বেঙ্গল-বেঙ্গলের পথে চর্চায় দুই ভাইয়ের যুদ্ধ

78

রূপায়ণ ভট্টাচার্য, ইসলামপুর : দুটো মন্দিরের গায়ে ছোট্ট পথসভা সবে শেষ। লজ্জা লজ্জা মুখে গলার সব গাঁদা ফুলের মালাগুলো সামনের বাচ্চাদের পরিয়ে দিলেন ডাক্তার সৌম্যরূপ মণ্ডল। তারপর আলুয়াবাড়ি স্টেশনের ওভারব্রিজটা টপকে  সোজা স্টেশনের ওপারে। বাড়ি বাড়ি ঘুরতে। বিজেপি প্রার্থীর পিছন পিছন গোটা পনেরো লোক। দুই যুব নেতা বোঝাচ্ছিলেন, কোন সমীকরণে আগের দুবার হারলেও এবার জিতবেন ডাক্তারবাবু।

স্টেশনের ওপারে অজস্র ঝুড়িওয়ালা বটগাছটিও যেন দেখতে লাগল অন্যরকম দৃশ্যটা। মিনিট দুই আগে কাছের জমজমাট ইসলামপুর বাসস্ট্যান্ডে দেখে এসেছি, টোটো চালিয়ে রেকর্ড করা প্রচার চলছে তণমূলের আবদুল করিম চৌধুরীর নামে। টোটোচালক রাজ জানেন না, কার গান বা বক্তৃতা বাজছে তাঁর গাড়িতে। তবে আত্মবিশ্বাসী, করিমচাচা আবার জিতবেন। প্রচারের জন্য দিনে পাঁচশো টাকা ভাড়া পাচ্ছেন বলে নয়। দশটা টু সাতটা ঘুরে তাঁর মনে হচ্ছে, মমতার আমলে ইসলামপুরের ফ্লাইওভার হয়েছে বলে লোকে বড় স্বস্তিতে।

- Advertisement -

কিছুক্ষণ পর ঘুরতে ঘুরতে, জাতীয় সড়কের হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকা বীভৎস স্মৃতির গাইসাল স্টেশন। কোলাহলহীন। লজ্জাবতী লতার ঝোপে ভরে গিয়েছে প্ল্যাটফর্মের একটা দিক। দ্বিতীয় ওভারব্রিজ অসমাপ্ত পড়ে। ২২ বছর আগে এক মাঝরাতে এই স্টেশনের ওভারব্রিজের নীচেই ব্রহ্মপুত্র মেল আর অবোধ-আসাম এক্সপ্রেসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয় মারাত্মক গতিতে। মারা গিয়েছিলেন ২৯০ জন। অজস্র মানুষ ছিটকে যান চারপাশে। অভিশপ্ত স্টেশনে ভরদুপুরে জনা দুয়েক বেশি লোক থাকা উচিত নয়, ছিলও না। দুজনের একজন পদ্মফুলে ভোট দিতে চান, একজন জোড়া ফুলে। ইসলামপুরে যেরকম ছবি।

বাংলার মানচিত্রে এই জায়গাটা অবিকল হাঁস বা মুরগির গলার মতো। অসম্ভব সরু হয়ে গিয়েছে হঠাৎ। একদিকে বিহার, অন্যদিকে বাংলাদেশ – এমন এলাকা কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমি। বাংলাদেশ একটু দূরে। বিহার একেবারে ঘাড়ে। অনেকে নিয়মিত ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করেন। জমি কিনে বাংলায় চলে আসেন অনেক বিহারি। কিশনগঞ্জ ও ডালখোলা স্টেশনের কাছে দুটো জায়গায় তো বিহারে ঢুকে আবার বাংলায় আসতে হয়। কাছে সীমান্ত থাকলে যা হয়, যাবতীয় অবৈধ ব্যবসার গল্প শোনা একরকম অনিবার্য।

এই একফালি অন্যরকম সীমান্ত এলাকায় কটা বিধানসভা আসন জানতে চান? পাঁচটি বিধানসভা আসনের মধ্যে পড়ছে চোপড়া, ইসলামপুর, গোয়ালপোখর, চাকুলিয়া ও করণদিঘি। আইনশৃঙ্খলা ধরলে চোপড়ারই সবচেয়ে বেশি দুর্নাম। সবরকম ঝামেলা লেগে থাকে বলে। বাকি সব জায়গায় অবশ্য হিন্দু-মুসলিম শান্তির সহাবস্থান।

গাইসাল স্টেশনের ঠিক আগের জায়গাটার নাম ধনতলা বাজার। মন্দির-মসজিদ পাশাপাশি। ওখান থেকে জাতীয় সড়কের বাঁদিকে নেমে গেলে, যে রাস্তাটা মিলবে, তার নাম বেঙ্গল-বেঙ্গল। বড় দ্রুত এই বেঙ্গল-বেঙ্গল উত্তরবঙ্গের মানুষদের অত্যন্ত প্রিয় হয়ে উঠেছে। ঘুরছে মুখে মুখে। ডালখোলার বহুকালের কুখ্যাত জ্যাম কোনও সরকার ছাড়াতে পারেনি। তা এড়িয়ে রায়গঞ্জ যাওয়ার জন্য এ রাস্তা খুব প্রিয় অনেকের। রাস্তা কম, জ্যামও কম।

দুপাশের সীমান্তের কথা ভাবলে এই রাস্তার নাম হওয়া উচিত ছিল বিহার-বাংলাদেশ। কেন হঠাৎ এমন অদ্ভত নাম এ পথের? সম্ভবত ড্রাইভারদের মুখে মুখেই তৈরি হয়েছে এ নাম। জাতীয় সড়ক দিয়ে শিলিগুড়ি থেকে রায়গঞ্জ গেলে দুবার বিহারে ঢুকতে হয়। এখানে সেসব বালাই নেই। পুরো বাংলা দিয়ে যাওয়া যায়। তাই বেঙ্গল-বেঙ্গল। প্রথম পাঁচশো মিটারে রাস্তার মাঝখানে বাড়ি নিয়ে জটিলতা ছিল। ওখানে শুনলাম, দীর্ঘদিনের সমস্যাটা মিটে এসেছে এবার। জায়গা ছাড়তে রাজি হয়েছে লোকে।

তা সেই বেঙ্গল-বেঙ্গল দিয়ে যেতে যেতেই চোখে এল, গতিগ্রামের কাছে রাস্তার ধারে বিজেপির বড় সভা। সেখানে যাওয়ার জন্য তীব্র রোদেও মুসলিম পুরুষ-মহিলাদের ভালো ভিড়। অজস্র গাড়ি। ব্যাপারটা কী? আসলে গোয়ালপোখর আসনে দুবারের বিধায়ক গোলাম রব্বানির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গিয়েছেন তাঁর নিজের ভাই গোলাম সরওয়ার। নয়াদিল্লির দিকে থাকতেন। বিজেপি এবার বাংলায় যে নয় মুসলিমকে প্রার্থী করেছে, তাঁদের একজন তিনি।

এই রাস্তায় যাওয়া মানে মাঝে মানুষের উঠোন, খড়ের গোলা, শুকনো পুকুর, মানুষের চেয়ে লম্বা ভুট্টা খেতের সারি, অসম্ভব সবুজ ধানখেত, পদ্মবিল, হাঁস ও ছানাদের মার্চপাস্টের মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া। অনন্য অভিজ্ঞতা। বছর চারেক আগেও ছিনতাই, ডাকাতির ভয়ে লোকে এ রাস্তা দিয়ে যেতে ভয় পেত। এখন এত গাড়ি যায় যে, রাতেও সমস্যা নেই। সেখানে অনেক গ্রামের মোড়ে আলোচনার বিষয় রব্বানি ও সরওয়ার- দুই ভাইয়ের যুদ্ধ। আর সব যেন পরে।

গোয়াগাঁওয়ের মোড়ে শুনলাম, তরুণদের আড্ডায় সরওয়ার-রব্বানি ভোটযুদ্ধের নানা গল্প। দুই ভাইকে ঘিরে পরিবার ও গ্রামের আত্মীয়রাও দুভাগ। একদল আত্মীয় এদিকে তো অন্য দল অন্য ভাইয়ের দিকে। সরওয়ার নানা জায়গায় এমনও বলছেন, দাদার প্ররোচনাতেই পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় তাঁর জেল হয়েছিল। চূড়ান্ত হেনস্তার শোধ তুলতেই তিনি ভোটে দাঁড়িয়েছেন। একেবারে নতুন বলে বিজেপিতে ফিসফাস রয়েছে তাঁকে ঘিরে। কিন্তু পদ্মসভায় মুসলিমদের ভিড় দেখে স্থানীয় এক মিস্ত্রির কথাগুলো মনে পড়ল।

জাতীয় সড়ক থেকে বেঙ্গল-বেঙ্গলে ঢোকার মুখে রাস্তা খারাপের জন্য সিভিক ভলান্টিয়াররা থাকেন। সেখানেই তাঁর  সঙ্গে দেখা। বললেন, আমাদের গ্রামে অনেক মুসলিম ভোট এবার বিজেপি পাবে। অনেকেই তাই বলছে।

বিজেপির বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগের প্রশ্ন উঠলে তাঁর সটান মন্তব্য, যা দেখলাম, তাতে মানুষগুলোই খারাপ হয়ে যায়। পার্টিগুলো এক থেকে যায়। মানুষই সব খারাপ করে। আমি আগে বিজেপি করতাম। তারপর পাড়ায় সবাই টিএমসি করে দেখে চলে গেলাম ওখানে। তার পরে আশার কথা, আমাদের এখানে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক খুব ভালো। অন্য জায়গার মতো নয়। এই যে সন্ধ্যায় রোজা ভাঙি, হিন্দু এক দাদা-বৌদিই সব সাজিয়ে দেন। ওঁরা ইদে আসেন, আমরা পুজোয় যাই।

এসব যদি আশার কথা হয়, তা হলে এই পঞ্চবলয়ের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে অন্যরকম আশার মুখ আরেকজন। অনেকের মুখেই যাঁর সম্পর্কে প্রশংসা শোনা গেল বেঙ্গল-বেঙ্গল নতুন পথে। তিনি চাকুলিয়ার আলি ইমরান রমজ ওরফে ভিক্টর।

৪১ বছরের ভিক্টর এখনও ফরওয়ার্ড ব্লক ছাড়েননি। নানা প্রলোভনেও। তাঁর পার্টি প্রায় মুছে যাওয়ার মুখে বাংলায়। কিন্তু বাংলায় নেতাজির পার্টির আলো জ্বেলে রাখার ব্যাপারে তিনি এখনও এক নম্বর বাজি। দুবারের বিধায়ক ভিক্টর ২০১১ সালে রাজ্যের তরুণতম বিধায়ক ছিলেন। ঘুরে মনে হল, তাঁর সমস্যা আপাতত দুটো। এক, লোকসভায় তাঁর কেন্দ্রে তৃণমূল এগিয়েছিল ৭৮২৫ ভোটে। তৃণমূলের প্রতিপক্ষ মিনজাহুল আফরিন আজাদও ভালো সংগঠক। দুই, সারা এলাকায় পদ্মফুল অনেক বেশি ছড়িয়েছে আগের তুলনায়। বাংলার সীমান্ত অঞ্চলে যা অনিবার্য ছবি।

আলুয়াবাড়ি রোডের ছোট্ট স্টেশনের সামনের চত্বরে এক বিশাল ডিজেল ইঞ্জিন দাঁড়িয়ে রয়েছে নির্জীব। গাইসাল স্টেশনের মতো অনেকটা। কাটিহার ডিভিশনের এই ইঞ্জিনটি ১৯৭৪ সালে তৈরি। ২০১৪ সালে কাজ শেষ হয়ে যায়। রেলের হেরিটেজ হিসেবে চল্লিশ বছরের ইঞ্জিনকে স্ট্যাচুর মতো রেখে দেওয়া হয়েছে বন্দি করে। দেখে একটা প্রশ্ন খেলা করে মনের ভিতরে। এই এলাকার অনেক পরিচিত রাজনৈতিক মুখ কি এবার নির্বাচনে স্ট্যাচু হয়ে যেতে পারেন?