১০.৩ শতাংশ। ওই ওয়ার্ল্ড ইকনমিক আউটলুক, অক্টোবর ২০২০, এ লং অ্যান্ড ডিফিকাল্ট অ্যাসেন্ট-এ বলা হচ্ছে, এশিয়ান সাব-কন্টিনেন্টে বাংলাদেশের অর্থনীতির বৃদ্ধি দেখার মতো, এই বছরের শেষে তাদের দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় আমাদের চেয়ে বেশি হয়ে যাবে। ডলারের হিসেবে এই মুহূর্তে আমাদের মাথাপিছু আয় ১,৮৮৮, বাংলাদেশের ১,৮৮৬.৫। বছরের শেষে তারা আমাদের থেকে কম করে ১২-১৪ ডলার এগিয়ে থাকবে। স্বাভাবিক, এ খবর পেয়ে রাহুল গান্ধি টুইট করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে জবাব এসেছে বিজেপির কাছ থেকে। দুটো জবাব, প্রথমটা হল, রাহুল গান্ধি দেখেননি যে, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক তাদের রিপোর্টেই বলেছে, ২০২১ সালে ভারতবর্ষ ৮.৮ শতাংশ বৃদ্ধি দেখবে। দ্বিতীয় জবাব হল, এটা করোনার জন্য হয়েছে, করোনা তো মোদি আনেননি।

- Advertisement -

আসুন এটা নিয়ে আলোচনা করা যাক।

২০২১-এ ভারতে বৃদ্ধির হার ৮.৮ শতাংশের কাছাকাছি থাকবে, এটা ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের তথ্য। মজার কথা হল, অনেকেই খেয়াল করছেন না, এই তথ্যের ভিত্তি বছর হল তার আগের বছরের বৃদ্ধির হার। তার মানে এ বছরে ১০.৩ শতাংশ সংকোচন হবে, তার পরের বছরে সেই সংকুচিত অর্থনীতির ৮.৮ শতাংশ বৃদ্ধি হবে। মানে তখনও আমরা দেড় শতাংশের মতো পিছিয়ে থাকব। মানে, গত টানা ছবছর ধরে আমাদের বৃদ্ধি ক্রমশ নামতেই থাকবে। করোনা তো ২০২০ সালের ব্যাপার।

আসুন আবার একবার বাংলাদেশের দিকে তাকানো যাক, মাত্র ৫ বছর আগে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১০০ টাকা হলে, ভারতের মাথাপিছু আয় ছিল ১৪০ টাকা। ঠিক শুনছেন, আমাদের মাথাপিছু আয় ছিল ১৪০ টাকা। কোন জাদুবলে বাংলাদেশ এগিয়ে গেল? কীভাবে এগোল? ভারতবর্ষের প্রতিবেশীদের মধ্যে চিনের মাথাপিছু আয় তো বেশিই ছিল, শ্রীলঙ্কার মাথাপিছু আয়ও ভারতের দ্বিগুণ ছিল, মালদ্বীপের মাথাপিছু আয় আমাদের থেকে বেশিই ছিল, এবার বাংলাদেশও আমাদের ছাড়িয়ে বেরিয়ে যাবে, এবার কৈলাসজি সম্ভবত ভারতের মানুষকে কেবল চিঁড়ে খেতে দেখবেন, আমরা সেদিকেই এগোচ্ছি। হ্যাঁ, একটা কথায় খুশি হবেই আরএসএস, বিজেপি। পাকিস্তান কিন্তু আমাদের থেকে পিছিয়ে এখনও, হ্যাঁ এখনও অনেকটাই পিছিয়ে। ভক্তরা কাঁসর-ঘণ্টা বাজান, হাততালি দিন। এবার সম্বিত পাত্র আছেন, অর্ণব গোস্বামী আছেন, মাঠে নেমে পড়েছেন, ওসব মাথাপিছু আয়, জিডিপি কিছুই নয়, আসলে মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়। দেশে খাবার না থাকলেও চলবে, দেশে মোদি আছেন তো, তিনি মন কি বাত বলে যাবেন, জিডিপি, মাথাপিছু আয়ের কথা তো বেদে লেখা নেই, আর এন্টায়ার পলিটিকাল সায়েন্সেও পড়ানো হয় না, অতএব মন কি বাতেই পেট ভরিয়ে নিতে হবে।

আচ্ছা কেবল মাথাপিছু আয়? আসুন, হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের আরও কিছু বিষয় নিয়ে একটু তুলনামূলক আলোচনা করা যাক, তাহলে বুঝতে পারবেন, শেখ হাসিনা ওদেশে মন কি বাত না বলেও দেশকে কীভাবে এক অন্য পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আর সব তো ছেড়েই দিন- অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ হারিয়ে দিল ভারতকে, ভাবা যায়? ঢাকা গেলে শামিমভাইকে বলতাম, আরে দূর, এই যে ভাঙা মিগটা রেখে দিয়েছেন, সেটা চালাবেন কী করে? চালালেই তো আপনাদের সীমানা পার করে যাবে। এখন সেই ছোট্ট বাংলাদেশ, মাত্র ৭১-এ জন্ম, জন্মের পর থেকে রাজনৈতিক উথালপাথাল, মুজিব হত্যা, সামরিক শাসন পার করে ২০২০-তে ভারতের থেকে মাথাপিছু রোজগারে এগিয়ে যাচ্ছে, এ কি কম কথা? আসুন আরও কটা বিষয় দেখে নেওয়া যাক।

গ্লোবাল হাঙ্গার ইন্ডেক্স থেকে জেন্ডার ইকুয়ালিটি ইনডেক্সে এগিয়ে গিয়েছে বাংলাদেশ। শিশুমৃত্যুতে ভারতে ১,০০০ জনে ৮৮ জন মারা যাচ্ছে, বাংলাদেশে ৮৪ জন। এবারে আসুন দেখা যাক, মানুষের গড় আয়ুর দিক থেকে কারা এগিয়ে বাংলাদেশিদের গড় আয়ু ৭২ বছর, ভারতের তিন বছর কম, ৬৯। তার মানে হল, বাংলাদেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা আমাদের থেকে ভালো হয়ে উঠছে। আর কিছুদিন পরে কলকাতায় আমাদের সুপারস্পেশালিটি হাসপাতাল, যা নাকি বাংলাদেশের ভরসায় বসে থাকে, সেগুলোর গণেশ উলটোবে। ২০০৯ থেকে প্রত্যেক তিনটে গ্রামে একটা করে কমিউনিটি হেলথ সেন্টার তৈরি হয়েছে এবং সেগুলো কাজ করছে। বাংলাদেশে ইউথ লিটারেসি বাড়ছে, আমাদের থেকে। ওখানে মহিলারা পুরুষদের চেয়ে বেশি উচ্চশিক্ষায় যাচ্ছেন, আমাদের দেশে মহিলাদের সংখ্যা কম। প্রথম নামের এক সংগঠন প্রাইমারি স্কুলে এক সমীক্ষা চালিয়েছিল, তাতে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের ছাত্ররা ভারতের ছাত্রদের চেয়ে সাবলীলভাবে রিডিং পড়তে পারছে। বাংলাদেশের সরকার প্রাইমারি স্কুলে সরকারি বা বেসরকারি বা মাদ্রাসাতে বিনামূল্যে বই দিচ্ছে, যা আমাদের দেশে কেবল সরকারি স্কুলেই দেওয়া হয়।

শিক্ষা আর স্বাস্থ্যে বাংলাদেশের সরকার ভারতের চেয়ে বেশি খরচ করছে। বাংলাদেশে শিশুদের ১০০ জনের মধ্যে ৩৩ জন ম্যালনিউট্রিশনে ভোগে, যেখানে আমাদের দেশে ৩৬ জন ম্যালনিউট্রিশনের শিকার। বাংলাদেশেও আমাদের দেশের মতো পোষণ অভিযান শুরু হয়েছে, টিমের নাম পুষ্টি আপা। কিন্তু তাদের তো আমাদের দেশের মতো নিরামিষের বাই নেই, তাই ডিম-মাংস সবই খাওয়াচ্ছে, আমাদের এখানে শাকসবজি। আর বলাই বাহুল্য যে, সে তালিকায় দুধ-ঘি-পনির নেই। বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ ঘরে টয়লেট আছে, আমাদের ৯৭ শতাংশ, ওদের ৮০ শতাংশ স্কুলে টয়লেট আছে, আমাদের ৭৩ শতাংশ। মানে স্বাস্থ্য সচেতনতায় ওরা এগিয়ে শ্রমের জোগানে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের মেয়েরা অনেক এগিয়ে চা বাগানে, গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে মহিলাদের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। আমাদের বেকারত্বের হার ৮.৪ শতাংশ, বাংলাদেশের ৪.১৯ শতাংশ। মানে, বছরকয়েকের মধ্যে কেবল মাথাপিছু আয়ে ক্ষেত্রে নয়, বহু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এগিয়েছে, এবং পাল্লা দিয়ে আমরা পিছিয়েছি। ফলে ওই মাথাপিছু আয় দিয়ে কী হবে? এ তো এই ২০২০-র কোভিড সংক্রমণের কারণে, এসব ছেঁদো কথা শুনলে ঘোড়ায় হাসবে। আর মোদিজি না জানলেও আমরা বাঙালিরা তো জানি মোল্লার ঘোড়ায় কত জোরে হাসে!

বাংলাদেশ একইসঙ্গে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে লড়ছে, মুজিব হত্যাকারীদের ফাঁসিকাঠে চড়িয়েছে, ভারত থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া সন্ত্রাসবাদীদের ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে, যে কোনও ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত ভারতের সঙ্গে তারা সুসম্পর্ক রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে। আর এদেশের কিছু নেতার মনে হল, না খেতে পেয়ে বাংলাদেশিরা উইপোকার মতো আমাদের দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। আসলে একটা দৃষ্টিভঙ্গি দরকার- একটা দেশ, একটা জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে, একটা স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি। সে দৃষ্টিতে এই করোনাকালের মহামারির মধ্যে যে প্রধানমন্ত্রীর প্রাধান্যের তালিকায় থাকে রামের মন্দিরের ভূমিপূজন, যে মুখ্যমন্ত্রীর পুলিশ দাঁড়িয়ে থেকে এক ধর্ষিতা দলিত মহিলার দেহ মাঝরাতে পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দেয়, যে দেশের হোম মিনিস্টারের কাছে এখনও পরিষ্কারই নয়, যাঁরা তাঁদের ভোট দিয়েছিলেন, তাঁরা দেশের নাগরিক কি না? যে দেশের প্রধানমন্ত্রী কোনও বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা না বলে আচমকা নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন, যে দেশের প্রধানমন্ত্রী একের পর এক মিথ্যে কথা, অপ্রয়োজনীয় মিথ্যে কথা বলতে থাকেন, সেই দেশের যা হওয়ার তাই হচ্ছে, সে দেশ এগোবে কী করে? তাকে তো টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মধ্যযুগের দিকে। আপাতত আমরা কেবল গর্ব করে বলতে পারি, আমরা পাকিস্তান আর নেপালের চেয়ে এগিয়ে আছি। অবশ্য জানা নেই, সেটাও কতদিন বলতে পারব!

সেই একাত্তর থেকেই অবাঙালি ভারতীয়দের এক বড় অংশ আর এক ছোট অংশের অশিক্ষিত বাঙালির ধারণা- বাংলাদেশ আমাদের করদ রাজ্য, আমরা ওদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছি, অত্যন্ত গরিব ওই দেশে কিসসু হয় না, কেবল বাচ্চা পয়দা হয়, আর ওরা মুসলমান। অথচ সে দেশ নোবেল এনেছে, সেই দেশ শিল্প তৈরি করছে, ক্রিকেট টিম তৈরি করছে, কৃষি ওয়েবসাইটগুলো দেখুন, তারা কত এগিয়ে মাছ উৎপাদনের দিকে তাকিয়ে দেখুন, তারা এগিয়ে যাচ্ছে। সবকিছু হয়েছে? না হয়নি। অনেক অনেক কাজ বাকি, কিন্তু তারা এগোচ্ছে, আমরা পিছোচ্ছি, সবদিক থেকে। মুজিব-কন্যা শেখ হাসিনা চুপ করে কাজ করছেন, দেশ এগোচ্ছে। আমার ভাষায় গড়ে ওঠা এক দেশ এগিয়ে যাচ্ছে কেবল নয়, টক্কর দিচ্ছে ভারতের সঙ্গে। গেয়ে ওঠাই যায়, আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।